ধারাবাহিক উপন্যাস -৫

 

আরিফের পরদাদা সরকার সাহেব প্রকৃতঅর্থে ওদের বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন তার বাবার চার ছেলে আর তিন মেয়ের মধ্যে ছোট। সমুদ্র তীরে বাড়ী ছিল তাদের। সাত ভাই বোনের বড় সংসার অভাব অভিযোগ লেগেই থাকতো। তায় ছোট বয়স থেকেই পড়াশোনা ছেড়ে বাবা কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন সব ছেলেকেই।

সরকার কাজ শেষে সমুদ্র কুলে বসে বড় বড় জাহাজ দেখতো আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়তো। তারপর একদিন বড় একটা জাহাজে খালাসির কাজ নিয়ে পাড়ি দিল দূর সমুদ্রে।

আর ফিরলো না। সমুদ্র আর জাহাজ ছাড়া বাকি পৃথিবীর সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করলো। তারূন্যের শুরূতে খালাসি হয়ে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে মধ্য বয়স পার করে ফিরলেন একেবারে জাহাজের মালিক হয়ে। সাথে মালোয়েশিয়ার বাসিন্দা মালে পরিবারের একজন স্ত্রী আর দুটো ছেলে নিয়ে ফিরলেন তিনি।

সমুদ্র তীরে বাবার ভিটেই না ফিরে এই শহরে অনেক বড় একখণ্ড জমি কিনে বাড়ী বানালেন। কষ্টার্জিত ধনদৌলত তাকে নামযশঃ ক্ষমতা সব দিয়ে সমাজে উচ্চ আসনে প্রথিষ্ঠা করলো।

কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি একদিন এক টানে কেড়েও নিল তার অনেকখানি।

সরকার বাড়ীর ঠিক সামনেই ওদের প্রাইভেট কারটা একটা ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেয়ে ওর স্ত্রী আর বড় ছেলেটা জাইগায় মারা গেল।

ছোট ছেলে সালাম সরকার শোকাহত বাবার পাশে দাড়ালো। স্ত্রী পুত্র মারা যাওয়ার এক বছরের মধ্যেই সরকার সাহেবও চলে গেলেন এপারের সব মায়া কাটিয়ে।

শোকাহত সালাম সরকার বাবার ব্যবসাটা ধরে রাখলো।

সালাম সরকারের দুই পুত্র শাহেদ আর শহিদ সরকার। দু’ভায়ের বয়সের পার্থক্য প্রায় দশ বছর। বড় ছেলে শাহেদের বয়স যখন পচিশ তখন সালাম সরকার মারা গেলেন।

পড়াশোনা চালানোর পাশাপাশি ব্যবসার হাল ধরলেন শাহেদ সরকার। ছোট ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করলেন। পরে ভাইকে ব্যবসার সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে প্রবাসী হয়ে লণ্ডনে পাড়ি জমালেন।

তারপর আর ফেরা হলো না তার।

শহিদ সরকারেরও দুই ছেলে। তবে যময; আরাফ আর আরিফ। বয়সের পার্থক্য আধা ঘণ্টার। চেহারার অবিকল মিল। একজনকে অন্যজন বলে ভুল করে সবাই।

বন্ধুর মত সম্পর্ক ওদের। একই ক্লাসে পড়ে ছোট থেকেই।

সব কিছুতেই মিল। কিন্তু স্বভাবে দু’জন যেন দুই ‘মেরূর।

আরাফ বর্হিমূখী খামখেয়ালী আর ভোগবিলাসী। অন্যদিকে আরিফ শান্ত, মিতভাষী আর পরোপকারী।

ওদের বাসায় দূরসম্পর্কীয় দরীদ্র মামার একটা মেয়ে থাকতো নাম জামিলা। ওদের থেকে কয়েক বছরের ছোট। জামিলাকে সংসারের বিভিন্ন কাজ কর্মে সাহায্য করার জন্য আনলেও শহিদ সরকারের স্ত্রী সালমা বেগম ওকে নিজের মেয়ের মত আদর যত্ন করতেন এবং সেভাবেই ওকে সব সময় ভালো জামাকাপড় পরিয়ে রাখতেন।

সালমা বেগমকে বড়মা বলে ডাকতো জামিলা। ওর বিয়ের দায়িত্ব নিজ কাধে নিয়ে জামিলার বাবাকে নিশ্চিন্ত করেছিলেন সালমা বেগম। বাড়ীতে মাষ্টার রেখে বিকেলে জামিলাকে আরবি আর বাংলা শিখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন জামিলা বেগম।

জামিলার বাবা বাদশা মিয়া সালমা বেগমের দূরসম্পর্কীয় ভাই। শহরের একই পাড়ায় বাস ওদের। বাদশা মিয়া বয়সে ছোট শহিদ সরকারের।

ছোট কাল থেকেই চতূর আর লোভী প্রকৃতির বাদশা মিয়া। লেখাপড়া তেমন একটা না শিখেই এক দলীল লেখকের সাথে ওঠাবসা করতে করতে শেষে স্থানীয় তহসীল অফিসে দলীল লেখকের কাজ করতে শুরূ করে।

লোভী বাদশা মিয়ার লোলুপ দৃষ্টি পড়ে শহিদ সরকারের সম্পত্তির উপর। সে ওর মেয়েকে কুমন্ত্রা দিয়ে সরকারদের সম্পত্তি ভোগ করার এক কূঅভিসন্ধি আটে মনে মনে।

শহীদ সরকারের পরিবার পরিজন ঘুর্নাক্ষরেও বাদশা মিয়ার এ ধরনের হীণ আর কূমতলোভের কোন আঁচ করতে ব্যর্থ হয়।

আরাফ আর আরিফ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষা করছে। এমন সময় বাবার প্ররোচনা আর চাপের মুখে জামিলা আরাফের সাথে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় রত হয়। জামিলা সময়ে অসময়ে আরাফের রূমে ঢোকা, অযথা ওর দিকে তাকিয়ে থাকা বা ওর বিছানাপত্র গোজগাজ করার সময় ইচ্ছাপূর্বক নিজের ওড়না ফেলে দেয়া ইত্যাদি ইঙ্গিতমূলক কাজ করতে থাকে জামিলা।

বাদশা মিয়ার যুক্তিমত জামিলার মা মেয়েকে বুঝিয়েছে যে ওদের সাথে প্রকৃত ভালোবাসা করে কোন ফল হবে না। কারণ প্রথমতঃ ওদের দুভায়ের কেউ ওর প্রেমে পড়বে না আর পড়লেও ওদের বাবা মা বা পবিারের অন্য কেউ তা মেনে নেবে না।

অতএব ওদের একজনকে ফাঁদে ফেলতে হবে। আর ভোগবিলাসী আরাফই এ উদ্দেশ্যসাধনে উপযুক্ত হবে।

সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল সন্ধ্যা থেকে। সবাই একটু আগেভাগেই যে যার রূমে শুয়ে পড়েছে। জামিলা কাজের অছিলায় আরাফের রূমে গেল।

টেবিল ল্যাম্পের আলোয় একটা বই পড়ছিলো আরাফ।

কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করলো জামিলা। বই থেকে মুখ না তুলেই না বলে জবাব দিল আরাফ।

জামিলা ইতস্ততঃ ভাবে দাড়িয়ে রইলো পায়ের দিকে খাটের কোণায় মাশারি ষ্টাণ্ডে আলতো ভাবে হেলান দিয়ে।

বই থেকে মুখ তুলে তাকালো আরাফ। নিচের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে জামিলা।

-কিছু বলবি।

জবাব দিল না জামিলা।

কিছুক্ষন কাটলো ওভাবেই। আরাফ উঠে কাছে গেল ওর।

তারপর কি যে হলো তার সবটুকুই ওদের আওতার বাইরে। প্রায় সারা রাত একত্রে কাটিয়ে শেষ রাতের দিকে ফিরে গেল জামিলা।

লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে জামিলা সে রাতের সবকিছু খুলে বললো ওর মাকে।

তারপর ওর মায়ের প্ররোচনায় প্রতিরাতেই চলতে থাকলো ওদের শারিরীক প্রেম।

বাদশা মিয়ার পরামর্শে প্রায় মাসখানেক পর একদিন রাতে শারিরীক প্রেমের ফাকে জামিলা ওর আত্মসত্তা হওয়ার ব্যপারটা বললো আরাফকে।

সমস্ত দেহ শীতল হয়ে গেল আরাফের। কি করবে এখন ও, কি বলবে জামিলাকে। এ বাস্তবতা ভুলেও কখনও মাথায় আসেনি ওর।

কয়েকদিন পর বাদশা মিয়া স্ত্রীকে সাথে নিয়ে সরকার বাড়ীতে গেল। দুজনার চোখে মুখেই বানানো অসহায়ত্ব আর বেদনার ছাপ।

ছ্যাত করে উঠলো সালমা বেগমের বুকটা।

ওদের কথা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল সালমা বেগম আর শহিদ সরকার।

আকাশে কালো মেঘ আর থেকে থেকে বাতাসের ঝাপটা। প্রকৃতি রূদ্র রোষে ফেটে পড়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়ার ঠিক আগের মুহুর্ত যেন।

-ভাবী আপনিইতো মেয়েটার সব দায়িত্ব নিয়ে আমাকে নিশ্চিন্ত করেছিলেন। মুখপুড়িকে নিয়ে এখন কি করবো আমি। সব দোষ ওর, আপনি আমাকে একটু বিষ দেন আমি নিজ হাতে ওকে খাইয়ে এই রাতের অন্ধকারেই ওকে পুতে রেখে আসি।

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলে জামিলার মা মুর্চ্ছা যাওয়ার মত লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে।

সম্বিত ফিরে পেলেন সালমা বেগম। চেয়ার থেকে নেমে জামিলার মায়ের পাশে মেঝেতে বসে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন ওর মাথায়।

প্রায় দশ বছর বয়স থেকে জামিলা থাকে এ বাসায়। বাদশা মিঞার অনেক গুলো ছেলেমেয়ের ভিতর জামিলা বড়। বয়সের তুলনায় ওর শরীরের বাড়নটা একটু বেশী তায় ও বয়সেই ওর শরীরের ব্যহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো পরিস্কার বোঝা যেত। সালমা বেগমের দুটো বড় বড় ছেলে তায় জামিলার মা মেয়েকে কাজে দিতে একটু আপত্তিও করেছিল।

ভাবনাটা যে একেবারে অমূলক নয় তা অনুধাবন করেছিল সালমা বেগম। কিন্ত ছেলেদের উপর অঘাত বিশ্বাসের জোরে মুচকি হেসে সালমা বেগম জামিলার মাকে আশ্বস্ত করেছিলেন।

-মনে কর জামিলা আমার একটা মেয়ে। সে ভাবেই রাখবো ওকে। আর তোমার বাড়ী থেকেতো মাত্র আধা ঘণ্টার হাটা রাস্তা প্রতিদিন না হয় একবার করে মেয়েকে দেখে যেও।

টানাটানির সংসার বাদশা মিয়ার। মেয়েটা ভালোই থাকবে এখানে দুবেলা পেট ভরে খেতে পারবে। মেয়েকে সেভাবে বুঝিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ওর মা জামিলাকে সালমা বেগমের হাতে তুলে দিয়েছিল।

নিজের বাড়ীর মতই ছিল জামিলা। সালমা বেগমের স্নেহে আর আদরে এবাড়ীটাকে আপন করে নিয়েছিল জামিলা। মাঝে মধ্যে বেড়াতে এলে মেয়ের মুখে সব শুনে জামিলার মায়ের দুচোখ আনন্দাশ্রুতে শিক্ত হতো। দুহাত তুলে আল্লার কাছে দোয়া করতো এ পরিবারের জন্য।

তায়তো ওর স্মামী যেদিন তার কূমতলবের কথাটা ওকে বুঝিয়ে বললে ও নিজ থেকেই চমকে উঠেছিল। অনেক কেঁদে কেটে এহেন কাজ থেকে স্মামীকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছিল। কিন্ত অতি বৈষয়িক আর লোভী স্মামী ওদের আরো তিন তিনটে মেয়ের বিয়ে আর ছোট ছোট আরো দুটো ছেলেকে মানুষ করার কঠিন বাস্তবতার নিরিখে জামিলার এত সহজে একটা গতি হওয়ার যে অংক বুঝিয়েছিল তাতে ওর অনিশ্চয়তায় ভরা মনে একটু শান্তির সুবাতাস বইতে শুরূ করেছিল।

কূঅভিসন্ধিটা মায়ের কাছ থেকে শুনে জামিলাও আৎকে উঠে না বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। এটা মহাপাপ বলে ঘৃনাভরে প্রস্তাবটা প্রত্যাক্ষান করেছিল জামিলা।

কিন্ত বাবা মায়ের মিলানো অংকের কিছু হিসেবের আলোকে জামিলার এরকম একটা কাজের সুবাদে ওর অ্যান্যন্য ভাইবোনদের উজ্জল ভবিষ্যতের কথা বললে জামিলা চুপ হয়ে গেল।

আরাফের সাথে প্রথম রাতের শারিরীক প্রেমের সুখানুভূতির পর জামিলা প্রকৃতপক্ষে সব মতলবের কথা ভূলে কেবল শারিরীক চাহিদাকেই প্রধান্য দিয়েছে। শুধু শরীরটাকে নিয়েই শুখানুভূতির স্বপ্নে ও বিভোর থেকেছে রাতের পর রাত।

কিন্ত আজ যখন একটা নিরেট বাস্তবতা ওর শরীরে স্থান গেড়েছে তখন একটা অপরাধবোধ আর অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যৎ ওর শ্বাস রোধ করতে চায়ছে।

সে রাতে জামিলা ওর বাবা মা, শহিদ সরকা্‌র আর সালমা বেগমের সামনে মূক হয়ে মাথা নত করে দাড়িয়ে ওর দুচোখের অশ্রু বন্যার বাধ যেন ভেঙ্গে ফেললো।

-বড়মা সব দোষ আমার। আমিই এর একটা ব্যবস্থা করবো। আপনাদের কারো কোন চিন্তা করতে হবে না।

সবাই আৎকে উঠলো ওর কথায়। এতটুকু মেয়ে অতবড় কঠিন বাস্তবতাকে নিজের কাধে নিয়ে সমাধান করতে চায়লো। প্রস্তর কঠিন অবয়বে দাড়িয়ে জামিলা। তাতে না আছে কোন ভয় বা আবেগ।

সালমা বেগম জামিলাকে টেনে কাছে বসালেন। স্বস্নেহে ওর মাথায় হাত রাখলেন।

-কারো কিচ্ছু করতে হবে না, বলতেও হবে না। যা করার আমিই করবো।

সেরাতে জামিলা আরাফের ঘরে গেল। সব খুলে বললো ওকে।

-তোমার কোন চিন্তা করতে হবে না। কেউ জানবে না আর কোন কথা, সময়মত যা করার আমিই সব করবো। কথাটা বলে জামিলা দাঁড়ালো না।

জামিলার আশ্বাসের জবাবে কিছুই বললো না আরাফ। পাথরের মুর্তির মত বসে জামিলার গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলো।

Category: Bangla, Novel

Write a comment