হারানোর সুখ

 

meherhossain1752@gmail.com

দরজাই নক করার শব্দে একটু বিরক্ত লাগলো!  

সাপ্তাহিক ছুটির দিন, নাস্তা করে খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছি। দুই দিন ছুটির প্রথম দিনটা আমার খুব পছন্দের কারন হাতে পরের একটা পুর দিন পড়ে থাকে। এ যেন বসন্তের আগমনী কোকিলের ডাকের মত।

দরজাটা খুলতেই হাসিমাখা মুখে ওরা চার ভাই বোন প্রবেশ করলো।

খুব ফুরফুরে মেজাজ সবার বেশ ভালোই লাগলো। ওদেরকে বসতে বলে কাজের ছেলেটাকে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে বললাম।

ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী আফ্রিকার দেশ মোজামবিক। উত্তর দক্ষিন লম্বা দেশটির সর্ব উওরে অবস্থিত প্রদেশের রাজধানী শহর নামপুলায় আমি চাকরী করি। ছোট পরিকল্পিত শহর, কিন্তু গত প্রায় দুদশকেরও বেশী সময় ধরে গৃহযুদ্ধের ছোবল রাস্তা, দোকান, ঘর বাড়ী সব জায়গাতেই পরিষ্কার ভাবেই প্রতিভাত।

একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। বাসার মালিক এদেশীয় এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা, নাম ম্যারিয়েট। চারটে ছেলেমেয়ে নিয়ে ওর সংসার। দূরমূল্যের বাজারে মুল বাড়ীটা আমার কাছে ভাড়া দিয়ে পিছন দিকে তৈরী সার্ভেণ্ট কোয়ার্টার একটু ঠিকঠাক করে ওখানেই থাকে ওরা।

বড় মেয়েটা ইউনিভারসিটিতে পড়ে, তার পরের ছেলেটা এ লেভেল পাশ করেছে। তিন নম্বরের ছেলেটা ক্লাস নাইন আর ছোট মেয়েটা ক্লাস সেভেনে পড়ে।

ম্যারিয়েট স্থানীয় হাসপাতালে নার্সের চাকরী করে। এছাড়া শুনেছি ওদের একটা কৃষি খামার আছে।

ম্যারিয়েট একা, কারণ ওর স্বামী পর্তুগালে চলে গেছে। মোজামবিক পর্তুগীজ কলোনী থাকার সুবাদে ওর স্বামী এদেশে ব্যবসা করতো এবং সে উপলক্ষ্যেই এখানে বসবাস করতো। নামপুলা শহর থেকে প্রায় এক দেড়শো কিঃ মিঃ উত্তর পূর্বে অবস্থিত নাকালা সমুদ্রবন্দরে ওর জাহাজ আসতো পর্তুগাল থেকে। সেখানেই ম্যারিয়েটের বাড়ী। আর ওখানেই পরিচয় ওর শ্বেতাঙ্গ স্বামীর সাথে।

স্বামীর সাথে তখনই ম্যারিয়েট চলে আসে নামপুলায়। তারপর থেকেই নিজ আত্মীয় আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বলতে গেলে বিচ্ছিন্ন। নামপুলাতে প্রকৃতপক্ষে ওর নিজের কেউ নেই।

বিবাদমান দলগুলোর মধ্যে বর্তমান শান্তি চুক্তি সাক্ষর হওয়ার কয়েক বছর আগে দেশের অবস্থা যখন খুব খারাপ হয়ে পড়ে তখন ওর স্বামী এখানকার সম্পত্তি ম্যারিয়েটকে দিয়ে পর্তুগালে ফেরত যায়। সে সূত্রেই ও এই বাড়ী আর একটা কৃষি খামারের মালিক।

আজ ওরা এসেছে ভ্যালেনটাইন ডে’র শুভেচ্ছা জানাতে আর আমার বাসায় রক্ষিত ভিসিআর এ একটা ক্যাসেট দেখার অনুরোধ নিয়ে।

ওরা ভাই বোন সবাই বাবার চেহারা পেয়েছে, দেখতে মোটামুটি ইউরোপিয়ানদেরই মত। কোন ক্রমেই ম্যারিয়েটের মত নয়। বড় মেয়েটার নাম ইভা। ফর্সা গায়ের রং চুলগুলো লম্বা তাতে একটু সোনালী আভা যেন উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে, ভারী মিষ্টি চেহারা ওর। ওদের ছোট বোনটার চেহারাও একই রকম। ভাই দুটোও ফর্সা তবে কালো চুলে একটু কোকড়ানো ভাব আছে। সবাই বেশ পরিপাটি হয়ে থাকে।

ক্যাসেট প্লেয়ারটা ওদেরই। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ভাড়াটিয়াকে বাড়ীর যাবতীয় সবকিছুই মালিক সরবরাহ করে। সে ভাবেই ওদের ক্যাসেট প্লেয়ারটা আমার বাসায়। আজ ওর মা বাবার বিবাহ বার্ষিকী সে উপলক্ষে ওরা একত্রে মিলে ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্যাসেটটা দেখবে।

-যখন খুশী প্লেয়ারটা নিয়ে যেও। আমি সানন্দে রাজি হলাম।

কিন্তু ওদের চাহিদাটা আরেকটু বেশী। ওরা এই ড্রইং রুমে বসেই সন্ধার পর ক্যাসেটটা দেখতে চায়।

আমার অনাপত্তির কথা জানিয়ে ওদেরকে নিশ্চিত করলাম।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে ইভা জিজ্ঞেস করলো – আপনি নিশ্চয় পর্তুগালে গিয়েছেন। তা পর্তুগাল আপনার কেমন লাগে?

ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ঘুরেছি, কিন্তু বাস্তবিকই পর্তুগালে যায়নি কখনো। কথাটা বলে ওদেরকে জানালাম যে – ইউরোপ পুরোটাই খুব সুন্দর আর পর্তুগাল নিশ্চয় কোন ব্যতিক্রম নয়।

খুশী হলো ওরা। হবে না কেন বাবার সুত্রে ওটায়তো ওদের দেশ।

ওদের বড় ভাইটার নাম মিগেল, ও সোৎসায়ে জানালো যে ওরা ভাই বোন সবাই পর্তুগালে চলে যাবে। ওখানে ওদের বাবা থাকে।

-কবে যাবে? কিছু না ভেবেই প্রশ্নটা করলাম।

আমার প্রশ্নে মিগেল একটু ইতস্ততঃ বোধ করলো।

-মা আছে তো, তার একটা ব্যবস্থা না হলে–।

ঠিক কি বলতে চায়লো মিগেল বুঝলাম না। কিন্তু ওর ইতস্ততঃ ভাব দেখে আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করে ওকে বিব্রত করতে চায়লাম না।

-মাতো নিগ্রো। ওদের বারো বছরের ছোট বোনটা মুচকি হেসে কথাটা বললো।

অবাক লাগলো ওর মন্তব্য আর মুচকি হাসিতে। আরো অবাক লাগলো ছোট বোনটার মন্তব্যে ওদের অন্য কারো কিছু না বলতে দেখে।

ম্যরিয়েট নিগ্রো আর ওর সন্তানগুলো শ্বেতাঙ্গ!

বংশ পরিচয় ইত্যাদি বাদ বিচার করলে সামগ্রীক হিসাবটা কি দাড়াবে বলতে পারি না। তবে চাক্ষুস ভাবে ওরা ওদের মায়ের মত দেখতে নয়। নিজের সংসারে ম্যারিয়েট নিগ্রোতো বটেই।

ম্যারিয়েট আধা বয়স পার করা রোগা নির্ভেজাল এক নিগ্রো মহিলা। প্রতিদিন সকালে একটা টিফিন ক্যারিয়ারের বাটি হাতে হেটে যেতে দেখি ওকে। ও কাজে যায় হেটে হেটে। সঙ্গে দুপুরের কিছু খাবার নিয়ে যায় কারণ ফিরতে সন্ধ্যে হয়।

সব সময় মুখটা মলিন থাকে ম্যারিয়েটের। কখনো সখনো সামনা সামনি দেখা হলে কুশলাদি বিনিময় কালেও ওকে হাসতে দেখিনা।

এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে ম্যারিয়েট একদম একা ওর সংসারে।

মিগেল বা ইভাদের মত ছেলেমেয়েদের নামপুলার রাস্তাঘাট দোকান ইত্যাদিতে বেশ দেখা যায়। এদেরকে মিকসড জেনারেশান বলে। স্কুল কলেজ বা অফিস আদালতের মত ভালো ভালো জায়গায় এদের বিচরণই বেশী। বুদ্ধি, লেখাপড়া বা স্বচ্ছলতার জোরেই হোক বা কেবলমাত্র চেহারার আর্শিবাদেই হোক ভালো কাপড়ে মোজামবিকান বলতে এরাই প্রভাবশালী।

এ ধরনের জেনারেশানের মানুষদের নিজের বলতে কিছু নেই, সবই হারিয়েছে ওরা। এদের ভাষা, পোশাক পরিচ্ছদ, খাওয়া দাওয়া এমনকি ধর্মটাও সাম্রাজ্য স্থাপনকারীদের কাছ থেকে নেয়া। আর সর্বপরী রক্তে মিশ্রন ঘটিয়ে এদেরকে নিজ দেশেই চাক্ষুস ভীনদেশী বানিয়ে ছেড়েছে। খেয়ালী প্রকৃতি কারো বা চুলে নাকে অথবা কিঞ্চিত গায়ের রক্সে এদেশীয় কিছুটা ছাপ রাখার চেষ্টা করেছে।

তবে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ঐ ছাপগুলোকেও ওরা কৌশলে ঢেকে দেয়ার ব্যাপারে যেন সবসময়ই তৎপর।

ওরা যে যা হারিয়েছে তার জন্য নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করে। তা নিয়ে গর্ব করে। আর যে যতটুকু হারাতে পারিনি সেটায় বোধহয় ওদের কাছে দুর্ভাগ্য।

কিন্তু ম্যারিয়েট কি করবে! কি করার আছে ওর!

ওরা ওদের মায়ের অনুরোধের কথা উল্লেখ করে সন্ধ্যাবেলা আমাকেও ওই আসরে থাকার জন্য বললো।

ছোট একটা কেক কাটবে। বাইরের আর কেউ থাকবে না বলেও জানালো।

সন্ধ্যার পর পরই সবাই আসলো ওরা। আমি ম্যারিয়েটকে একটা ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানালাম। খুশী হলো, তবে তার কোন প্রকাশ ওর চোখে মুখে তেমন বোঝা গেল না।

কেক কাটার ছোট্ট অনুষ্ঠানের পর বসলাম ক্যাসেটটা দেখার জন্য। আলো আধারিতে ফাঁক বুঝে পাশে বসা ম্যারিয়েটকে দেখার চেষ্টা করছি।

টিভি’র পর্দায় কনের পোশাকে ম্যারিয়েট। পাশে উপবিষ্ট ওর পর্তুগীজ স্বামী। কত স্বপ্ন ম্যারিয়টের চোখে মুখে! স্বপ্নিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন!

আমার আশে পাশে বসে ছেলেমেয়েরা উচ্ছাসে ফেটে পড়ছে। বিভিন্ন মন্তব্যও করছে। -ওদের বাবা খুব হ্যান্ডসাম ইত্যাদি।

টিভির পর্দাই বর কনের আশে পাশে ওদের বাবার যে সমস্ত নামি দামী বন্ধু বান্ধব দেখা যাচ্ছে ওদেরকে নিয়েও মন্তব্য করছে ওরা। 

নির্লিপ্তে বসে ম্যারিয়েট। ছেলেমেয়েরা যেন ওর উপস্থিতি ভুলেই গিয়েছে।

মনে হলো ক্যাসেটটা ম্যারিয়েট একদম উপভোগ করছে না। ওর মনটা যেন অন্য কোন খানে, অন্য কিছু ভাবছে ও।.

শুধু ছেলেমেয়েদের আনন্দ দেয়ার জন্যই যেন ও বসে আছে।

পরদিন সাপ্তাহিক ছুটি। সকালে উঠে একটু হাটাহাটি করবো বলে ট্রাক স্যুট পরে বের হয়েছি। ম্যারিয়েট ওর পিক আপটা বাসার সামনে বের করে বোধহয় ইঞ্জিন একটু গরম করে নিচ্ছে।

গত রাতের পার্টির সুখ ষ্মৃতির রেশ ধরেই আমি ওকে সুপ্রভাত বললাম। আজ ওর উত্তরটা বেশ আন্তরিক মনে হলো।

আমার দিকে তাকিয়ে দেখলো একটু।

-আমি খামারে যাচ্ছি, ব্যস্ততা না থাকলে তুমি আসতে পারো।

ভারী ভালো লাগলো ওর প্রস্তাবটা। পিক আপে ড্রাইভিং সিটে বসা ম্যারিয়েটের পাশে উঠে বসলাম।

বেশ বুড়িয়ে গিয়েছে ম্যারিয়েট। এত কাছ থেকে দিনের আলোয় আগে কখনো দেখিনি ওকে। ওকে অনেক রোগা মনে হলো। পীতকালো খসখসে চামড়া ঠেলা দিয়ে হাড্ডিগুলো উকি দেয়ার চেষ্টা করছে। চোয়াল দুটো পুরপুরি বসা। মাথায় একদম খাটো করে ছাটা কোকড়ানো কিছু চুল। পরনে বাদামী রঙের স্কার্টের সাথে সাদা টি সার্ট।

ওর খামারে পৌছাতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগলো।

পাহাড়ী অসমতল এলাকা। পুরো ফার্মটা জুড়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে থাকা ছোট বড় পাথরের পাহাড়। তারই ফাঁকে ফাঁকে সমান জায়গা জুড়ে ওর খামার।

খামারে গরু ছাগল পুকুর আর বিভিনড়ব শাক সবজির বাগান।

বেশ কয়েকজন মানুষ খামারে কর্মরত। ও আমাকে খামারটা ঘুরে দেখাতে দেখাতে কর্মরত লোকজনদের কিছু কিছু নির্দেশনাও দিল।

বেশ প্রাণবন্ত লাগলো ম্যারিয়েটকে।

আমাকে একটা কাটা পুকুরের উঁচু পাড়ে ঘাসের উপর বসতে বলে ম্যারিয়েট পাশেই টিন দিয়ে ছাউনি দেয়া ঘরটার মধ্যে প্রবেশ করলো।

ওটাতে বোধহয় খামারের লোকজন থাকে।

পুকুরটা বেশ বড় তবে ওপাড়টা পুরোপুরি দেখা যাই। শান্ত শীতল জল উপরে মেঘ মুক্ত আকাশ যার প্রতিচ্ছবি আয়নার মত স্বচ্ছ জলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ওপাড়ে একটা বক এক পায়ে হাঁটু জলে দাড়িয়ে এক নিরিখে জলের দিকে তাকিয়ে।

বক ধার্মিক প্রবাদের একেবারে সঠিক চিত্রায়ন।

কিছু বিস্কিট আর দুই কাপ চা একটা ট্রেতে করে নিয়ে এসে ম্যারিয়েট আমার পাশে বসলো।

-খামারটা শেষ মেস বিক্রিই করে দিতে হবে!

ট্রেটা আমার সামনে এগিয়ে ধরে একটা চাপা নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে কথাটা বললো।

আর একটা নিঃশ্বাস টেনে চায়ে চুমুক দিল ম্যারিয়েট।

তাকালাম ওর দিকে।

-অনেক মেহনত করতে হয়েছে, অনেক টাকাও খরচ করতে হয়েছে এর পেছনে। পাথর আর গভীর জক্সগলে ভর্তি ছিল জায়গাটা।

ভাবছি জিজ্ঞেস করি -এত সুন্দর একটা খামার কেন বিক্রি করবে?

-ওরা সব চলে গেলে এগুলো দিয়ে কি করবো আমি। আর টাকাগুলো ওদের অনেক কাজে লাগবে।

ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস টানলো ম্যারিয়েট। – আমার শরীরের যা অবস্থা।

বেশ কিছুক্ষন ধরে নিস্তব্ধ ম্যারিয়েট। আমিও কী বলব ভাবছিলাম।

ভাবলাম জিজ্ঞেস করি -তোমার শরীরের কি অবস্থা? ডাক্তার দেখাও, ভালো কোন ডাক্তার। আর অত চিন্তা কি, জীবন মরনের কথা কি কেউ বলতে পারে?

-নামপুলাতে আমার আপন বলতে তেমন কেউ নেই। নাকালাতে যারা আছে ওদের সাথেও কোন যোগাযোগ নেই অনেক বছর। ওরা কেউই আমাদের বিয়েটা কোনদিনও মেনে নেয়নি।

ম্যারিয়েট একজন শ্বেতাঙ্গকে বিয়ে করার জন্য ওর সব আত্মীয় স্বজন ওকে ত্যাগ করেছে। ওর পেটের বাচ্চাগুলো কেউ দেখতে ওর মত নয়। প্রকৃত অর্থে ম্যারিয়েট ওদেরকে বড় করে তুলছে ওদের বাবার কাছে ওর দেশে চলে যাওয়ার জন্য।

ভাবছি কি পেল ও!

এটা সত্যি যে কোন মা বাবা কোন বিনিময়ের আশায় সন্তান পালন করে না। কিন্তু ওতো কোন পশু পাখী না যে সন্তান বড় হলেই ওর অন্তর থেকে সে স্মৃতি মুছে যাবে। বৃদ্ধ হয়ে গেলে পশু পাখীদের কি ভাবে জীবন চলে জানিনা, তবে বৃদ্ধা অবস্থায় সজনহারা ম্যারিয়েটের জীবন কি ভাবে চলবে তা অনুমান করা যায়।

-ওখানে ওদের বাবা আছে, তাছাড়া ওরা সবাই দেখতেও ওদেশীদের মত।

ছোট করে একটা ঢোক গিললো ম্যারিয়েট।

এখানে কত অসুবিধা, কোন ভবিষ্যৎ নেই।

একটু থেমে একটা বড় নিঃশ্বাস টেনে বললো- আমার যদি একটা ব্যবস্থা হতো।

-কি ব্যবস্থা হবে ওর! ওর আনত মুখটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম।

কথাগুলো বলতে বলতে ম্যারিয়েট বারবার আকাশ আর পাহাড়ের দিকে তাকাচ্ছিলো। তায় ওর কুঠারাগত চোখ দুটো আমি ভাল করে দেখতে পেলাম না।

এক পায়ে দাড়িয়ে তাক করে থাকা বকটা ছোঁ মেরে অত বড় জলরাশির এক কোনে একটু ঢেউ তুলে ওর শিকার লম্বা ঠোটে চেপে ধরে পাখা ঝাপটি দিয়ে উড়ে গেল।

আমাকে ভালো ভাবে চেনে না ম্যারিয়েট, আমি ওর সমগোত্রীয় কেউ না। তবু মনের কথাগুলো বলে নিজেকে একটু হালকা করার জন্য আমাকেই বেছে নিয়েছে ম্যারিয়েট।

ম্যারিয়েটের চার সন্তান যা হারিয়েছে তার জন্য ওরা নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করে। আর তা থেকেই সম্ভাব্য সুবিধা আদায়ের জন্যই ওদের স্বপ্নের দেশে যেতে চঞ্চল হয়ে উঠেছে ওরা।

কিন্তু সন্তানদের মত ম্যারিয়েটের সে সব হারানোর সৌভাগ্য হয়নি।

ও যা হারাচ্ছে তার জন্য ওর মত নিবেদিত প্রাণ মা সন্তানদের উজ্জল ভবিষ্যতের চিন্তায় হয়তো বুক বাধতে পারবে। কিন্তু মানুষ হিসাবে ম্যারিয়েট এ হারানো কি ভাবে সহ্য করবে!

ওতো শুধু মা নয়, রক্ত মাংসের একজন মানুষ। ওর মানুষের দেহে আবৃত মনের মধ্যেইতো মাতৃত্বের অবস্থান।

ভাবলাম জিজ্ঞেস করি – ম্যারিয়েট তোমার কি হবে?

পারলাম না জিজ্ঞেস করতে। কারণ প্রশ্নের জবাবটা ওর প্রকৃতই জানা আছে কিনা বলতে পারবো না।

Category: Bangla, Short Story

Write a comment