ভালবাসার শেকল 

(অনূদিত)

 

পাহাড়ি এলাকা সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে, লোকটি দুই লেনের একটি গ্রামের রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তার কারখানা বন্দ হওয়ার পর থেকে সে বেকারই বলা চলে এবং বলা বাহুল্য খুবই আর্থিক দৈন্যতার ভিতর দিয়ে তার দিন অতিবাহিত হচ্ছিলো। এই মন্দার সময় কোন নতুন কাজ পাওয়া খুবই অনিশ্চিত। কিন্তু সে খুব আশাবাদী মানুষ কখনও আশা ছাড়েনি। সে সবসময়ই হাসিমুখে তার স্ত্রীকে বলত -সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে সোনা, আমি তোমাকে ভালবাসি। 

এই আর্থিক দৈন্যতার মধ্যেই শীত মৌসুমও শুরু হল।

রাস্তাটা ছিল নির্জন। এসময় খুব বেশি লোকের এখান দিয়ে চলাচলের কোন কারণ ছিল না, যদি না কেউ এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার তাড়াই না থাকে। ইতিমধ্যে তাঁর বেশিরভাগ বন্ধুরা এলাকা  ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে, যাদের সাহায্য করার মত বা লালিত স্বপ্নগুলি পূরণ করতে পাশে দাঁড়ানোর মত বন্ধু বা আত্মীয় ছিল।  তবে ওরা এখানেই থেকে গেল। এখানেই ওর জন্ম এবং এটাই ওর চির পরিচিত জায়গা। সর্বোপরি, সে এখানেই তাঁর মা এবং বাবাকে সমাহিত করেছে। এখানকার রাস্তাঘাট ওর এত চেনা যে চোখ বন্দ করে সে এখানকার রাস্তাই চলতে পারে এবং দুধারে কি আছে তাও বলে দিতে পারে।  

ওর গাড়ীর হেডলাইট কোনোরকম কাজ করছে। ইতিমধ্যে অন্ধকার নেমে এসেছে এবং সেই সাথে হালকা তুষারপাত হচ্ছে। সে নিজ গতিতেই এগিয়ে চলল।

এরকম পরিস্থিতিতে রাস্তার ধারে বিপদে আটকে থাকা এক অসহায় বৃদ্ধাকে সে প্রায় না দেখেই চলে যাচ্ছিলো। দিনের শেষে ওই ক্ষীণ আলোতেও সে বুঝল যে ওই বৃদ্ধার সাহায্যের দরকার। সে বৃদ্ধার মার্সিডিজটার সামনে তার গাড়ীটা দাড় করিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল।

বৃদ্ধা তার মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করলেও তার চোখে মুখে চিন্তা ও ভয়ের ছাপ সুস্পষ্ট। গত কয়েক ঘন্টা ধরে তাকে সাহায্য করতে কেউ থামেনি।

-লোকটা দেখতে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র। লোকটা তাকে ক্ষতি করবে নাত? বৃদ্ধা এই কনকনে শীতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল মাত্র অজানা আসঙ্খাই কাউকে এই হাড় কাঁপানো শীতে বাইরে দাড়িয়ে থাকার সাহস জোগাতে পারে।

-আমি আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি, ম্যাম। আপনি ঠাণ্ডাই বাইরে দাঁড়িয়ে না থেকে আপনার গাড়ীর ভিতরে গিয়ে অপেক্ষা করুন দেখি কী করা যাই। যাইহোক, আমার নাম জো।   

বৃদ্ধার সমস্যা খুব সাধারন- ফ্ল্যাট টায়ার, তবে একজন বৃদ্ধা মহিলার পক্ষে এ রকম নির্জন জায়গাই যথেষ্ট ভয়ের কারন। জো জ্যাক লাগানোর জন্য জায়গা খুঁজতে মার্সিডিজটার নীচে হামাগুড়ি দিল, হাত এবং কনুইয়ের দু একটা জাইগা ছিলে গেল কিছুটা। তবে জো তাড়াতাড়িই টায়ার পরিবর্তন করতে সক্ষম হল। তার জন্য তাকে শুধু একটু নোংরা হতে হল আর তার হাতগুলিও আঘাত পেল। জো যখন টায়ারের লাগ নাট গুলো টাইট দিচ্ছিলো তখন বৃদ্ধা তার গাড়ীর জানালা নামিয়ে জো‘র সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন যে তিনি সেন্ট লুই এর বাসিন্দা এবং সেখানেই যাচ্ছিল। তিনি এরকম অবস্থাই তাকে সাহায্য করার জন্য জো‘কে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা খুজে পাচ্ছিলেন না। জো কাজ শেষে ট্রাঙ্কটি বন্ধ করতে করতে একটু হাসল কেবল।

বৃদ্ধা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তাকে কত টাকা দিবেন। এই বিপদের মুহূর্তে সাহায্য করার জন্য যেকোন পরিমাণ টাকা বৃদ্ধার জন্য বেশী হবে না। কারন তাকে সাহায্যের জন্য জো না থামলে কত কিছু ঘোটতে পারতো সে কথা কল্পনা করতে বৃদ্ধার গায়ের লোম শিউরে উঠছিল।

জো তার এই কাজ টুকুর জন্য টাকার কথা একদমই ভাবেনি। কারণ এটি তাঁর কাছে কোন চাকরি ছিল না। এটি ছিল একজন বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করা। বিধাতা তাকে অতীতে এমন প্রচুর সাহায্য তাকে করেছেন।

-জো বৃদ্ধাকে বলল যে, যদি তিনি সত্যিই তাকে প্রতিদান দিতে চান, তাহলে কখনো কোন বিপদে পড়া মানুষকে যেন এমনি ভাবে সাহায্য করেন … এবং জো‘র কথা একটু চিন্তা করেন।

বৃদ্ধা তার গাড়িটি স্টার্ট দিয়ে না চলা শুরু করা পর্যন্ত দাড়িয়ে রইলো জো।  

এই কনকনে শীতের দিনটি তার জন্য হতাশাজনক ছিল, কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনাটির পর এই গোধূলি বেলাই ঘরে ফিরতে বেশ ভাল বোধ হল ওর।  

রাস্তা ধরে কয়েক মাইল এগুতেই বৃদ্ধা একটি ছোট ক্যাফে দেখলেন। তিনি সাধারণত এ ধরণের ক্যাফেতে যান না। কিন্তু কী ভেবে তিনি ওই ছোট্ট রাস্তার ধারের ক্যাফেতে কিছু একটা খাওয়া আর শরীরটাও একটু গরম করে নেয়ার মনস্ত করলেন।

অল্প বয়সী ওয়েট্রেস একটা তোয়ালে নিয়ে এলো বৃদ্ধার ভিজে চুল মুছে দিতে। ওয়েট্রেসটি শরীরে সারা দিনের কর্ম ক্লান্তি প্রতিভাত হয়ে উঠলেও তার মুখে মিষ্টি হাসি বৃদ্ধাকে আবিভুত করল। তিনি আরো আবিভুত হলেন যখন লক্ষ্য করলেন যে ওয়েট্রেসটি প্রায়  আট মাসের গর্ভবতী। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও মেয়েটি এত প্রানবন্ত।  বৃদ্ধা ভাবলেন- যার দেয়ার মত প্রকৃতই  তেমন কিছু নেই যার, সে  কীভাবে একজন অপরিচিত মানুষকে এধরনের মনোভাব প্রদর্শন করতে পারে। তখন তার জো‘য়ের কথা মনে পড়ল। বৃদ্ধা তার খাবার শেষ করার পরে একশো ডলারের একটি নোট প্রদান করলেন। তা ভাঙ্গিয়ে আনার জন্য ওয়েট্রেস ভিতরে গেল।

ওয়েট্রেস ফিরে এসে বৃদ্ধাকে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লো।

টেবিলের উপর ওয়েট্রেসটি ন্যাপকিনে লিখিত কিছু লক্ষ্য করলো। ন্যাপকিনের ভিতরে জড়ানো আরো একশো ডলারের পাঁচটি নোট। বৃদ্ধা কী লিখেছেন তা পড়ে তার চোখে জল এসে গেল।

“আপনি আমার কাছে কোনও ঋণী নন, আপনি যেখানে দাড়িয়ে আছেন আমিও কিছুক্ষণ পূর্বে সেখানে ছিলাম। কেউ একজন আমাকে সাহায্য করেছিল, আমি আপনাকে সেভাবে সহায়তা করছি। আপনি যদি সত্যিই আমাকে প্রতিদান দিতে চান তবে ভালোবাসার এ শেকল যেন আপনার সাথে শেষ না হয়।”

তখনো হাতে বেশ কিছু কাজ ছিল। সেগুলো শেষ করে সেরাতে যখন সে কাজ থেকে বাড়ি এসে বিছানায় গাটা এলিয়ে দিয়ে বৃদ্ধা টাকা গুলো দিয়ে কী লিখেছিল তা নিয়ে ভাবছিল।

-তিনি কীভাবে জানতে পারলেন যে তার এবং তার স্বামীর সে সময় টাকাগুলির কতটা প্রয়োজন? পরের মাসে তাদের শিশুর জন্ম নেয়ার জন্য তাদের ঐ পরিমান টাকার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সে আর তার স্বামী অনেক উদ্বিগ্ন ছিল।

তার  স্বামী ক্লান্ত দেহে তাঁর পাশে ঘুমিয়ে, সে তাকে একটি হালকা চুম্বন দিয়ে নীচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,”সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, আমি তোমাকে ভালবাসি জো।”

Category: Bangla, Moral Stories

Write a comment