ভাতিজা

 

 

বিশেষ করে ছুটির দিনে মাঝে মধ্যে বিকেলে রেষ্টহাউজে আমার জন্য বরাদ্দ দোতলায় কর্নার রুমের  ঝুলানো বারান্দায় বসি। পাহাড়ি জায়গা এটা, রেষ্টহাউজটার সাথেই পাহাড়ের ঢালে টেরাছিং পদ্ধতিতে তৈরী ক্ষেতে চাষ করা লকলকে ধান গাছের সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে কাচা পাকা ধানের শিষ গুলোর দোলনি, মনে হয়  যেন প্রকৃতির সাথে ওরাও নিজেদেরকে বিলিয়ে দেয়ার আনন্দে মাতোয়ারা। এ দৃশ্য মনকে উদাস করে  দেই।  

জন্ম যেন শুধু দেয়ার জন্য    প্রভুর পায়ে সমর্পনে ধন্য

           একি তাঁর খেলা     খেয়াল না হেলা অবলীলা!

খেলি শুধু, আমি যে খেলার পুতুল       জানিনা শুদ্ধ কিম্বা ভুল।

এমনি করে একদিন ওরে,  ডুবে যাবে বেলা   সাঙ্গ হবে সব হেলা খেলা।

দেয়া যে কি মধুর      ঈন্দ্রীয় জ্ঞানে বোঝা তা সুদূর

সংগ্রহে শুধু হারানোর ব্যথা    সমর্পনে তার স্থান নেই কোথা।

যাঁরই দান ফিরিয়ে দেবো তাঁকে

মাটি নেবে গাছ পাতা আর ধান নেবে কৃষকে।

আমি কি গাছ, পাতা, না ধান কি পেলাম কি পাব!

খেলার ছলেই একদিন আমি নিঃশেষ হয়ে যাব।

নতুন ষ্টেশানে জয়েন করেছি কয়েকদিন হলো। এখনো বাসা না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে রেষ্ট হাউজে উঠেছি।

জায়গাটা পাহাড় ঘেরা। উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি তারই মাঝে কিছুটা সমতল জায়গা। এরই একধারে পাহাড়ের গা ঘেঁসে দাড়িয়ে রেষ্ট হাউজটা।

জায়গাটা নির্জন আর কোলাহল মুক্ত।

এখান থেকে আমার অফিস দুই কিলোমিটারের মত দূরে। সাড়ে সাতটা থেকে দুটো পর্যন্ত অফিস। বিকেলে খেলাধুলা বা হাটাহাটি।

দোতলা রেষ্ট হাউজটার ওপরের তলায় একদম কোনায় দুটো রুম নিয়ে থাকি।

রেষ্ট হাউজ বিল্ডিয়ের পশ্চিম দিকে পাহাড়ের ঢাল কেটে টেরাস তৈরী করে বেশ কয়েক খন্ড ক্ষেত বের করে সেখানে ধানের চাষ করছে কেউ। এরই কল্যানে ও দিকের পাহাড়টা পরিষ্কার অন্যান্য দিকের তুলনায়। রেষ্ট হাউজের ড্রেন দিয়ে পানি গড়িয়ে পিছনের একটা ডোবায় জড়ো হচ্ছে আর সেখান থেকে পানি সেচ করে ক্ষেতে ছড়িয়ে চাষ করা হচ্ছে।

কাঁচা পাকা ধানের শিষ গুলো দেখলে মনটা উদাস হয়ে কেমন আনচান করে ওঠে। জীবনের অর্থটা এলোমেলো হয়ে যায়।

হঠাৎ বাসের পটকার আচমকা বেসুরো আওয়াজে পাখি গুলোর মত আমিও আঁতকে উঠি মাঝে মধ্যেই।

পাহাড়ের ঢালে ছোট একটা মাচা ঘর উপরে ছন দিয়ে ছাউনি দেয়া। ঐ মাচা থেকে অনেকগুলো জোড়া দেয়া লম্বা একটা রশি দেখা যাচ্ছে ওটার আগায় একটা বাশের পটকা বাধা ক্ষেতগুলোর মাঝখানে। মাচায় বসে রশি টেনে পটকা বাজিয়ে কেউ একজন পাখি তাড়াচ্ছে।

যতটা দেখা যায় তাতে মনে হয় মাচার উপর বসে একটা অল্প বয়সের ছেলে খুব একাগ্রতার সাথে রশিটা টেনে পটকা বাজিয়ে পাখি তাড়াচ্ছে। রশি টানার কাজে ও খুব আন্তরিক, অন্য কোন দিকেই খেয়াল নেই ওর। একটা পাখিও ক্ষেতে বসতে দিচ্ছে না।

বেশ কয়েকদিন পরের ঘটনা। সেদিন সাপ্তাহিক ছুটি। সকাল আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে আমার পাঁচ বছরের ছেলে আকাশ ওর মাকে তাড়াতাড়ি রেডি করে দিতে বলছে।

-তাড়াতাড়ি করো, ভাতিজা এখনই এসে যাবে, খেলবো আমরা।

আকাশের কথা শুনে আমি একটু কৌতুহলী হয়ে উঠলাম। ভাতিজাটা কে জানতে চায়লাম।

ওর কথা শুনে বুঝলাম মাচার উপর বসে রশি টানা ওই ছেলেটার কথা বলছে ও।

ওর ওই অদ্ভুত নামটার কথা জিজ্ঞেস করাতে আকাশ ব্যস্তভাবে বেরিয়ে যেতে যেতে আমাদের কাজের ছেলেটাই ওকে ওই নামে ডাকার জন্য বলেছে বলে জানালো।

একটু বাদেই আমিও বেরিয়ে বারান্দায় যেয়ে দাড়ালাম।

কুচকুচে কালো গায়ের রং, মাথায় ঝাকড়া একগাদা চুল রোগা চেহারার ছেলেটা। পেটটা মোটা, দেখলেই বোঝা যায় কৃমিতে ভরা। আকাশের সমবয়সী হবে। তবে প্রায় এক মাথা খাটো ওর থেকে। পরনে পুরোনো একটা হাফ প্যান্ট আর গায়ে ময়লা গেঞ্জি।

যে গাম্ভীর্য্য নিয়ে মাচায় বসে থাকে তার ছিটে ফোটাও দেখা যাচ্ছে না ওর মধ্যে। খিল খিল করে প্রান খুলে হাসছে আর অনেক কথাও বলছে। খেলা ছাড়া অন্য কোন কিছুতেই খেয়াল নেই ওর।

খেলার মাঝে মাঝে বসে জীব বের করে হাফিয়ে নিচ্ছে।

ওদিকে ওদের পাশেই ধানের ক্ষেতে মনের সুখে পাখিরা ধান খেতে খেতে কিচির মিচির করছে।

আমাদের তের চোদ্দ বছরের কাজের ছেলে জুলফু মিঞাও খেলছে ওদের সাথে। আমি জুলফু মিঞাকে ডাক দিয়ে ঢিল মেরে পাখিগুলো তাড়িয়ে দিতে বললাম।

আমার ডাকে ওই ছেলেটারও বোধহয় একটু খেয়াল হলো। ও তাকালো ধান ক্ষেতের দিকে। কিন্তু ওর ভিতর কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। ও আগের মতোই আবার খেলাতে মেতে উঠলো।

অবাক লাগলো একটু আগে মাচার উপর বসা অবস্থায় ক্ষেত থেকে পাখি তাড়ানোর ব্যাপারে ওকে যেমন বড় মানুষের মত কর্তব্য পরায়ন মনে হচ্ছিলো এখানে নেমে আসার পর ওর ভিতর থেকে সে বোধটুকু যেন উবে গিয়েছে। মাচা থেকে নেমে ও যেন নিজের আসল বয়সটা ফিরে পেয়েছে।

অবসর সময়ে মনের অজান্তে ওকে নিয়ে ভেবেছি কখনো কখনো। যে বয়সে আকাশের মত ওর খেলাধুলো করে সময় কাটানোর কথা সে বয়সে নিরেট বাস্তবতা ওকে জীবিকা উপার্জনে বাধ্য করেছে।

দেখে মনে হয় ও খুব অসুস্থ। ভাবছি ওকে একদিন আমাদের অফিসের ডাক্তারকে দিয়ে দেখিয়ে কিছু অসুদ পত্র দিয়ে দেব। ছুটির কোন একদিন ডাকবো ওকে। ওর বাবা মার কথা জিজ্ঞেস করবো বলেও মনোস্ত করলাম।

আর নামটাও ভালো করে জেনে নেব বলে ভাবলাম।  

আরো কয়েকদিন পরের ঘটনা। পরদিন সাপ্তাহিক ছুটি তায় রাতে ঘুমাতে একটু দেরী হচ্ছে। আকাশ ঘুমানোর জন্য পাশে শুয়েছে।

কেন জানি হঠাৎ করেই ছেলেটার কথা মনে পড়লো। আকাশকে এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম -বাবা তোমার ভাতিজার খবর কি।

ও হাই তুলে ঘুম ঘুম গলায় জবাব দিল -ভাতিজা কয়েকদিন ধরে আসে না বাবা।

-ভাতিজা আসে না!

একটু অবাক হলাম। কি একটা ভেবে জিজ্ঞেস করলাম -তা কেন আসেনা তোমার ভাতিজা।

আকাশ জবাব দিল না। দেখলাম ও ঘুমিয়ে পড়েছে। ভাবলাম ওরতো জানারও কথা না। হয়তো কোন কারণে আসছে না।

খুব একটা রাত হয়নি। বেরিয়ে সামনের বারান্দায় দাড়ালাম।

প্রায় অর্ধ গোলাকার চাঁদটা পশ্চিম আকাশে পাহাড়ের সারির নিচ অব্দি নামেনি তখনো। কিন্তু তলিয়ে যেতে আর বোধহয় দেরী নেই।

পাহাড়ের সারীর এদিকটা আলোকিত বৈদ্যুতিক বাতির আশির্বাদে। আর পাহাড়ের কালো ঢাল গুলো শীতে জড়ষঢ় হয়ে বোকার মত তাকিয়ে আছে। সব অন্ধকার যেন জমাট বেধেছে উল্টো ঢালে।

চাঁদের আলোয় ধানের সোনালী ডগাগুলো ছোট ছোট দাত বের করে হাসছে। বোধহয় নিঃশেষ হওয়ার সুখ ভাবনায়।

ধান কাটার সময় হয়েছে। মনে হলো এখনইতো বেশী করে পটকা বাজিয়ে পাখি তাড়ানোর কথা আর এ সময় ভাতিজা আসে না। নিশ্চয় ওর শরীর খারাপ হয়েছে।

রেষ্ট হাউজের অদুরে সার্ভেন্টস কোয়াটারসের একটা রুমে জুলফু মিঞা ঘুমায়। ওর রুমে আলো জ্বলছে তখনো। ভাবছি ডাকবো নাকি ওকে ভাতিজার ব্যাপারে কিছু জানে কিনা জিজ্ঞেস করার জন্য।

দেখি কিছুক্ষনের মধ্যে জুলফু মিঞা নিজের থেকেই বেরিয়ে আসলো।

-স্যার কিছু লাগবে।

বোধহয় ওর ঘর থেকে আমাকে ওদিকে তাকাতে দেখে বেরিয়ে এসেছে।

জুলফু মিঞার কাছ থেকে জানলাম ছেলেটার বাড়ী সামনের পাহাড়ের সারির ওপারের ঢালে। ওর বাবার নাম কালু মিঞা। এখানকার এ্যাডমিন অফিসারের তত্তাবধানে হরটিকালচার বাগানে দিন মজুরী করে। আর কালু মিঞার বউ এই কলোনীর বিভিন্ন অফিসারের বাসায় কাজ করে।

এ্যাডমিন অফিসার ওকে বিশেষ নেক নজরে দেখে। আর তায় ওকে পাহাড়ের সারির ওপাশের ঢালে সরকারী জায়গায় একটা চালা তুলতে মৌখিক অনুমতি দিয়েছে। সারাদিন কাজ শেষে ওদের ফিরে যেতেও সুবিধা আর তাতে করে ওরা একটু বেশী সময় ধরে এদিকে কাজ করলেও ওদিকে ফিরতে অসুবিধা হয় না।

পাহাড়ের অন্যঢালে ওদের চালা ঘরটা যেন কোন ভাবেই এদিক থেকে কারো নজরে পড়ে দৃষ্টিকটুও না লাগে তার জন্য এ্যাডমিন অফিসার ওকে খুব করে সাবধান করে দিয়েছে।

-কালু মিঞা তুমি ঘর করে থাকবা, একটু ক্ষেত টেত করবা আমার তরফ থেকে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু অন্য কারো তরফ থেকে কোন আপত্তি আসলে আমার কিছু করার থাকবে না। এমন ভাবে সব করবা যেন তুমি থেকেও নেই।

কালু আর ওর বউ এ্যাডমিন অফিসারের কথাগুলো সবসময় স্মরণ রেখে খুব সতর্ক হয়ে চলে।

ওরা স্বামী স্ত্রী মিলে অবসর সময়ে পাহাড় কেটে কেটে ওই ক্ষেতটুকু বের করেছে। অনেক সময় লেগেছে।  

জুলফু আরো জানালো যে ছেলেটা ওদের নিজের না। কালু মিঞার ভায়ের ছেলে ও। ওর মা বাবা দুজনই মারা গিয়েছে ও যখন খুব ছোট। নিজেদের ছেলে মেয়ে হয়নি তায় কালু মিঞা ভায়ের ছেলেকে এনে রেখেছে। কালু মিঞার স্ত্রীও ওকে নিজের ছেলের মতই আদর করে।

দেব দেব করে ওর নামটায় দেয়া হয়নি। কালু মিঞা ওকে আদর করে ভাতিজা বলে আর সে ভাবেই অন্য সবাই ওকে ওই নামেই ডাকে।

পরদিন ভোরে উঠে জুলফুকে নিয়ে ভাতিজাকে দেখতে গেলাম।

রেষ্ট হাউজের অদূরে পাহাড়ের ঢালে যে মাচা ঘরটা ওটার পাশ দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একপেয়ে পথটা পাহাড়ের চুড়ায় উঠে গিয়েছে।

পাহাড়ের সারির উচ্চতা কম করে হলেও সাত আটশো ফুটতো হবেই। পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠতে বেশ কষ্ট হলো।

ওদিকটা একেবারে জংলা। রেষ্ট হাউজের বারান্দায় বসে দেখা যাওয়া দৃশ্যের সাথে এর কোন মিল নেই।

পাহাড়ের চুড়াটা পেরিয়ে আরো কিছুটা নামার পর পাহাড়ের বাকা ঢালে কিছু গাছপালা নজরে পড়লো। ওরই ফাঁক দিয়ে একটা চালা ঘরের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে।

ততোক্ষনে সুর্য্য কিরণ পাহাড়ের চুড়া আর পুব ঢালে শীতের কুয়াশার জমাট বাধা ফোটা শুষে নিলেও এখানে পাহাড়ের অন্য ঢালে তখনও কুয়াশার হীম শীতল ফোটাগুলো ভারী হয়ে টপ টপ করে কালু মিঞায় জীর্ণ টিনের চালের উপর পড়ছে।

জমাট বাধা নিস্তব্দতা যেন কান পেতে শুনে শুনে একটা একটা করে সে ফোটা গুনছে নীরবে।

কালু মিঞার চালা ঘরটার কাছে যেতেই একটা চাপা কান্নার একটা ক্ষীণ সুর কানে আসলো। থমকে  দাড়ালাম, মনে হচ্ছে দূর থেকে সুরটা ভেসে আসছে।

খোলা দরজা দিয়ে দেখলাম শুকনো বাশের বেড়ার গায়ে মুখ লুকিয়ে কাদছে কালুর স্ত্রী।

সেসুর এতই ক্ষীন যে নিরবিচ্ছিন্ন এই প্রকৃতির জন্যও একটুও কোন বিরক্তির কারণ হচ্ছে না। সে করুন সুর মুর্ছনায় মোহিত হয়ে প্রকৃতিও যেন তার নির্যাস নিংড়ে মুর্ছিত হয়ে আছে।

অদুরে পাহাড়ের ঢালে কালু মিঞা আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে। খালি গা হাতে পায়ে মাটি মাখা। পাশে সদ্য বানানো ছোট্ট একটা মাটির ঢিবি।

কোদালটা পাশে পড়ে।

ক্ষীন স্বরে ফুস ফুস করে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।

কালু মিঞা কাঁদছে নীরবে। যেন কেউ শুনতে না পায়।

Category: Bangla, Short Story

Write a comment

One Comment