দৈবক্রম – ৯ 

 

 

সেদিন ভোর রাতের ট্রেনে চলে যাবে ভাবনা। প্রতিবারের মত বাবা ওর সবকিছু গোজগাজ করে দিয়েছে। মেয়ের বই কাপড় সব গুছিয়ে দিয়েছে নিজ হাতে। ওর বাবা আরিফ সব বারই এমনটিই করে, ভাবনার কোন আপত্তিই মানে না।  

কিন্তু এবার ভাবনা একদম কোন আপত্তি করেনি। বাবা যখন নিরবে আনমনে সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে ওর প্রতিটি জিনিস এক এক করে গুছিয়ে দিচ্ছিলো, ভাবনা তখন খাটের উপর বসে নিস্পলক চোখে শুধু দেখছিলো ওর বাবাকে।

-কি পেল ওর বাবা জীবনের কাছ থেকে! ত্যাগ দিয়েই শুরূ ওর জীবনটা। দিতে দিতে বাবা যে পরিশ্রান্ত, কি আছে তার কাছে দেয়ার মত বাকি!

বাবাকে দেখে এত তৃপ্তি জীবনে কখনো পায়নি ভাবনা। মনে হচ্ছিলো জীবন্ত রক্ত মাংসের এক বঞ্চিত দেবতা দর্শন করছে ও।

গভীর রাতে বাবা ডেকে তুললো ওকে। ষ্টেশানে যেতে হবে।

জেগেই ছিল ভাবনা। কিন্তু বাবার মুখে ওই আদর মাখা ‘মাগো’ ডাকটা শোনার জন্য জেগেও ঘুমের ভান করে ছিল ভাবনা।

ভাবনার কোন কষ্ট লাঘবের সময়ই বাবা ‘মাগো’ বলে ডাকে ওকে। বাবার ওই ডাক শুনে ভাবনা সব কষ্ট উপেক্ষা করে সাক্ষাৎ নরকেও লাফিয়ে পড়তে পারে।

বাবা ষ্টেশানে এসেছিল ওকে উঠিয়ে দিতে। চোখ দুটো ফোলা ফোলা রাতে ঘুম হয়নি বোঝা যায়। কিন্তু ঘুমের ঘাঁটটির জন্য নয় বাবা নীরবে কাঁদে ভাবনা চলে যাওয়ার সময় হলে। ট্রেনের রিজার্ভ করা কামরায় উঠে এক এক করে সব মালপত্র বার্থে উঠিয়ে দিয়েছে। বাবা একটি বারের জন্যও তাকায়নি ওর চোখের দিকে।

ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে বাবা বেরিয়ে যাওয়ার সময় ভাবনা টুপ করে নিচু হয়ে বাবাকে সালাম করতেই আরিফ আর ধরে রাখতে পরিনি নিজেকে। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো বাচ্চাদের মত।

এমনভাবে কাঁদতে কখনো দেখেনি বাবাকে।

বাবার ওই মুখটা কিছুতেই সরছে না চোখের সামনে থেকে।

-আর নয় বাবাকে আর কোন ত্যাগ স্বীকার ও করতে দেবে না। অনেক দিয়েছে, বাবা যা দিয়েছে তা যে কোন হিসেবেই তার ভাগ থেকে অনেক বেশী।

-জামিল ওর ভাই ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে ভাবনা। তারপর ওরা দুভাই বোন বাবার সামনে দাড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলবে-বাবা অনেক ক্লান্ত তুমি, আর একটুও নয় এখন তোমার শুধু বিশ্রাম নেয়ার পালা।

ভাবনা জানে না ওর মা কোথায় আছে কেমন আছে। তাকে পেলে বলবে- অভাগী তুমি, নয়লে দেবতার মত এই জীবনারাধ্য এত হেলায় হারালে!

-আমি খুবই দুঃখিত, এতক্ষণ ধরে আমার মালপত্রগুলো আপনার কামরায় রাখার জন্য। একটু দেরী হওয়াতে আমি আসবো না ভেবে টিটি আমার সিটটা অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছে। টিটিকে খুজে বের করে ঝামেলা মিটাতে এতটা দেরী হল। 

ঝড়ের মত প্রবেশ করে মালপত্রগুলো উঠিয়ে হাতে নিতে নিতে পরশ বললো।

সম্বিত ফিরে পেয়ে চোখ তুলে তাকালো ভাবনা। অন্য সিটের উপর টান টান হয়ে শুয়ে লায়লী ঘুমিয়ে পড়েছে ততোক্ষণে।

-যাক বাবা বাচা গেল উনি ঘুমাচ্ছেন। লায়লীর দিকে চোখ পড়তেই কিছুটা স্বগতঃ স্বরেই বললো পরশ।

পরশ ব্যগটা কাধে ঝুলিয়ে ভারী সুটকেসটা টানা হেচড়া করার সময় ওকে ভাল করে দেখলো ভাবনা।

মনে হল ছেলেটা খুব চেনা ওর। পরশের কথা বলার ধরণ ওর ছটফটানি ভাব খুব পরিচিত ভাবনার।

ও সুটকেসটা টেনে বের করতে করতে ভাবনা বিনা দ্বিধায় ডাকলো- পরশ!

থমকে দাড়ালো পরশ।

পত্রিকা হাতে জানালার ধারে বসে থাকা ভাবনার দিকে এতোক্ষন ভাল করে তাকিয়ে দেখেনি পরশ। নিজের নাম ধরে ডাক শুনে হতচকিত হয়ে তাকালো ওর দিকে।

ওকে বেশীক্ষণ ভ্রমের মধ্যে না রেখে মৃদু হেসে ভাবনা বললো- ভাবনা, ভাবনা সরকার আমার নাম।

মহুর্ত সময় নিল বোধহয় বছর সাতেকের পাতা উল্টাতে।

-ভাবনা তুমি!

চোখ দুটো বড় বড় করে তাকালো ভাবনার দিকে।

একটু সময় নিল নিজের অবস্থানটা র্নিণয় করতে। তারপর সুটকেসটা ঠেলে আবার কম্পার্টমেন্টের ভিতর ঢুকিয়ে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামাতে নামাতে বললো- আরে এতক্ষন ধরে চুপচাপ ম্যাডামের মত বসে আছ। আর আমি ভাবছি কে না কে।

ততোক্ষনে উঠে বসেছে ভাবনা। পরশ বসলো ওর সিটে।

-আচ্ছা এত বছর পর আমাকে তুমি চিনলে কি ভাবে, আর নামটায় বা মনে থাকলো কি করে!

-উন্নত স্মরণশক্তি হাই-বার্থের পরিচায়ক।

গলাটা একটু ভারী করে জবাব দিল ভাবনা।

চোখে চোখে তাকালো ওরা। দৃষ্টির তীক্ষতা বাড়িয়ে সময়ের দুরত্বকে যেন নিঃশ্বেস করে দিল। তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো দুজনে।

অতীতের একটু ঝাপসা হওয়া স্মৃতিগুলো পরিস্কার হয়ে গেল এক মুহুর্তে।

ক্লাস ফাইভ আর সিক্স এ দুই ক্লাস ওরা পড়েছে এক সাথে। ভাবনার বাবার বদলির কারণে ভাবনা যখন ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলো তখন ফার্স্ট টার্ম শেষ।

খুব মেধাবী ছাত্র পরশ, ক্লাসের ফার্স্ট বয়। বরাবরই ক্লাস প্রিফেক্ট। পড়াশোনাতেই শুধু নয় খেলাধুলাতেও পারদর্শী।

ক্লাস টিচার পরশকে দায়িত্ব দিলেন ফাস্ট টার্মের পড়াগুলো ধীরে ধীরে ভাবনার নোট বুকে লিখতে ওকে সাহয্য করার জন্য।

‘শো-অফ’ করা পরশের স্বভাবগত। সেদিন টিফিন পিরিয়ডে পরশ গলাটা যথাসম্ভব ভারী করে বললো- দেখ ভাবনা, ক্লাসের অনেক বাড়তি কাজ আমাকে করতে হয় প্রিফেক্ট হিসাবে, তুমি অতটা ঠিক বুঝবে না। যাহোক, সকালে ক্লাস শুরূ হওয়ার আগে কিছু কাজকর্ম আমাকে করতে হয় তায় আটটায় এসেমব্লি শুরূ হলেও প্রতিদিন সকাল ষাড়ে সাতটার ভিতর আমি চলে আসি। প্রতিদিন সকালে একটা করে খাতা আমি তোমাকে দেব ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আর ওই দিন রাতের মধ্যে লেখা শেষ করে পরদিন সকালে আমাকে ফেরত দেবে।

তারপর একটু ঊননাসিকতা সহকারে বললো- দেখ আমার হাতের লেখা খারাপ, তায় তুমি যে গুলো শব্দ পড়তে পারবে না সেগুলো পরদিন সকালে ক্লাস শুরূ হওয়ার আগে আমার কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে আমার কাছ থেকে জেনে নেবে।

পরশ গাম্ভীর্য বজায় রেখে একটু ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললো- এখনই টিফিন পিরিয়ড শেষ হবে, নিজের জাইগায় গিয়ে বস। তবে হ্যাঁ, একটা কথা মনে রেখ, শেকসপিয়ারের মতে ভাল হাতের লেখা লো বার্থের লক্ষণ।

পরশের মন্তব্যটার অর্থ ওই মুহুর্তে ঠিক বুঝলো না ভাবনা। পরে একটু ভেবে বুঝলো যে নিজের খারাপ হাতের লেখার অজুহাত ওটা। তবে মনে মনে ভাবলো- পরশ একজন শক্ত প্রিফেক্ট।

এর একদিন পরের ঘটনা। প্রিনসিপাল আসলেন ক্লাস পরিদর্শনে। সব কিছুই ঠিকঠাক পরিপাটি, টু শব্দটিও নেই। সব কিছুই পরিদর্শন করলেন, দু একজনের কাছে ক্লাস টিচার এবং প্রিনসিপালের নাম এবং ওই দিনের পাঠ্য বিষয়ের কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন।

বেশ খোশ মেজাজেই ছিলেন তিনি। শেষে যাওয়ার আগে ব্ল্যাকবোর্ডের উপরে লেখাগুলো নিরীক্ষা করতে লাগলেন।

প্রতিদিনকার মত সেদিনও সকালে পরশ ভালভাবে ব্লাকবোর্ড পরিস্কার করে নিয়মমাফিক তারিখ, টিচারের নাম, উপস্থিতির সংখ্যা, সাবজেক্ট সবই নিজ হাতে ঠিকঠাক করে লিখেছে।

-ক্লাস প্রিফেক্ট কে?

সভয়ে উঠে দাড়ালো পরশ।

পরশের পোশাক পরিচ্ছদ, চেহারা সবই প্রকৃতই আকর্ষনীয়। সামনের সারিতে দাড়নো পরশের পিঠ চাপড়ে দিয়ে প্রিনসিপাল বললেন- ভেরী গুড পরশ, তবে হাতের লেখা খারপের জন্য কোন ওজরই গ্রহনযোগ্য নয়।

তারপর প্রিনসিপাল ক্লাস টিচারকে উদ্দেশ্য করে খুব গম্ভীর ভাবে বললেন- আমার পরবর্তি ভিজিটের আগে পরশ যেন ওর হাতের লেখা অবশ্যই উন্নতি করে।

চোখের এক কোনা দিয়ে ভাবনা পরশকে দেখার চেষ্টা করলো। পরশ রিতিমত ঘামছে তখন।

এরপর ওর হাতের লেখা ভাল করার জন্য যে অভিযান আর ক্লাস টিচারের যে বকাবকি তা অন্য কারো কাছ থেকে না হলেও ভাবনার কাছ থেকে লুকানোর জন্য সদা তৎপর থাকতো পরশ।

হাই বার্থ সম্পর্কে ভাবনার মন্তব্য মুহুর্তের মধ্যে এই দুই বাল্য সাথিকে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো মনে করে অট্টহাসিতে দুজনই ফেটে পড়লো।

তাতে ঘুমের ব্যঘাত ঘটলো লাইলী বেগমের। ঘুম ভেঙে ওদেরকে ওরকম ভাবে হাসতে দেখে চোখ দুটো ছানাবড়া করে তাকিয়ে রইলো সে।

-চিন্তার কোন কারণ নেই খালা, এ পরশ, আমার ছোট বেলার বন্ধু।  

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা লায়লী বেগমকে আশ্বস্থ করলো ভাবনা।

Category: Bangla, Novel

Write a comment