দৈবক্রম – ১১

 

 

 

শেখ সরোয়ার মণ্ডল অর্থাৎ ভাবনার মা অনন্যার বাবা তার প্রথম পর পর দুটো ছেলে  তারপর ওই একমাত্র মেয়ে নিয়ে সংসার তার। ব্যবসায়ী পরিবার আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে। শহরের অভিজাত এলাকায় নিজ বাড়ীতে বসবাস করেন।

গ্রামের এক সমৃদ্ধ রক্ষণশীল পরিবারের মানুষ সরোয়ার মণ্ডল। ব্যক্তিগত জীবনে একান্তই সাদাসিদা ও ধর্মভীরূ। যা তার পোশাক পরিচ্ছদ কথাবার্তা বা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে পরিস্কার ভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়েদেরকেও তেমনি ভাবে গড়তে চেয়েছিলেন।

সরোয়ার মণ্ডলের শ্বশুর বাড়ীর পরিবার ধণাড্য শহুরে এবং আধুনিক চিন্তা চেতনা সম্পন্ন। শ্বশুর কাজী হাসান মৃধার পরিবার এ শহরের পুরোনো বাসিন্দা।

সরোয়ার মত্তলের স্ত্রী নাসিমা মণ্ডল ভারী শরীরের অধিকারী শ্যামলা বর্ণের আধিপত্য বিস্তারকারী স্বভাবের একজন মহিলা। ছিপছিপে গড়নের ফর্সা লম্বা সরোয়ার মণ্ডলের পাশে যেন চাক্ষুস বেমানান। সরোয়ার মণ্ডলের সাথে একই কলেজে একই সাথে পড়াশোনা করতো। নাসিমা রাজনীতিতে স্বক্রীয় থাকায় সময়মত বিয়ে হয়নি তার।

সরোয়ার মণ্ডলের সাথে নাসিমার বিয়েটা হয়েছিল মুলতঃ শ্বশুর বাড়ীর মানুষের পছন্দে। বিয়ের সময় মেয়ের বয়স, গায়ের রং ইত্যাদি নিয়ে সরোয়ার মণ্ডলের পরিবারের কেউ কেউ আপত্তি তুললেও শহরের নামকরা কাজী পরিবারের সুপ্রথিষ্ঠিত নাম যশের কাছে তা ধোপে টেকেনি।

বিয়ের পরও সামগ্রিক বিচারে সরোয়ার মণ্ডলের পরিবারে কাজী পরিবারের আধিপত্য সুস্পষ্ট।

এ পরিবারে বিয়ে করার পর বলতে গেলে স্ত্রী আর শ্বশুর বাড়ীর মতামতকে উপেক্ষা করতে না পারায় বিয়ের দুবছরের মাথায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হয় সরোয়ার মন্ডলকে। তারপর জমি কিনে বাড়ী বানিয়ে স্থায়ীভাবে শহরে বসবাস করতে শুরূ করেন তিনি। ওর ছেলেমেয়েদের সবার জন্মই এখানে।

ওদের বড় ছেলে রাজ্জাক মণ্ডল পলিটিকাল সায়েন্সে এমএ পাশ করে বসেই ছিল। নাসিমা মণ্ডল তার পলিটিকাল কানেকশানে ওকে লণ্ডনে পাঠিয়ে দেয়। প্রথমে রাজ্জাক ওখানে একটা বাংলাদেশী হোটেলে কাজ করেছিল কিছুদিন। তারপর ওই হোটেলের মালিকের মেয়েকে বিয়ে করে এখন নিজেই হোটেলের ব্যবসা শুরূ করেছে।

পরবর্তিতে নাসিমা মণ্ডল তার ছোট ছেলে মিজানকেও বিএ পড়তে পড়তে লণ্ডনে পাঠিয়ে ভায়ের সাথে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে।

ভালোই আছে ছেলেরা ওখানে। নাসিমা মণ্ডল বছরে অন্ততঃ একবার যায় ওদের দেখতে। থাকে কয়েক মাস। ওখানে গেলেও রাজনীতিক বিভিন্ন মিটিং, রিসিপশান ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়।

দুটো ছেলেই মায়ের স্বভাব পেয়েছ। ওরা দুভাই জীননে যে ভাবে প্রথিষ্ঠা পেয়েছে তার জন্য সত্যিকার অর্থে মায়ের কাছে ঋণি।

ওদের দুভায়ের ছোট অনন্যা। ও পেয়েছে বাবার স্বভাব। ঘরমুখো ওরা দুজনই। বাবাও যেমন দিনের কাজ শেষে সোজা বাড়ী ফিরে আসে অনন্যাও তেমনি ক্লাস শেষে সোজা বাসায়।

সরোয়ার মণ্ডলের শ্বশুরের পরিবার অনেক বড়। ওই একই পাড়াতে শ্বশুর বাড়ী ছাড়াও আরো অনেক শ্বশুরের দিকের নিকট আত্মীয় স্বজনদের বাস। তায় কোন কোন দিন আগে ভাগে ফিরে বাসায় অন্য কেউ না থাকলে সোজা নানা বা অন্য কোন আত্মীয়ের বাড়ীতে চলে যায় অনন্যা। কোন অসুবিধা হয় না।

সরকার পরিবারে অনন্যার বিয়ের প্রাথমিক কথাবার্তা নাসিমা মণ্ডল নিজেই করেছে। ওদের বাড়ীতে যাওয়া, আরিফের বাবা মার সাথে কথা বলা ইত্যদি নাসিমা মণ্ডল ওর বাবা কাজী হাসান মৃধাকে সাথে নিয়ে করেছে। বিয়ের দিনক্ষণও তিনিই ঠিক করেছিলেন। কিন্তু হটাৎ করে মুলতঃ পলেটিক্যাল প্রয়োজনে বিয়ের ঠিক আগেই তাকে লণ্ডনে যেতে হয়।

বিয়ের তখনো মাস খানেক বাকি। যাওয়ার সময় সবাইকে জানালেন- কথা বার্তা সব পাকা, দিন ক্ষণও ঠিক হয়ে রইলো। আশা করা যায় সময় মতই ফিরবো লণ্ডনে কাজ শেষ করে। কিন্তু কোন কারণে ফিরতে যদি দেরী হয় তাতে কিচ্ছু যায় আসে না, বিয়ে নির্ধারিত দিনেই হবে এবং আমি টেলিফোনে মেয়ে জামায়কে আর্শিবাদ করবো।

ইষ্ট লণ্ডনে বাঙালী অধ্যুষিত এলাকায় ছেলেরা থাকে, বড় ছেলে নিজে একটা বাড়ী কিনেছে সেখানে। রাজ্জাক ওর মায়ের পার্টির লণ্ডন শাখার সাথে স্বক্রীয় ভাবে জড়িত। কিছু বিষয় নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে ওদের পার্টির মধ্যে একটা কোন্দল চলছে যার সাথে রাজ্জাক ব্যক্তিগত ভাবে জড়িয়ে পড়াতে ওর ব্যবসার খুব ক্ষতি হচ্ছে। মুলতঃ সে কারণেই পার্টির একটা ডেলিগেশানের সাথে নাসিমা মণ্ডলের লণ্ডন যাওয়া একান্ত জরূরী হয়ে পড়ে।

যাওয়ার পর পরই কোন না কোন প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকে নাসিমা মণ্ডল।

সেদিনও বেশ রাত করে বাসায় ফিরলেন তিনি। ছেলের ড্রইং রূমে বসে অনেক রাত পর্যন্ত পারিবারিক আলাপ আলোচনা চললো। দুছেলে বউমা ছাড়াও রাজ্জাকের শশুর গোলাপ মিঞাও উপস্থিত ছিলেন।

লণ্ডন শহরের একজন পুরোনো ব্যবসায়ী গোলাপ মিঞা। লেখাপড়া তেমন জানে না। ছেলেবেলায় লণ্ডন শহরে এসে হোটেল বেয়ারার কাজ করতে করতে বর্তমানে তিনটে হোটেলের মালিক। রাজনীতি খুব একটা বোঝে না আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে অযথা সময় নষ্ট করার পক্ষপাতিও নন তিনি। কেবলমাত্র শারীরিক সামর্থ আর একাগ্রতা দিয়ে নিজেকে প্রথিষ্ঠা করেছেন এবং তার ছাপ তার শরীর পোশাক আশাক আর কথাবার্তায়   সুস্পষ্ট। এই অযথা পলিটিক্যাল কোন্দলে জড়িয়ে জামায়ের ব্যবসায়ে ক্ষতি হচ্ছে সেটা তারও চিন্তার বিষয়।

রাজ্জাকের সাথে যার কোন্দল তারও হোটেল ব্যবসা নাম জনাব আলী। সামাজিক ভাবে জনাব আলীর সাথে গোলাপ মিঞার চমৎকার সম্পর্ক। যৌবনে একই হোটেলে কাজ করেছে ওরা। সে সময় একই সাথে হাহুতাস করে অনেক বিনীদ্র রজনী কাটিয়েছে দুজন।

জনাব আলীর সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক ওর। আর সে সম্পর্কটা আরো পাকা পোক্ত করতে চেয়েছিল দুবন্ধু।

-কিন্তু বিধির লিখন কি খণ্ডানো যায়! জনাব আলীর সাথে তার সম্পর্কের গভীরতা বর্ণনা করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো গোলাপ মিঞা।

এক ছেলে আর এক মেয়ে গোলাপ মিঞার। হালিমা অর্থাৎ রাজ্জাকের স্ত্রী যদি জনাব আলীর ছেলের থেকে বড় না হতো তবে গোলাপ মিঞা তার বন্ধুর সাথে অঙ্গিকারের প্রেক্ষিতে ওখানেই মেয়েকে বিয়ে দিত।

জনাব আলীর ছেলেটা এখন বিয়ের উপযুক্ত। গোলাপ মিঞার উপরই দায়িত্ব দিয়েছে ভাল একটা মেয়ে খোজ করার। ছেলের লণ্ডনী মেয়ে পছন্দ না। নরম স্বভাবের পর্দানশীল মেয়ে খুব পছন্দ তার। পরম বন্ধুর মত জনাব আলীর ছেলের বিয়ের ব্যপারটা সব সময় ঘোরে গোলাপ মিঞার মাথার ভিতর।

-আমি বলতেছিলাম কি বেয়ান সাহেবা, আমাদের অনন্যা মামনিকে হের লগে বিয়া দিতে পারলে গণ্ডগোলটাও মিইটা যাইতো আর অনন্যা মামনি সিধা লণ্ডনে আসলে আপনার সব বাচ্চাগুলা এখানে সেটেল। তারপর আপনারা বুড়াবুড়ি চার হাত পা নিয়া যেইডা মন চাইতো সেইডা করতেন।

-না না, এখন তা কি করে সম্ভব! তা সম্ভব না বেয়াই সাহেব। দেশে সব কিছুইতো আমি নিজ হাতে ঠিকঠাক করে এসেছি!

প্রায় মাঝ রাতে দেয়া বেয়াই সাহেবের প্রস্তাবটা নাসিমা মণ্ডল সাথে সাথেই নাকচ করে দিলেও বিষয়টা তার মন থেকে যে একেবারে মুছে গেল তা নয়। বেয়াই সাহেবকে বিদায় দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে রাজ্জাক ওর শশুরের দেয়া প্রস্তাবটা মাকে আবার স্মরণ করিয়ে দিল।

-তোর শশুরের মত তুইও দেখছি পাকা ব্যবসায়ী হয়ে উঠেচিস, সব কিছু নিয়ে কি আর ব্যবসা করা যায়। যা তুই শুয়ে পড়, এসেছি যখন তখন তোদের কোন্দল ফ্যছাদের একটা কিছু বিহিত করেই যাব।

নাসিমা মণ্ডল গত প্রায় মাস খানেক ধরে সব রকম চেষ্টা করেও কোন কুলকিনারা করতে পারলেন না। বিষয়টা বেশ চিন্তিত করে তুললো তাকে। কিন্তু এত সহজে ছেড়ে দেয়ার পাত্র তিনি নয়।

পার্টির ভিতরের কাউকে দিয়ে মধ্যস্ততা করতে ব্যর্থ হওয়াই তিনি লন্ডনের অন্য এক বাঙালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শাহেদ সরকারের শরণাপন্ন হওয়ার মনস্থ করলেন। শাহেদ সরকারেরও হোটেলের ব্যবসা। কিন্তু তিনি শিক্ষিত মার্জিত এবং এদেশর রাজনীতিতে সক্রীয়। তিনি লেবার পার্টির একজন মধ্যম গোছের নেতা।

শাহেদ সরকার দেশের রাজনীতির ব্যপারে উদাসীন নন তবে সত্যিকার অর্থে যাকে বলে নিরপেক্ষ। তিনি এখানে প্রবাসী নিজ দেশের মানুষদের সমস্যার ব্যপারে সর্বদা সহানুভূতিশীল। তায় সবার কাছে গ্রহনযোগ্যতা আছে তার।

ঠিক হলো বিষয়টিকে দেশের ভাবমূর্তির একটা ব্যপার হিসেবে তুলে ধরে তার মধ্যস্ততার জন্য অনুরোধ করা হবে।

খুব ব্যস্ত মানুষ শাহেদ সরকার তায় এ্যপোয়েন্টমেন্ট না করে যাওয়া ঠিক হবে না। সে কথা মাথাই রেখেই শাহেদ সরকারের সাথে নিজে টেলিফোনে কথা বলে শাহেদ সরকরের বাসাতেই এ্যপোয়েন্টমেন্ট করলেন নাসিমা মণ্ডল।

নাসিমা মণ্ডলকে না চিনলেও ওর রাজনৈতিক পরিচয়কে শাহেদ সরকার বেশ গুরূত্ব দিলেন। ঠিক হলো ব্যপারটি নিয়ে ওরা একান্তে শাহেদ সরকারের বাড়ীতে ডিনার টেবিলে বসে আলোচনা করবে। তাতে করে নাসিমা মণ্ডলের কাছ থেকে দেশের রাজনীতির হালচাল সম্পর্কেও জানা যাবে। ভাবলেন শাহেদ সরকার।

দিনটা ঠিক হলো অনন্যার বিয়ের ঠিক পরদিন।

মেয়ে জামাইকে টেলিফোনে আশির্বাদ করে নাসিমা মণ্ডল পরের দিন রাতে গেলেন শাহেদ সরকারের বাসায়।

কর্ণার প্লটের দোতলা বাড়ী। সামনে কোমর অব্দি ঈটের প্রাচিরে ঘেরা সবুজ লন। একপাশে ছোট্ট গার্ডেন।

দরজায় দাড়িয়ে শাহেদ সরকার এবং তার পিছনে দাড়িয়ে স্ত্রী নাজমা সরকার খুব আন্তরিকতা সহকারে নাসিমা মণ্ডলকে অর্ভ্যাথনা জানালেন।

শাহেদ সরকারের চেহারায় বয়সের ছাপ সুস্পষ্ট, সত্তরের কোটা ছাড়িয়েছে বোঝা যায়। সাহেবদের মত হাতে লাঠি নিয়ে হাটেন। তবে দরকারে নয় ফ্যাসান ওটা। এ বয়সেও সুস্থ সামর্থ তিনি।

-আসুন আসুন মিসেস মণ্ডল।

টোব্যাকো পাইপটা দাতে চেপে অতিথিকে অর্ভ্যথনা জানালেন শাহেদ সরকার।

ইকনমিক্সে মষ্টার্স করে দেশে একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছেন কিছুদিন। পরে ছোট খাট একটা চাকরি নিয়ে চলে আসেন এদেশে। তারপর আর ফেরা হয়নি। আর সক্রীয়ভাবে এদেশের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ায় এটাকেই মনে প্রাণে নিজের দেশ বানিয়ে ফেলেছেন।

পাশে রাখা জগ থেকে খালি গ্লাসে ফ্রেশ জুস ঢেলে নাজমা মণ্ডলকে দিতে দিতে নিজের সম্পর্কে সংক্ষেপে বলতে লাগলেন শাহেদ সরকার।

দেশে খুব একটা না গেলেও দেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন। দেশের সব ব্যপারই তাকে নাড়া দেয় ভীষণ ভাবে। তায় বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির খবর নিতেই সময় নিয়ে একান্তে আলোচনার জন্য মিসেস মণ্ডলকে বাড়ীতে ডেকেছেন।

Category: Bangla, Novel

Write a comment

Comment List