দৈবক্রম -১২

 

 

 

-আপনি দেশের একজন স্বনামধন্য বাক্তিত্ব। আপনি আমার বাড়ীতে আসাতে আমি খুব খুশি। আলাপ শুরুর আগে আমার সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলি তাহলে কথা বলতে বোধকরি সুবিধা হবে।

নাসিমা মণ্ডলের সম্মতি পেয়ে শাহেদ সরকার বলতে শুরু করলেন।  

-দুভাই আমরা। ছোট ভাই শহিদ দেশেই থাকে। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমাদের দুভায়ের। বাবার মত শ্রদ্ধা করে শহিদ আমাকে। আপাততঃ ভলোই আছে শহিদ, ওর ছেলেটা ভাল একটা সরকারী চাকরি করছে।

ছোট্ট করে একটা চাপা নিঃশ্বাস টানলেন শাহেদ সরকার।

জুছের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে একটু যেন অন্য মনস্ক হয়ে গেলেন শাহেদ সরকার। 

তার নিজের শহরে শাহেদ সরকারের ছোট ভাই, শহিদ সরকার বসবাস করছে শুনে একটু উৎসুক হয়ে  উঠলেন নাসিমা মণ্ডল। কিন্তু বললেন না কিছু।   

-তার সদ্য বিবাহিতা মেয়ের স্বামী  আরিফের বাবা শহিদ সরকারের কথা বলছে নাত! ভাবলেন নাসিমা মণ্ডল। 

-কিন্তু তা কি করে হয়! দুভায়ের যে রকম ঘনিষ্ঠতার কথা বললো তাতে করে গতকালই ছোট ভায়ের ছেলের বিয়ের ব্যপারে তিনি কিছুই বলছেন না তা কি করে হয়! ভাবছিলেন নাসিমা মণ্ডল।

ছোট ভাই শহিদের সাথে সব সময় নীবিড় সম্পর্ক বজায় রাখেন শাহেদ সরকার। বেশ কয়েক বছর আগে ওদের একটা দুর্ঘটনার ব্যপারে ঘন্টার পর ঘন্টা টেলিফোনে ওদেরকে শান্তনা দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে ছোট ভায়ের একটা সন্তান হারানোর ব্যপারে দারূন ভাবে ব্যথীত হয়েছেন তিনি।

কিছু দিনের মধ্যেই বড় ছেলের স্ত্রী, জামিলা ওর শিশু সন্তান জামিলকে রেখে মারা গেল। একটার পর একটা নির্মমতা আমার ছোট ভাইকে বিমুড় করে দিয়েছিল তাই সেদিন  জামিলার লাশ নিয়ে কি করবে সে  ব্যপারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে রাতেই বড় ভাইকে টেলিফোন করেছিল শহিদ সরকার। ধৌর্য্য সহকারে সব শুনে ভাইকে তিনি সাহস যুগিয়েছিলেন।

-যার প্রাপ্য তাকে সেটা দিতেই হবে। ছেলেমেয়েরাইতো ভূল করবে। একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে বলেছিলেন-যা হওয়ার তাতো হয়েছে আর ভবিষ্যতে যা হবার তায় হবে। তা নিয়ে এ মহুর্তে চিন্তা করে কি আর করবি। নিয়তির কাছে বড় অসহায় আমরা শহিদ! আমাদের গোরস্থানটা গ্রাম থেকে একটু দূরে তায় ভালোই হয়েছে কাউকে কিচ্ছু বলার দরকার নেই। পুলিশের ঝামেলা মিটিয়ে জামিলার বাবা বাদশাকে সাথে নিয়ে জামিলাকে ওখানেই কবর দে। অন্তত বেচারীর মৃতদেহটা স্বীকৃতি পেয়ে একটু শান্তিতে ঘুমোক।

সে রাতে পিতৃতুল্য বড় ভায়ের পরামর্শে শহিদ সরকার জামিলার মরদেহটাকে পুত্রবধুর মর্যাদা দিয়ে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করেছিল।

পরে টেলিফোনে হাউমাউ করে কেঁদে শাহেদ আর ওর স্ত্রী নাজমা বলেছিল- আমার সব কিছুতো আগেই শেষ হয়ে গেছে, খোদা আমাদের এ কোন কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেললো জানিনা। শহিদ তোর জামিলকে দে আমাদেরকে, আমাদের বাচার মত একটা সাহারা হোক।

তারপর জামিল একটু বড় হলে ওরা স্মামী স্ত্রী মিলে দেশে যেয়ে ছোট ছেলে আরিফের সাথে কথা বলে ওকে বুঝিয়ে জামিলকে নিয়ে এসেছে। প্রায় বছর দুই হলো জামিল থাকে ওদের সাথে। জামিল এ বাড়ীর প্রাণ এখন।

শাহেদ সরকার আর নাসিমা মণ্ডল দুজনেই কেমন জানি নিজ নিজ জগতে হারিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। 

আরিফের বিয়েটা সত্যি বলতে কি আরিফের বাবা মায়ের কাছে নিতান্তই সামাজিক কর্তব্য সম্পাদন ছাড়া অতিরিক্ত কোন আবেগ সৃষ্টি করেনি। অনেকটা সে ভাবেই বুঝিয়ে আরিফকে রাজি করেছিল ওরা। আর সে কারণেই বোধহয় আরিফের বিয়ের ব্যপারটা বড়ভাইকে জানানোর কোন তাগিদ বোধ করেনি শহিদ সরকার। 

অন্যদিকে বলতে গেলে বিয়েটা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নাসিমা মণ্ডলের একক সিদ্ধাতেই এবং পছন্দে হটাৎ করেই ঠিক হয়েছে। সরকার পরিবারের সুনাম ও স্বচ্ছলতা, আরিফের চেহারা আর ব্যক্তিত্ব, সর্বপরি পাত্রের ভাল সম্ভাবনাময় সরকারী চাকরিতে যোগদান ইত্যদি দিক বিবেচনা করে বৈষয়িক জ্ঞানে সমৃদ্ধ নাসিমা মণ্ডল খুব দ্রুতই বিয়ের ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেন।

ছেলে দুটোই মোটামুটি সুপ্রথিষ্ঠিত, মেয়েটাকে একটা সুপাত্রস্থ করতে পারলেই তিনি সাংসারিক দায়দায়িত্ব থেকে মোটামুটি মুক্ত হয়ে রাজনীতির কাজে আরো বেশি সময় দিতে পারবেন। কারণ ইলেকশানের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। এ ধরণের সব বিবেচনা নাসিমা মণ্ডলকে মেয়ের বিয়ের ব্যপারে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করে।

নাজমা বেগম ডিনার টেবিলে আসার তাগিত দিলেন।

-ওহ দেখুন কেমন নিজের কথাই বলে চলেছি, আমাকে ক্ষমা করবেন। চলুন ডিনার খেতে খেতে আপনার কথা শুনি।

বেয়াই শহিদ সরকারের সাথে এই শাহেদ সরকারের সম্পর্কটা নাসিমা মণ্ডলের কাছে তখনও ঝাপসা। 

সে রাতে ডিনার টেবিলে বসে নাসিমা মণ্ডল আর শাহেদ সরকার দেশ বিদেশের নানা আলোচনা করলেন খুব আনন্দঘন পরিবেশে। এসব আলোচনার ফাকে নাসিমা মণ্ডল তার এখানে আসার উদ্দেশ্যটা ব্যক্ত করে দুপক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতা বৈঠক করার ব্যপারটাও পাকা করে নিলেন।

ওদের এত সব আলোচনায় মাঝে মধ্যে একটু আধটু অংশ নিলেও নাজমা বেগমকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাল, থেকেও যেন নেই বলে মনে হলো নাসিমা মণ্ডলের কাছে।

মাঝে মধ্যে অন্য মনস্ক হয়ে থাকা স্ত্রীর দিকে নাসিমা মণ্ডল যে খেয়াল করছে সেটা লক্ষ্য করলেন শাহেদ সরকার।

ওদেরকে খাবার পরিবেশন করে আসছি বলে উঠে উপরে চলে গেলেন নাজমা বেগম।

দেশের কথা আলোচনা হলে নাজমা অন্য মনস্ক হয়ে যায়, ওর মাথা ব্যথা করে পরে অসুধ খেয়ে ঘুমাতে হয় সেটা জানে শাহেদ সরকার। কিন্তু জামিল আসার পর থেকে অনেকটা স্বাভবিক হয়ে উঠেছে নাজমা। গত বছর দুয়েক ধরে এমনটা খুবই কম হয়।

নাজমার ওভাবে চলে যাওয়াতে মিসেস মণ্ডলের সামনে বিব্রত বোধ করতে লাগলেন শাহেদ সরকার। নাজমা আর নিচে আসবে না সে রাতে সেটাও আচ করলেন তিনি।

-জানেন মিসেস মণ্ডল, নাজমা দেশ সম্পর্কে কোন  অলোচনায় অস্বস্তি বোধ করে।

পরিস্থিতিকে হালকা করার জন্য মৃদু হেসে কথাটা বললেন শাহেদ সরকার। নাজমার সামনে দেশের ভাল মন্দ দুর্ঘটনা দুর্যোগ ইত্যাদি বিষয় ওভাবে আলোচনা করা বোধহয় ঠিক হয়নি। ভাবলেন শাহেদ সরকার।

শাহেদ সরকারের মন্তব্যে আরো সন্দিগ্ধ হয়ে উঠলো নাসিমা মণ্ডল। 

বিষয়টা ওদের একান্ত নিজের, ভাবলেন শাহেদ সরকার। কিন্তু ওর বোকামিতে মিসেস মণ্ডল আবার ব্যপারটি যদি ওর নিজের উপর নেয় তাহলেতো খুবই লজ্জার কথা। যাহোক, মিসেস মণ্ডলকে আশ্বস্থ করার জন্য সংক্ষেপে ব্যপারটা খুলে বলার বলার মনস্ত করলেন শাহেদ সরকার। 

Category: Bangla, Novel

Write a comment