জীবনে সুখী হওয়ার গোপন চাবিকাঠি

 

 

একজন বণিক তার ছেলেকে জীবনে সুখী হওয়ার গোপন চাবিকাঠি কী তা জানার জন্য একজন সাধকের কাছে পাঠালেন।
যুবকটি চল্লিশ দিন সীমাহীন মরুভূমির ভিতর ঘুরে ঘুরে অবশেষে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি সুন্দর দুর্গে পৌঁছালো। যেখানে ওই সাধক বাস করতেন।
বিশাল দুর্গের মধ্যে সাধককে খুঁজে না পেলেও যুবকটি দুর্গের একটি বড় কক্ষে প্রবেশ করলো যেখানে অনেক ধরণের ক্রিয়াকলাপ চলছিলো। কক্ষের ভিতরে অনেক বণিকেরা আনাগোনা করছিলো, মানুষজন আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত ছিল এবং এক পার্শে একজন মনকাড়া সুরে অর্কেস্ট্রা বাজাচ্ছিল। মাঝখানে একটা বিরাট টেবিলের উপর প্রচুর সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা ছিল।
সাধক ঘুরে ঘুরে সবার সাথে কথাই ব্যস্ত ছিলেন। তাই সাধকের সাথে কথা বলার জন্য যুবকটিকে প্রায় দুই ঘন্টা অপেক্ষা করতে হল।
অবশেষে সাধক খুব ধৈর্য সহকারে যুবকটির এখানে আসা এবং তাঁর সাথে দেখা করার কারণটি মনোযোগ সহকারে শুনলেন। কিন্তু তিনি তাকে বললেন যে সেই মুহুর্তে তাঁর কাছে জীবনে সুখী হওয়ার গোপন চাবিকাঠি ব্যাখ্যা করার সময় নেই।
তিনি যুবকটিকে পরামর্শ দিলেন যে সে যেন তার বিরাট প্রাসাদটি ঘুরে ঘুরে দেখে দুই ঘন্টা পর ফিরে এসে তার সাথে দেখা করে তখন তিনি সুখী হওয়ার গোপন চাবিকাঠি সম্পর্কে তাকে বলবেন।
-তবে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। কথাটা বলে সাদক যুবকটিকে একটি চামচ দিয়ে তার ভিতর দু ফোঁটা তেল ঢেলে দিলেন। -তুমি ঘুরে ঘুরে প্রাসাদ দেখার সময় এই চামচটি বহন করবে এবং খেয়াল রাখবে যেন তেল চামচ থেকে গড়িয়ে না পড়তে পারে।
কথামত যুবকটি প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠা নামা করে প্রাসাদটি দেখতে শুরু করল এবং সাধকের কথামতো চামচটির দিকে সর্বদা খেয়াল রাখলো যেন তেল গড়িয়ে পড়তে না পারে। দুই ঘন্টা শেষে যুবকটি সাধকের কাছে ফেরত আসলো।
-আচ্ছা, তুমি কি আমার ডাইনিং রুমে পার্সিয়ান টেপস্ট্রিগুলি ঝুলতে দেখেছো, ও গুলো কেমন লাগলো? তুমি কি আমার বাগানটি দেখেছো যেটি তৈরি করতে আমার অভিজ্ঞ মালি প্রায় ১০ বছর সময় নিয়েছে? তুমি নিশ্চয়ই আমার লাইব্রেরিতে সুন্দর পার্চমেন্ট লক্ষ্য করেছো? সাধক যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন।
বিব্রত হয়ে যুবকটি স্বীকার করলো যে সে ওগুলোর কিছুই দেখেনি। ঘুরে দেখার সময় তাঁর একমাত্র উদ্বেগ ছিল সাধকের দেয়া নির্দেশ পালন করে চামচ থেকে তেল গড়িয়ে পড়তে না দেওয়া।
-কোন ব্যক্তির বাড়ি ঘর ভালোভাবে না দেখলে তুমি তার কথা বিশ্বাস করবে কি করে? সুতরাং, তুমি আবার যাও এবং আমার সব বিস্ময়কর জিনিসগুলি দেখে আস। বিজ্ঞ সাধক ব্যক্তিটি তাকে বলল।
এবার যুবকটি বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করলো এবং তেল ভর্তি চামচটি নিয়ে আবার  প্রাসাদের মধ্য ঘুরে ঘুরে সব কিছু ভাল ভাবে দেখার সিদ্ধান্ত গ্রহন করলো। এবার সে সিলিং থেকে শুরু করে দেয়ালে ঝুলান সমস্ত শিল্পকর্মের দিকে মনোনিবেশ করলো। সে প্রাসাদের উদ্যান, চারপাশে পাহাড় সব কিছু অবলোকন করলো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফুলের সমারোহের স্বাদ গ্রহন করল এবং প্রতিটা জিনিস যে নিপুনতার সাথে সাজানো হয়েছে সেগুলো নিখুঁত ভাবে খেয়াল করলো।
ফিরে এসে যুবকটি উৎসাহের সাথে যা কিছু দেখেছে সে সম্পর্কে সাধককে বিস্তারিত জানালো।
-ভাল কথা, তবে আমি তোমার চামচে যে দুটি ফোঁটা তেল দিয়েছিলাম তা কোথায়? সাধক যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন।
চামচের দিকে তাকিয়ে যুবকটি বিব্রত হলো, সে বুঝতে পারল যে তার  অলক্ষে তেল চামচ থেকে গড়িয়ে পড়ে গিয়েছে।
– ঠিক আছে, এখন আমি তোমাকে যে পরামর্শ দিচ্ছি তা মন দিয়ে শোন।
– জীবনে সুখী হওয়ার গোপন চাবিকাঠি হচ্ছে; বিশ্বের সমস্ত বিস্মকর সবকিছু দেখবে এবং উপভোগ করবে কিন্তু চামচের ভিতরের দুই ফোটা তেলের কথা ভুললে চলবে না।

*********

পল কোয়েলহোর দ্য অ্যালকেমিস্ট বইটি থেকে সংকলিত  

Write a comment