মরিচা

এবার প্রায় বছর খানেক পর বাড়িতে আসলাম।
এটা আমার পিতৃপুরুষের বাড়ী, বলতে গেলে তালাবন্দই থাকে। সাধারণত প্রতি তিন চার মাস অন্তর অন্তর আসা হয়, কয়েকদিন থাকি, তখন যতটুকু পারি কাজের মানুষ নিয়ে ঘর দোর, লন বাগান সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রেখে যাই।
শরীরটাও ইদানিং ভাল যাচ্ছে না। শরীর কথা শুনতে চায় না আজকাল, সব সময় ক্লান্তিতে ভরে থাকে। তাই আসব আসব করে আসা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু শেকড়ের টানে মনটা হাফিয়ে ওঠাই শরীরের ব্যপারটাকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে চলে আসলাম।
এবার এত দিন পরে আসাই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম বেষ্টনী পাচিলের সাথে দুই পাল্লার মেইন গেটটা খুলতে যেয়ে। মরিচা ধরে তালাটা মুখ আটকে বসে আছে, কিছুতেই খুললো না। খুলবেই বা কেন, কত দিন ধরে ওভাবে অযত্নে পড়ে থেকে থেকে নিজের মত করে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
এটাই চিরাচরিত নিয়ম। কারো জন্য বা কোন কিছুর জন্য কোন কিছুই থেমে থাকে না, নিজের মত করে সব গুছিয়ে নেয়, মানিয়ে নেয়। সবই এগিয়ে যায় সময়ের হাত ধরে। এটা প্রকৃতির একটা মহান দান নি:সন্দেহে।
মরিচা ধরা তালার সরু গর্তের মধ্যে অসহায়ের মত চাবি দিয়ে খোঁচাখুঁচি করতে দেখে আমার ড্রাইভার নিজের থেকে গাড়ীতে রাখা ইঞ্জিন অয়েলের কনটেনারটা বের করে আমাকে একপাশে সরে দাঁড়াতে বললো।
-এ রকমই হয়, স্যার। নিজের মত করে থাকতে দিলে সবাই এবং সব কিছু নিজের মত করে নিজের একটা দুনিয়া তৈরী করে নেয়। দেখছেন না বৃষ্টির পানি ঢুকতে দেবে না বলে কেমন নিজের গায়ে মরিচা ধরিয়ে তালাটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
মাঝ বয়েস পার হওয়া আমার ড্রাইভারটা এ ভাবেই ভাবুকের মত কথা বলে মাঝে মাঝে।
নিজের মনে বিড় বিড় করতে করতে ও এক টুকরো ছেড়া কাপড় তেলে চুবিয়ে সেটা দিয়ে ঘসে ঘসে তালার গা থেকে মরিচা ছাড়াতে লেগে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। কিছু সময় পর ও আমার কাছ থেকে চাবি চেয়ে নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করতেই তালাটা খুলে গেল।
-অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় মরিচা ধরেছে, আর কিছু দিন এভাবে অকেজো হয়ে পড়ে থাকলে এটাকে আর কাজে লাগানো যেত না।
স্বগত স্বরে কথাটা বলতে বলতে ও গেটের পাল্লা দুটো ভিতর দিকে ঠেলা দিল। গেট দুটো কর্কশ স্বরে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে প্রবল অনিচ্ছা প্রকাশ করতে করতে কিছুটা খুলল, পুরোপুরি না।
-কব্জা গুলোতেও মরিচা ধরেছে দেখছি। বীড় বীড় করতে করতে ড্রাইভার কাপড়ের টুকরোটা আরেকবার তেলে চুবিয়ে নিয়ে গেটের পাল্লা গুলোর কব্জাতেও তেল লাগাতে লাগলো।

স্থানীয় সরকারের তৈরী সরু পিচ ঢালা কালো যে রাস্তাটা মেইন রোড থেকে বেরিয়ে গ্রামে ঢুকেছে সেটা আমার বাড়ীর গেটের সামনে দিয়েই গেছে। কালো যে এত সুন্দর হতে পারে তা বোধহয় এই নির্ভেজাল কালো মসৃণ পিচ ঢালা রাস্তাটা না দেখলে কেউ বুঝবে না।
ছায়া ঢাকা গ্রামের ভিতর দিয়ে একে বেকে চলেছে রাস্তাটা। হাইওয়ে ছেড়ে কয়েক কিলোমিটার এই গ্রামের নির্জন রাস্তা ধরে বাড়ীতে আসতে হয়। বর্ষার প্রায় শেষ, আর এবারে বর্ষাও হয়েছে প্রচুর। সারাটা রাস্তা বৃষ্টির মধ্যেই এসেছি বলা চলে। এখন একটু থেমেছে। মাঝে মধ্যে সূর্যের উঁকি ঝুঁকিও দেখা যাচ্ছে। ছায়া ঢাকা গাছ গাছালির চাঁদোয়ার নিচ দিয়ে বৃষ্টি স্নাত কাল কুচকুচে পিচ ঢালা সর্পিল গতিতে বয়ে যাওয়া রাস্তাটা আর তার উপর মাঝে মাঝে সূর্য কিরণ পড়ে চকচক করে ওঠা দৃশটা প্রকৃতই মন কেড়ে নেয়। এখানে সবই নিষ্কলুষ, নিজ নিজ রঙে ঢঙ্গে পাশাপাশি অবস্থান করছে।
বৈচিত্রময়তা সৌন্দর্যের মুখ্য বিষয়। বৈচিত্রতায় ভরা বলেই পৃথিবীটা এত সুন্দর। আর বৈচিত্র গুলো যখন নিষ্কলুষ ভাবে নিজ নিজ সৌন্দর্য আর বৈশিষ্ট নিয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে, প্রকৃত সৌন্দর্যটা তখনই দেখা যায়। আমার পিতৃ পুরুষের বাড়ীটাকে নির্মল প্রকৃতি যে ভাবে ঘিরে আছে সেটা বৈচিত্র প্রেমী স্রষ্টার প্রকৃত প্রকাশ বলে আমার মনে হল।
প্রকৃতির সব কিছু, জীব বা জড় সে যাই হোক, যখন সেগুলো কোন রকম কলুসতা বা কৃতিমতা ছাড়া সম্পূর্ণ নিজ নিজ রুপে থাকে তখন সেগুলোকে অপরুপ লাগে।

-কখন এলে বাবা?
গাড়ীটা কোনরকমে ভিতরে ঢুকিয়ে পার্ক করার পর মরিচা পড়া গেটের কব্জাগুলোতে ড্রাইভার তেল লাগাতে ব্যস্ত আমি সে দিকে তাকিয়ে ভাবনায় ডুবে থাকা অবস্থাই হটাৎ করে পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর আমাকে কিছুটা চমকে দিল।
বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত লাগছিলো। যাহোক, ঘুরে তাকালাম। চট করে কাউকে নজরে পড়লো না। গেটের সামনে রাস্তার উপর একটা রিকশা ভ্যান দাঁড়ানো, মাটির হাড়ি কলস ভরা।
-কি বাবা চিনতে পারনি?
গেটটার উপর দোচালা স্লান্টিং ছাদ তারই নিচে নজর পড়ল এক পাশে পিলারের ধারে, যেটাকে নিজের খুশি মত জংলা হয়ে বেড়ে ওঠা কাটা মাধবী লতারা আস্টে পিষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে তার পাশে একেবারে কুঁজো হয়ে সামনে ঝুঁকে মুখটা উঁচু করে হাসিমুখে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে। এত কুঁজো যে তার মাথাটা আমার বুকের নিচে।
রতন জেঠা, খুব ভাল ভাবে চিনতে পারলাম। তিনি কুমোর, মাটির হাটি পাতিল বানায় আর সেগুলো গ্রামে গ্রামে ফেরি করে। এটা তাদের জাত ব্যবসা। প্রায় ছ ফুটের মত লম্বা মানুষটা কুঁজো হয়ে পাচ ফুটের মত হয়ে গেছে। অবাক লাগলো। শেষ কবে তাকে দেখছি মনে করতে পারলাম না, তবে তখন ছিপ ছিপে গড়নের রতন জেঠাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেখেছি।
-অবাক হওয়ারই কথা তোমার, প্রায় বছর দুই পর আমাকে দেখছো। হাসিতে ভরা মুখে কথা বলতে বলতে রতন জেঠা হাতের গামছা দিয়ে ঘামে ভরা মুখমণ্ডল মুছে নিল।
-বেশ কয়েক বছর ধরে মাজায় ব্যথা করতো। ধীরে ধীরে শরীরটা সামনের দিকে একটু কুঁচকে নিয়ে হাটা চলা করলে ব্যথাটা কম মনে হত। সে ভাবে চলতে চলতে ধীরে ধীরে মাজাটা এমনিতেই কুঁজো হয়ে গেল।
এখন এভাবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ভ্যানের হাতলটাও সামনে, লম্বা মানুষ, এমনিতেই আগে একটু ঝুঁকে চালাতে হত, এখন বরং সুবিধেই হয়েছে।
স্মিত হাসিতে ভরা মুখটা, লম্বা নাকে ভারী সুন্দর লাগলো রতন জেঠাকে।
-ডাক্তার দেখিয়েছিলে?
-আরে বাবা না, ডাক্তার টাক্তার আমার কোনদিনই পছন্দ না। ডাক্তারের কাছে যাওয়া তো দূরের কথা, জীবনে একটা বড়ি পর্যন্ত খায়নি। এতে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। শরীর যিনি দিয়েছেন তিনিই যা করার তা করবে।
জেঠার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। রতন জেঠা আমাদের অঞ্চলে একটা নিশানা বলা চলে। এ অঞ্চলে পুরনো কোন ঘটনার প্রসঙ্গ আসলে রতন জেঠার কথা উঠবেই। বয়েস কম করে হলেও নব্বয়ের কাছা কাছি। সদালাপি, হাসিতে ভরা মুখের মানুষ তিনি।
-কাদা মাটি নিয়েই আমাদের কাজ, জাত ব্যবসা এটা। শরীরে কোন খানে আঘাত লেগে ব্যথা হলে ওই কাদা মাটি লাগালে আর জঙ্গলা জায়গায় জন্মানো লতা পাতার রস শরীরের এমন কোন অসুক নেই যা তাতে সারে না।
কথাটা রতন জেঠাই বলেছিল তবে আজকে নয় অনেক দিন আগে।
-শরীরের শাসন মেনে নিয়ে মানিয়ে চলছি, দেখ না কত ভাল আছি। এ দুনিয়ার সব সমস্যা তৈরী হয় দ্বিমত করা থেকে। শরীরের সাথে আমার তো কোন দ্বিমত নেই, তাই সমস্যাও নেই।
এই কঠিন কথাটা বলার সময়ও জেঠার মুখে চিরাচরিত হাসি ছিল। ঠিক বুঝলাম না, কেন যেন মনে প্রশ্ন জাগলো, তিনি কারো প্রতি কোন অভিযোগ করলেন কিনা?

-তোমার এই গেটের কথাই ধর না। আমি প্রায় দিনই এই গেটের সামনে দিয়ে যাতায়াত করি। গেটের ছাউনির তলাই মাঝে মাঝে একটু আধটু জিড়িয়েও নিই। আর বিশেষ করে বৃষ্টির মধ্যে তোমার গেটের ছাউনির নিচে অনেকবার দাড়িয়েছি। লক্ষ করে দেখেছি কি ভাবে অকেজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গেটটা নিজেকে বাচাতে প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নিয়েছে দিনে দিনে।
আমি নির্বাক হয়ে শুনছিলাম রতন জেঠার কথা।
-ভেবে দেখ বাবা, মরিচা হচ্ছে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা গেট আর তালার জন্য প্রকৃতির নিয়মে চির নিদ্রার পূর্বাবস্থা। তুমি ঠিক মত ওটাকে যত্ন নিয়ে কর্মক্ষম রাখতে পারনি তাই প্রকৃতি তার নিয়মেই এগোতে শুরু করেছে। আর তালা ও গেটটা পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়েছে।
-এবার এতদিন পর তুমি এলে, আর তোমার প্রয়োজনে তোমার মত করে ওকে ব্যবহার করতে চাওয়াতে ও বাধা তো দেবেই, ক্যাঁচ ক্যাঁচ তো করবেই।
কথা বলার সময় হাসিটা জেঠার মুখে লেগেই ছিল।
-জান বাবা, প্রকৃতি বড় দয়াময়, আমরা তো তাঁরই সন্তান। তিনিই আমাদেরকে এখানে এনেছেন তাঁরই প্রয়োজনে, তাই সব সমস্যার সমাধান তিনিই দেবেন। আর কিছুতে কিছু না হলে শেষ সমাধান তো কেবল তাঁর কাছেই আছে; প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নিয়ে তার সাথে মিশে গেলে সব কষ্ট দুঃখ জ্বালা যন্ত্রণা শেষ।
স্মিত হাসলেন তিনি। রতন জেঠার হাসিটা বেশ রহস্যময় লাগলো আমার কাছে।
-তোমার কাজে ক্ষতি করে দিলাম, যাও বাবা গোজগাজ করে নাও। এতদিন পরে এলে।
রতন জেঠা তার রিকশা ভ্যানের ছিটের উপর উঠে বসলো। আমি সেদিকে তাকিয়ে।
-এই দেখ কুঁজো শরীরটা কি সুন্দর ভাবে ভ্যান চালানোর জন্য মানানসই। শরীরটা বিধাতা বানিয়েছে কাজ করার জন্য তাই ওটা যতক্ষণ কর্মক্ষম থাকে ততোক্ষণ ভাল থাকে।
কথা বলতে বলতে কেমন যেন একটু অন্য মনস্ক হয়ে গেল রতন জেঠা।শরীরটা যতক্ষণ কর্মক্ষম থাকে ততোক্ষণে কোন সমস্যা হয় না। শরীর অকেজো হয়ে গেলে তাতে মরিচা ধরে বোঝা হয়ে দাড়ায়, আর অকেজো শরীরের বোঝা বহন করা যে কি কষ্টের তা অন্য কারো পক্ষে আঁচ করা কঠিন। আমার এই কুঁজো শরীরটাকে কাজের সাথে মানানসই করে জীবনটাকে চালিয়ে নিচ্ছি। কষ্ট হয় কিন্তু কি করা বল।
কথা বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রতন জেঠা।
-সমস্যা হয় কেবল কাজ শেষে শোয়ার সময়, কুঁজো হয়ে তো আর শোয়া যায় না। শোয়ার সময় শরীরটা সোজা করতে গেলে খুব যন্ত্রণা হয়। কিন্তু কি করা, দিন শেষে তো শুতে হবে কি বল। একবার ঘুম এসে গেলে আর কোন সমস্যা হয় না। ঘুম ভাঙলে আবার একই সমস্যা। ঘুমটা যদি না ভাঙতো!
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে কোন দিকে না তাকিয়ে রতন জেঠা তার রিকশা ভ্যানে প্যাডেল মারল।
শেষের কথাগুলো বিড় বিড় করে কিছুটা অস্পস্ট স্বরে বললো। মনে হল যেন অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললো জেঠা।
ততোক্ষণে আমার ড্রাইভার মরিচা ধরা গেটটাতে তেল লাগিয়ে সেটি পুরোপুরি কার্যকরী করে ফেলেছে।
বাউন্ডারির ভিতরে প্রবেশ করলাম।
বর্ষায় গেটের ভিতরের সিমেন্টের রাস্তাটুকু সবুজ শ্যাওলাই ভরে পিচ্ছিল হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি চুষে ফুলে থাকা শ্যাওলা পায়ের নিচে চাপা খেয়ে প্যাঁচ প্যাঁচ শব্দ করে উঠলো।
সবুজ শ্যাওলা ভরা রাস্তাটা দারুন লাগলো এই মুহূর্তে। সদ্য একে দেয়া আমার গাড়ীর টায়ারের দাগ দুটো বরং আমার চোখে খুব বেমানান লাগলো।
সামনে লন আর অন্য দিক গুলো গাছগাছালিতে ভরা প্রায় পাচ ফুটের মত উচু চারদিক ঘোরানো প্রশস্ত বারান্দার উপর তৈরী বাংলো প্যাটার্নের দোতলা বাড়ী। অনেক স্মৃতি বিজড়িত আমার এ বাড়ী। স্মৃতি রোমন্থনের জন্য আদর্শ পরিবেশ।
মনটা হাফিয়ে উঠলেই ছুটে আসি। কিন্তু এবার এই ব্যতিক্রম। চারপাশের বাগানে নানা রকমের বুনো লতা গজিয়ে উঠে প্রতিটি গাছ আর পুরো চত্তরটা ছেয়ে ফেলেছে। সামনে দূর্বা ঘাসের লনটাও বুনো ঘাসে পুরোপুরি ছেয়ে ফেলেছে।
এই মুহূর্তে জঙ্গলাই ভর্তি আমার বাড়ীর আঙিনা আমার কাছে নির্ভেজাল প্রকৃতির রাজ্যে মিশে একাকার হয়ে হাসি খুশীতে ভরা প্রকৃতির একটা মূর্ত অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে হল।

ফিস ফিস করে বৃষ্টি শুরু হল। তাড়াতাড়ি করে চার চারটি সিড়ি ভেঙ্গে বারান্দায় উঠতে বেশ কষ্ট হল এবার। সিঁড়িগুলো বেশ খাড়া লাগলো আমার কাছে। ক্লান্তিতে শরীরটা যেন নুইয়ে আসলো। উপরে উঠার পর কেন জানি মনে হল খুব প্রয়োজন না হলে আর নামবো না এখান থেকে।
বারান্দার উপর ইজি চেয়ারটা পাতা। দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত থেকে ঝুলকালি লেগে আছে। ইতিমধ্যে ড্রাইভার ওর কাজ সেরে বাউন্ডারির এক কোনে তৈরী ওর ঘরে চলে গিয়েছে।
আসবার সময় মনে মনে ভেবেছিলাম এবার থাকবো যতদিন মন চায়। কয়েকজন কাজের মানুষ নিয়ে বাড়ীর আঙ্গিনা থেকে বুনো লতাপাতা, আগাছা সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করাবো। কিন্তু এখন ভাবছি, আর ফিরবো না, এখানেই থাকবো। আর কোন কিছুই করব না, সব কিছু যে ভাবে নিজের মত করে মানিয়ে নিয়ে আছে সে ভাবেই থাকবে।
বৃষ্টিটা ধরে আসলো, চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। অবলীলায় ঝুলকালি ভরা চেয়ারে গাটা এলিয়ে দিলাম। শরীরটা যেন ভেঙ্গে পড়লো। চোখ দুটো বন্দ হয়ে আসলো। শরীরটা যতক্ষণ কর্মক্ষম থাকে ততোক্ষণে কোন সমস্যা হয় না। শরীর অকেজো হয়ে গেলে তাতে মরিচা ধরে বোঝা হয়ে দাড়ায়, আর অকেজো শরীরের বোঝা বহন করা যে কি কষ্টের তা অন্য কারো পক্ষে আঁচ করা কঠিন। আমার এই কুঁজো শরীরটাকে কাজের সাথে মানানসই করে জীবনটাকে চালিয়ে নিচ্ছি। কষ্ট হয় কিন্তু কি করা বল।

বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দের মধ্যে রতন জেঠার কথাগুলো কানে বাজতে লাগলো।

-একবার ঘুম এসে গেলে আর কোন সমস্যা হয় না। ঘুম ভাঙলে আবার একি সমস্যা। ঘুমটা যদি না ভাঙতো!

Category: Meaning of Life

Write a comment