ছন্দ কবিতায় আমার দৃষ্টিতে জীবন

জীবন ঘূর্ণায়মান এক চাকা, চলে কখনো সোজা কখনো বাকা
শরীর এক মাকাল ফল, দেখলে মন ভরে সকল, কিন্তু ভিতরটা ফাঁকা।
শরীর প্রকৃতই এক পরগাছা, হাড্ডির খাঁচা, আত্মার উপর নির্ভর করে তার বাচা
নিঃশ্বাস এর নেই কোন বিশ্বাস, চলে বেশ, কিন্তু থামলেই সব শেষ।

অনিশ্চিত পথ চলার নাম জীবন, অতৃপ্ত মন সারাক্ষন
জীবন যেন মাস্তুলে জড়ানো পাল ওড়ানো এক নৌকা, যাত্রী সবাই একা
চলে বাতাসের তালে, বাতাস যত দোলে, পাল একটু করে খোলে।

জীবন এক মায়া কেবলই বয়ে যাওয়া,
কূল কিনারা বিহীন অন্তহীন এক ভব দরিয়া।
অজানা গন্তব্যে চলা যা অনন্য, দিবানিশি বয়ে চলে নিরবচ্ছিন্ন।
শরীর চলে মনের টানে, কোথায় যাবে বা থামবে কবে, সে কথা কেউ না জানে।

শরীর নৌকা সম, পা’দুটো তার হাল, মন তার পাল, বাতাস মনের খেয়াল
টানিছে কেবল দূরে, যা যায় দেখা, সবই তার মরিচিকা, চিক চিক করে
ছুটে চলে সন্ধ্যে সকালে, কখনো জোরে কখনো মন্তরে।

শরীর ইন্দ্রিয়ের যন্ত্র যান, মন তার নিয়ন্ত্রণ, বলিছে সারাক্ষণ;
‘চল সবে ভেবে, আগে আর পিছে, বাকি সব ফাঁকি, সব মিছে’।

মনের দৃষ্টি বর্তমানে নয়, সে ভাবেই করেছে সৃষ্টি দয়াময়
থাকে সে বর্তমানে কদাচিৎ, মানে না উচিৎ অনুচিত
সে থাকতে চায়, আগে বা পিছে সব সময়।
বর্তমানে থাকা মনের অনীহা, সেখানে তাকে ধরে রাখা দুরূহ মহা।

যা ঘটেছে আগে, তা চিন্তা করে সারাক্ষণ ধরে, সদা মনে প্রশ্ন জাগে
তেমনি যদি হয় আবার! বা না হয়! মনে সদা ভয় সবার।

দুঃখ বেদনা বা সুখ যত, যা হবে বা হয়েছে গত
যা হবে যার, সব তার ভবিষ্যৎ ভাবনা, হবে কি হবে না তা কেউ জানেনা।

ঘটে যা গেছে, আর যা ঘটার কথা আছে, ভেবে দেখ সব তার মিছে
যেটা বর্তমান, যা ঘটছে এখন, সেটার দিকেই রাখ মন।
কাল কি হবে, তা কেউ না জানে এ ভবে
সবই নির্ভর করে, এখন যা ঘটছে তার উপরে।

আজকে যা কাল, হবে তা গত সময় মত, হবে আগামী সকাল।
আগামী আর গত করিছে খেলা, প্রতিজনে সব মনে, সারাক্ষণ সারা বেলা।

কেউ তা বোঝেনা, কখনো নিজেকে খোজেনা
দৃষ্টি কেবল বাহির পানে, অতীত আর ভবিষ্যতের ধ্যানে।

সকলে কেবল মনের তালে নাচে, মনের ভ্রম জালে আটকে বাচে।
আগে পিছে মনে রেখে চোখে দেখে, তাকাতে হবে পায়ের নিচে।

মন ভারী বোকা, যেন কচি খোকা
বোঝে না সে কোন তফাৎ, অতীত আর ভবিষ্যৎ
কোনটা আসল কোনটা ধোঁকা।

কাল কি হবে যা ভেবেছে এতকাল সবে,
সেটাই ঘটেছে বলে, জানে কেউ কোন কালে, এ ভবে?

ঘটবে যা কাল, সব তা মায়াজাল ভ্রম, মরিচিকা সম, অনিশ্চিত অনাগত
ঘটে না কিছু এ জীবনে, কারণে অকারণে কারো মন মতো।
যা ভাবিনি কখনো কোনদিন, ঘটছে তা এ জীবনে প্রতিক্ষণ প্রতিদিন।

দেখ ভেবে সবে, নিজেকে না পাবে, কখনো খুঁজে, আগামী বা গত কালের মাঝে
যদি কোথাও থাক তুমি মনে প্রাণে, সে কেবল বর্তমানে
যে কথা গোপনে, কদাচিত ভাবে সবে মনে মনে।

সদা মনে ভয়, কখন যে কি হয়
এ জীবনে কখন কি হারায়।
না জানি কখন কি ছেড়ে চলে যায়।
হারায় হারায় করে, না হারালে পরে, হারানোর আগে
হারানোর ব্যাথা পায় সব সময়, ঘুমিয়ে ও জেগে।

যেখানে হারানোর আছে ভয়, ভালবাসা নয় মায়া তারে কয়।
ভালবাসা যদি অকৃত্রিম হয়, সেতো থাকে হৃদয়ে শরীরে নয়
কোন বিনিময় সে কখনো না চায়।
হৃদয়ে গ্রথিত কিছু কি হৃত হয়! সেসব অমূলক ভয়।

সব বুঝি, সবই সাজি, যখন যা প্রয়োজন, তবু মানে না অবুঝ মন
সাধ না মেটে কেবলই ছোটে মরিচিকার পিছে, সারাক্ষণ মিছে মিছে।

জেনে নাও সবে, যা কিছু পাবে এ ভবে, যে যত কষ্ট করে
সব তার যাবে চলে, ঠিক সময় হলে, দিয়ে তত দুঃখ তারে।
বিধাতার এ ভবে, যা কিছু পাবে, অধিকারের জোরে
সব কিছু তার, থাকবে তোমার, সারা জীবন ভরে।

আকাশ বাতাস আর সূর্য কিরণ, সবই বিধাতার দান
তিনি এনেছেন সবে, তাঁর এ ভবে, তাঁরই জন্যে তাঁরই প্রয়োজনে।
পেতে তোমার, দান তাঁর, নেই দরকার কোন প্রচেষ্টার
সে সব তোমার জন্মের অধিকার।
সব তার পাবে, যতদিন তিনি রাখবে তোমাকে এ ভবে।

মানুষের তৈরী যত যন্ত্র যান, মানুষ যোগাবে শক্তি আর বাসস্থান
এ সবকিছু তার নিজের দরকার।
কাজ শেষ হলে, ছুড়ে দেবে ফেলে
দাম নেই তার আর, মৃত শরীর কেবল জঞ্জাল সার।

যন্ত্র যান আসেনি ধরায় নিজ ইচ্ছায়, যাওয়ার ব্যাপারে তাই যন্ত্রের কি আসে যায়!
যিনি স্রষ্টা তিনি সব জানে, সৃষ্টি যত সবই তার প্রয়োজনে, তাই সব তাঁরই দায়।

ভয়ে ভরা জীবন, দুরু দুরু মন সারাক্ষণ, যে ভয় সব থেকে বড়
জীবনটা না চলে যায়, সে ভয়ে সব সময়, সবাই থাকে জড়সড়।

গাছ তলায়, অট্টালিকায়, বা মহাকাশে বাস করে বলে
জীবন যাবে কি যাবে না, তা কখনো হয় না কোন কালে।
এ জগতে জীবন যত, চলে যাবে ঠিক সময় মত, কারো পানে চায় না সেত
যাওয়ার সময় হলে, টুপ করে যাবে সে চলে।

কেউ যদি যেতে চায় ওপারে, একটু আগে বা পরে
তা কখনো হয়না, কোনদিন কোন ছলে তা হয়েছে বলে, নেই কারো জানা
সে কেবল এখতিয়ার, মহাশক্তি বিধাতার।
এ ভবে কখন কে যাবে, তা তিনি ঠিক করে, সব হয় তাঁর বিচারে।

ভয় হয় বা না হয়, থাকে কুড়ে ঘরে বা অট্টালিকায়
সময় হলেই কাউকে কিছু না বলেই
সবাইকে চলে যেতে হয়।

পৃথিবীর ডাক্তার পৃথিবীর আহার, পৃথিবীর যন্ত্র পৃথিবীর যান
এতো সব পার্থিব জ্ঞান, শারীরিক সমাধান।

ডাক্তার জানে পার্থিব জ্ঞানে, শরীরের কি রোগ
ওষুধে সারে অসুখ আর দূর করে কষ্ট ভোগ।
মানুষের জ্ঞান শুধু প্রযোজ্য, যা কিছু শারীরিক ইন্দ্রি়য়গ্রাহ্য
এখানের সব জ্ঞান কেবল পার্থিব বিধান, আর সেগুলির সমাধান।

যা কিছু শরীর সবই তার গোলকধাঁধাঁ, জীবনকাল সময়ে বাধা
সবই তো তাই শেষ হয়ে যায়।

আত্মা, সেত স্বর্গ থেকে আসা, শরীরে বেধেছে বাসা
শরীর কথা কয়, সে থাকে যত সময়
সে কখন এ ভবে আসবে যাবে, তা সব স্বর্গ ঠিক করে দেয়।

আত্মা সেত শক্তি, অংশ মহাশক্তি বিধাতার
বসে বক্ষ ঘরে, প্রতিক্ষণ ধুকধুক করে, চায় মুক্তি দিবানিশি জীবন ভর।

সারাবেলা সারাক্ষণ, কেবল আগে পিছে ঘোরে অবুঝ মন।
রাখ বুকে কান, শোন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুর, শ্রেষ্ঠ গান।
আত্মা সবসময়, ধুকধুকিয়ে কয়ঃ
ছুটছো যার পিছে সারাক্ষণ, সেত মরিচিকা কেবলই ধোঁকা, কেবল ভ্রমে ভরে মন
মন বলে ভুল কর মোরে, পুজিতে আমারে পুজিছো তারে।
সব শুধু ভ্রম, ভাব মনকে আত্মা সম।
সেসব প্রহেলিকা সব ফাঁকা সব মিছে, সব তুচ্ছ যা কিছু আগে পিছে
যেতে দাও মোরে আপন নিবাসে ওই ওপারে।

অভুক্তকে খেতে দিলে, পেট তার ভরে গেলে, হাসি মুখে সে যায় চলে
তাতে কমে না দাতার মাল, অভুক্তর পেটও ভরা থাকে না চিরকাল।

ভরা পেটে সে উঠে দাঁড়ায়, তৃপ্ত দেহে পা বাড়ায়
যাওয়ার সময়, তৃপ্ত নয়নে ফিরে তাকায়।
হাসিতে ভরা সে বদন, স্বর্গীয় জ্যোতির স্ফুরণ।
বোঝে না কেন যে মন, থাকে না কেন স্মরণ?
সেতো শুধু হাসি নয়
সে তৃপ্ত বদন যা কিছু কয়, সবই তার আত্মার আহার এ ধরায়।

সেই হাসি ভরা স্বর্গীয় মুখ, একবার দেখবে যে সে সুখ
সে কেবল দিয়েই শান্তি পাবে, যতদিন রবে এ ভবে।

যত বেশী নেবে, আর যত পাবে, সবই শুধু বাড়াবে বোঝা এ ভবে
সব তার ছেড়ে যেতে হবে।
বোঝা যত হবে ভার, ছেড়ে যেতে ততো দুঃখ তার।

আত্মা সে এক ছায়া, বাধতে পারে না তাকে পৃথিবীর কোন মায়া।
কায়া ছেড়ে ছায়া, স্বর্গবাসে নিজ আবাসে ফিরে যায়
অবিনশ্বর বিধাতার অংশ হয়।
এ ধরার মাটিতে নিজ ঘাটিতে, নশ্বর শরীর পড়ে রয়।

শরীরের কোন অঙ্গ কেটে পড়ে গেলে, শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হলে
সেটাকে আর শরীর নয়, কাটা অঙ্গ বলা যায়।
ব্যাথা হলে হয় দেহের কাটা জায়গায়, কেটে পড়ে থাকা অংশে নয়।

তেমনি আত্মা গেলে চলে, শরীর পিছে ফেলে,
সে শরীরের উপর যা কিছু হয়, তাতে কারো কিছু আসে না যায়।

স্বর্গ সেত আত্মার নিবাস, তা অবিনশ্বর নেই তার বিনাশ
সেখানে নেই কোন কায়া, সবই কেবল ছায়া।
ছায়ার নেই ক্ষতি, কোন অনূভুতি, নেই কোন মায়া
স্বর্গে নেই প্রয়োজন কোন মনুষ্য জ্ঞান, কোন ঔষধ বা যন্ত্র যান।

মৃত্যু, সেত মহান, বিধাতার অপূর্ব এক দান
পঙ্কিল দেহের আবাস থেকে পূণ্য আত্মার প্রস্থান।
যিনি করেন দুটি সত্ত্বা এক, তিনিই করেন তা পৃথক
এই অমোঘ বিধান, জীবের প্রতি বিধাতার সবচেয়ে বড় কল্যাণ।

না থাকলে এ বিধান তাঁর, কি যে হত এ ধরার!
দেখে কি কেউ ভেবে, সব উন্মত্ততা ছেড়ে একান্তে নীরবে।

শরীর সেত পৃথিবীর অংশ, যা কিছু শরীর এ ভবে, একদিন সব তার হবে ধ্বংস
শরীরের ওষুধ পথ্য, পৃথিবী যুগিয়েছে তা নিত্য
তারপর শেষে, নিজ বুকে তারে নেবে মায়ের আদরে, সব রং ঢং নির্বিশেষে।

আত্মা শরীর নয়, তা বিধাতার অংশ, নেই তার কোন ধ্বংস, নেই ক্ষয়
মৃত্যু কোন রোগ নয়, শক্তিরূপি আত্মার মুক্তি, তার কি কোন অসুধ হয়?

বিধাতার অসীম দৃষ্টি তিনি করেছেন সৃষ্টি, এ প্রকান্ড বিশ্ব ব্রমান্ড
শুধু তাঁরই ইচ্ছে পূরণে তাঁরই প্রয়োজনে।
আমরা সবাই পুতুল সম তাঁরই এ ভুবনে
কেবলি চলেছি নেচে অদেখা সুতোর টানে।

Category: Meaning of Life

Write a comment