উপযোগিতা

আমাদের বসত বাড়ীর ভিটার সামনে অর্থাৎ দক্ষিন দিকে চারদিক উঁচু পাড় ওয়ালা প্রকাণ্ড একটা দীঘি, ওটারই উত্তর দিকের উঁচু পাড়ের উপর দিয়ে স্থানীয় সরকারের তৈরী পিচ ঢালা সরু রাস্তা পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে চলে গেছে। এই রাস্তাটা পূর্বে অবস্থিত মেইন রাস্তার সাথে গ্রামের সংযোগ ঘটিয়েছে। ওই রাস্তাটা দিয়েই গ্রামের মানুষের মাইল পাচেক দূরে অবস্থিত জেলা শহরে যাতায়াত। সরু রাস্তারটার প্রায় গাঁ ঘেঁসে দীঘির পাড়ের উপর একটা পুরনো বকুল গাছ দাঁড়িয়ে। ডালপালা ছড়ানো গাছটার নিচে বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছায়া ঢাকা।
দীঘিটা অনেক পুরনো, শুনেছি আমার পরদাদার আমলের। দীঘিতে নামার জন্য পুরনো সান বাধানো প্রশস্থ ঘাট। এখন আর খুব একটা কেউ দীঘিতে নামে না। সকাল সন্ধ্যাই আমি ঘাটের সিড়ির উপর বসি, দীঘির জলের দিকে তাকিয়ে নানা ধরনের কার্যকলাপ অবলোকন করতে করতে অলস সময় কাটাই।
সিড়িতে বসলে বকুল গাছটা মোটামুটি পিছনের দিকে থাকে। এতদিন খেয়াল করিনি সেদিন হটাৎ ঠুক ঠুক শব্দে ওদিকে তাকাতে নজরে পড়লো মধ্য বয়সী রোগা অসুস্থ একটা মানুষ বকুল গাছটাতে হেলান দিয়ে বসে, সামনে একটা পুরনো স্টিলের থালা রাখা। বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। ঘাটের সিড়িতে বসে বসেই দেখতে লাগলাম। রাস্তা দিয়ে চলাচলরত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কয়েন দিয়ে মাঝে মধ্যেই ষ্টীলের থালায় ঠুক ঠুক আওয়াজ করতে লাগলো লোকটি।
রাস্তা দিয়ে চলাচলরত দুএকজন মানুষকে ওর থালাতে খুচরা পয়সা দিয়ে যেতে দেখলাম। প্রথমে একটু বিরক্ত লাগলো এই ভেবে যে ভিক্ষুক আমাদের প্রাইভেট প্রপারটিজে কেন বসবে। ভাবলাম ওকে বলি -বাবা তুমি এখানে বসতে পারবে না। কারণ এটা কোন পাবলিক জায়গা না। ভিক্ষে করতে চাইলে কোন বাজার বা বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বস।
সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো, এক বৃদ্ধ মহিলা এসে ওর সামনে পাতা থালা থেকে পয়সা গুলো তুলে নিতেই সে উঠে দাড়াল। তারপর মহিলার পিছন পিছন একটা লাঠির অন্য পাশ ধরে হাটতে হাটতে চলে গেল। বুঝলাম লোকটি অন্ধ।
সারাটা জীবন চাকরি বাকরি করে দেশ বিদেশে সময় কাটিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সে নিজ পিতৃপুরুষের ভিটেতে এসেছি শেষ সময়টুকু কাটিয়ে দেব বলে। ছেলে মেয়েরা যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে। এখন আমার আর কারো কাছে কোন দায়বদ্ধতাও নেই, আর কারো কাছে আমার তেমন কোন উপযোগিতাও নেই। সবার কাছে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, তায় যাকে বলে উৎপত্তির কাছে ফিরে এসেছি নিজেকে উপলন্ধি করার মানসিকতা নিয়ে।
প্রায় দশ একর জমির উপর নির্মিত আমার পিতৃপুরুষের ভিটে বাড়ীটা। শত বছরের পুরনো ঘরবাড়ী বাদে বাকি অংশ গাছ গাছালিতে ভর্তি। বলতে গেলে সবাই আমারই মত জীবীকার অন্বেষণে বাইরে বাইরে। বাড়ীটা বলা যায় কর্ম ক্লান্ত সদস্যদের কালে ভদ্রের আবাস আর আমার মত উপযোগিতা হারানো মানুষের বৃদ্ধালয়। সব কিছু দেখাশোনা আর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেশ কিছু কাজের মানুষ আছে একজন কেয়ারটেকারের অধীনে।
ঘাটটা অনেক পুরনো আর বিশেষ করে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর জ্বরা জীর্ণ অবস্থা হলেও আমার খুব পছন্দ। ঘাটটা আমার মত যৌবনের টগবগে দিনগুলি হারিয়ে শেষ হওয়ার আগে কালের সাক্ষি হয়ে বেচে আছে। কিন্তু সামনের দীঘিটা জীবন্ত, পুরো যৌবনা। বাতাসের তালে তালে তার জলে ঢেউ খেলে, মাছ গুলো সাতার কাটে, মাছরাঙা পাখীদের জন্য যেন অভয়ারান্য।
সকাল সন্ধ্যায় এখানেই সময় কাটাই। ঘরে যতক্ষণ থাকি শুয়ে বসে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করি। সুখ দুঃখের স্মৃতি একে একে মানসপটে ভেসে ওঠে। মাঝে মাঝে কিছু কিছু স্মৃতি খুব কষ্ট দেয়।
যৌবনেও কর্ম ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে ব্যথার স্মৃতিগুলো মাঝে মাঝে মানসপটে ভেসে উঠত। কিন্তু তখন মনে মনে সময়মত প্রতিশোধ নেয়ার প্রত্যয় ব্যথাগুলো প্রশমিত করে রাখত। এখন বুঝি যে প্রতিশোধের মনোভাব অযথা ক্ষতগুলোকে শুখাতে দেয় না, ব্যথাগুলোকে অযথা জীবন্ত রাখে। প্রতিশোধ মুলক মনোভাব মানুষকে জীবনের মুল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে জীবন চলার গতি বরং স্লথ করে দেয়, থামিয়ে দেয় বা উল্টো মুখি করে। জীবন থেকে বুঝেছি যে, জীবনের আপাত হার গুলো মেনে নিয়ে সামনে চললে জীবন সুন্দর ও সুখি হয়। প্রকৃতই বিশ্ব নিয়ন্তা প্রতিশোধপরায়ণতা পছন্দ করে না।
জীবনের এই প্রান্তে এসে এখন যখন ভাবি স্মৃতিগুলো সব অতীত, মনে করলে জীবিত না করলে মৃত, তখন কষ্ট গুলো চলে যায়।
স্মৃতির রোমন্থনের মত মাঝে মাঝে আমার অনেক কষ্টার্জিত বিভিন্ন সময়ের ভারে জীর্ণ সার্টিফিকেটের কপিগুলো উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখি। ওগুলো সব জীবনের মূল্যবান উপার্জন। তাই যত্ন করে রেখেছি। ওগুলোর দিকে নজর পড়লে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, মন উদাস হয়। মনে হয় সার্টিফিকেট গুলো পুরনো জীর্ণ কাগজ ছাড়া এখন আর কিছু না। এগুলোর প্রয়োজন এখন ফুরিয়ে গিয়েছে।
পার্থিব সব কিছুর উপযোগিতা সময়ের গণ্ডিতে বাধা। সময় জীবকে যেমন ধীরে ধীরে দুর্বল করতে করতে একদিন শেষ করে দেয়। তেমনি জড় বস্তুকেও ক্ষয় করে করে একদিন ধ্বংস করে দেয়। সময়ের সাথে সাথে জীব জড় সব কিছুই উপযোগিতা হারাতে হারাতে একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়।
অন্ধ ভিক্ষুটির পয়সা দিয়ে স্টিলের থালাটাতে ঠুক ঠুক করে করা শব্দ আমাকে চিন্তার জগত থেকে টেনে বের করে আনলো।
ভিক্ষুকটি চোখে দেখতে না পারলেও ওর শ্রবন শক্তি খুব প্রখর। হেটে যাওয়া মানুষের পায়ের আওয়াজ বা কোন সাইকেল বা রিকশা আসতে থাকলে দূর থেকে ও বুঝতে পেরে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ও রকম ভাবে শব্দ করে।
সেদিকে তাকিয়ে ভাবি ওর কথা। বিধাতা ওর থেকে দৃষ্টি শক্তি কেড়ে নিয়েছে আর সেটাকে পুঁজি করে ও মানুষের দয়া করার জন্মগত প্রবণতাকে আকর্ষণ করার কাজে লাগাচ্ছে। আর দয়াময় বিধাতা ওর দৃষ্টি শক্তির কমতিটা ওর শ্রবন শক্তির তীক্ষনা দিয়ে পুরন করে দিয়েছে।
এটা এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার এক অপার মহিমা। ভাবনাটা আমার ভিতর কেমন যেন একটু সাহস সঞ্চার করল।
ভিক্ষুকটি এখানে বসার ব্যাপারটি কেয়ারটেকার খোদাবক্স জানে। তার কাছ থেকেই শুনলাম, অন্ধ ছেলেকে ওর মা এর আগে বাজারে বসিয়ে আসতো ভিক্ষে করার জন্য। কিন্তু ওখানে নাকি দিন শেষে রোজগারের অর্ধেক খাজনা হিসেবে দিতে হয়, তায় অসহায় মা ওর অন্ধ ছেলেটাকে এখানে বসার জন্য তাকে অনুরোধ করেছিল। খোদাবক্স জানিয়েছিল যে, এখানে গ্রামের মধ্যে কে ভিক্ষে দেবে, কিন্তু এখন ওর মা বলে রোজগার নাকি ভালই হয়।
ওর মা সকালের দিকে অন্ধ লোকটিকে বকুল তলায় বসিয়ে দিয়ে যায় আবার দিন শেষে ঘরে নিয়ে যায়। অন্ধ ছেলেকে ভিক্ষেই বসিয়ে ওর বৃদ্ধা মা বিভিন্ন বাড়ীতে কাজ করে। থাকে এ গ্রামেরই এক জনের বাড়ীর বারান্দায় চট দিয়ে ঘিরে।
হটাৎ একদিন দেখি ভিক্ষুকটি নেই, ভাবলাম শরীর খারাপ করেছে। কিন্তু না, সপ্তাহ খানেক হয়ে গেল, ও আসলো না। আমি দারুন ভাবে ওর অনুস্পস্থিতিটা বোধ করতে লাগলাম। এমনটিই বোধহয় হয়, কোন কিছু চলে যাওয়ার পরই তার জন্য অভাব বোধ হয়।
খোদাবক্সকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম ওদের ব্যাপারে। খোদাবক্স জানালো কয়েকদিন হল অন্ধ ভিক্ষুকটি মারা গিয়েছে।
এখন মনে পড়লো, অন্ধ ভিক্ষুকটি পয়সা দিয়ে ঠুক ঠুক শব্দ করা ছাড়াও ও মাঝে মধ্যেই খুক খুক করে কাশতে কাশতে গেয়ে উঠত ‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়’।
হৃদয়টা হু হু করে উঠলো, আফসোছে মনটা ভারী হল।
-এতদিন পাশাপাশি বসে সময় কাটালাম অথচ একটিবারের জন্যেও ওর সাথে একটু কথা পর্যন্ত বললাম না!
নির্জন পড়ন্ত বিকেলে বকুল গাছটার গুড়ির কাছে যেখানে ভিক্ষুকটি বসতো সেখানে যেয়ে দাড়ালাম। জায়গাটা শুন্য, বেলা ডুবার আগেই অন্ধকার দানা বেধেছে গাছটার নিচে। দু’একজন মানুষ যাতায়াতের পথে সেদিকে তাকিয়ে চলে যেতে দেখলাম।
-ভিক্ষুকটি কোথায়, জানেন কি? আগে রোজ ওকে দেখতাম, কয়েকদিন ধরে দেখি না। একজন পথচারীর জিজ্ঞাসাই তাকালাম তার দিকে।
ও মারা যাওয়ার পর আমার মত অনেকেই ভিক্ষুকটির উপস্থিতির অভাব বোধ করল। ভাবলাম এটাই দুনিয়ার নিয়ম। থাকলে না থাকার অভাব কি ভাবে বোধ হবে! যখন থাকে না কেবল তখনই থাকার অভাব অনুভূত হয়।
হটাৎ করে গাছের গোড়ায় নজর পড়তেই দেখলাম একটা জীর্ণ পাটের বস্তা ভাজ করে রাখা। মনে পড়ল এটার উপরই অন্ধ ভিক্ষুকটি আসন গেড়ে বসতো। ভাবলাম এখন এটা আর কোন কাজেই আসবে না।
বুক খালি করে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসলো।
মনে পড়লো আমার পুরনো জীর্ণ কাগজের সার্টিফিকেট গুলোর কথা। ওগুলোর মত এই জীর্ণ পাটের বস্তারও এখন আর কোন উপযোগিতা নেই।
কতক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানিনা। খেয়াল হতেই দেখলাম ইতিমধ্যেই আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। সময়টা বোধহয় আমাবস্যা বা তার ঠিক আগের রাত। সন্ধ্যা হতে না হতেই অন্ধকার চারিদিকটা একদম গিলে ফেললো। নিজের হাত পা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। কোনরকমে আন্দাজের উপর নির্ভর করে ঘাটে যেয়ে বসলাম।
মেঘ মুক্ত আকাশে ঝলমল করা তারার প্রতিচ্ছবি দীঘির জলে দেখা যাচ্ছে। স্বর্গীয়! ওটাকে ছুয়ে দেখার এক অপ্রতিরুদ্ধ টানে আমি যেন মোহমুগ্ধ হয়ে মোহঘোরে ডুবে যেতে লাগলাম।
মনে হল-এ জীবনের কি অর্থ, ভিন্ন ভিন্ন পথ ঘুরে, সব অর্জন ত্যাগ করে একই জায়গায় শেষ। ভাবলাম একেবারে চলে যাওয়া অর্থাৎ মৃত্যু’ই বোধহয় জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। কিন্তু তারপর!
বুক খালি করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল।

Category: Meaning of Life

Write a comment