বাবাকে খুব মনে পড়ে

আপন যারা সবাই তারা শুয়ে আছে জনে জনে আমাদেরই গোরস্থানে
ঘুমিয়ে সবাই চির নিদ্রায়, নাম লেখা সব সমাধিশিলায়।
বাবা, দাদা,পরদাদা আর তাঁদের দোসর
সবাই আছে মিলে মিশে, নেইকো কারো কোন ওজর।

ছোট বড় নির্বিশেষে, শিলাগুলো দাঁড়িয়ে আছে শীর্ষদেশে
লাইন বাধা সারি সারি, দেখতে সব লাগছে ভারি।
একে একে ছুয়ে দেখে, মনে মনে ছবি একে
সকাল সাঝে হৃদয় মাঝে করছি তাঁদের কদমবুছি।

বাবার কবর ছুঁতেই যেন, তড়িৎ ঝলক বইছে কেন নিরবধি
মাথা থেকে শরীর ঘুরে পা অবধি।
গায়ের জোর সব ফুরিয়ে গেল, পা দুটো মোর অবশ হল
চক্ষু দুটো ঝাপসা হলো, অশ্রু জলে ভিজে গেল।
হাটু গেড়ে বসে পড়ে থমকে গেলাম
শিলার গায়ে কপাল ছুঁয়ে হেলান দিয়ে, সামলে নিলাম।

রোজ বিকেলে অফিস শেষে, ফিরত বাবা ক্লান্ত দেহে মলিন বেশে
ফিরলে বাবা বোঝা যেত, সব কোলাহল শান্ত হত।
সন্ধ্যে হলে খেলা ফেলে, কাজ সেরে সব হাতে হাতে, পড়তে বসা একই সাথে।

সংসারটা ছিল বেজায় বড়
বারো ভাই বোন সব হলে জড়
যেন বিদ্যালয়ের ক্লাস রুম, হট্টোগোলের পড়তো ধুম।
বসতো বাবা ছড়ি হাতে, কম কিছু না কোন মাস্টার হতে
দেখতো পুরু চশমার ফাঁকে, ধরবে কাকে হাতে নাতে।
চড় থাপ্পড় আর বেতের বাড়ি, দুষ্টুমি বন্ধে মহা বড়ি।

বাবার মার যখন খেতাম, শরীরে খুব ব্যথা পেতাম
মনে খুব কষ্ট হত, দুচোখ বয়ে জল গড়াত
মনে হতো বাবা আমায়, ভালবাসে না কোন সময়।

সে ভাবনা ঠিক ছিল না, তা এখন বুঝি
সব ভুলে তাই, এখন সবাই বাবাকে খুঁজি।
যদি বাবার হাতে মার না খেতাম
আমরা সবাই মানুষ নয় বানর হতাম।

যে বাবাকে ‘আপনি’ ডেকে ছিলাম দূরে জীবন ভরে
সেই বাবাকে বক্ষ মাঝে লালন করি সকাল সাঝে।
বাবার কথা পড়লে মনে, অশ্রু ঝরে দু’নয়নে।
পাছে কেউ দেখল নাকি, মুখ লুকিয়ে লজ্জা ঢাকি।
বিশেষ করে খোকা আমার জানলে পরে
দেখবে শুধু চক্ষু মেলে ফ্যাল ফ্যালিয়ে।

যদি খালি খোকাকে বলি, চল, আমাকে তুই ‘আপনি’ বল
চড় থাপ্পড়, বেতের বাড়ি ওসব না হয় দিলাম ছাড়ি।
ওরে বাবা খোকা তবে অক্কা যাবে, তানা হলে
কিছু না বলে আমায় ছেড়ে যাবে চলে।

ভালবাসা একই আছে, ধরণটা শুধু পাল্টে গেছে
সময়ের দাবি মানতে হবে, তানা হলে সব উল্টে যাবে।

আমি বসে, বাবার কবর ঘেঁসে, ভাবছি কেবল বাবার উষ্ণ কোল
চোখের জল বাধ ভেঙেছে, চোয়াল দুটো ভিজে গেছে

বাবা তোমায় জড়িয়ে ধরে ‘তুমি’ বলতে খুব ইচ্ছে করে।
আশে পাশে দূরে কাছে, সবাই এখন ঘুমিয়ে আছে
বইছে বাতাস মৃদু বেগে, কেবল আমি আর বাবা জেগে।

এমনি ভাবে পায়নি তাঁকে কোন ছলে জীবন কালে
এই ফাকে কি বলব তাকে ‘বাবা তুমি কেমন আছো’!
দেখিনি তোমায় কত সময় যখন থেকে চোখ বুজেছো।
এমনি ক্ষনে এই নির্জনে খুব ইচ্ছে করে মনে মনে
তোমার বুকে মাথা গুজে চোখ দু’খানি একটু বুজে
জূড়ায় আমার মনের জ্বালা করব নাক আর ঝামেলা।

বসে আছি গোরস্থানে বাবার কথাই ভাবছি আমি মনে মনে
ভরা দুপুর, যেন মৃত নগর, নেই শব্দ কোন পাতা নড়ার।
হটাৎ করে একে একে কোকিলরা সব উঠল ডেকে তালে তালে, লুকিয়ে বসে গাছের ডালে।
গাছের শাখে হুস হুস করে, হাসল বাতাস মৃদু স্বরে, গাছের পাতা পড়লো ঝরে
শুখিয়ে দিল, ঘাম যা ছিল মোর কপালে।

বৃষ্টি এল আকাশ থেকে, গাছের শাখায় চেনা পাখি উঠলো ডেকে
বলল বাবা চুপে চুপেঃ

কবর ধরে খোকা, কাঁদিস নারে বোকা
সেত সবার, কেবল কায়ার আধার, আমি নেই ওখানে আর।
শরীর ছিল আমার সাথে সুখে দুখে, যার জিনিস সে নিল বুকে
মৃত শরীর মাটির খাবার, এতদিনে একটুও আর নেই বাকি তার।

আছি আমি বাতাস হয়ে, সকাল সাঁঝে পাখীর কন্ঠে সুরের মাঝে।
যখন সূর্য কিরণ ঠিকরে পড়ে তোর উপরে
বাতাস যখন যায় দুলিয়ে, চোখ মুখে তোর দেয় বুলিয়ে
ভাববি আমি আছি তাতে, সব সময় তোরই সাথে।

খোকা, যা ফিরে তুই নিজ ঘরে, শুধু শুধু ভিজিস নারে
কষ্ট যত তা সব শরীরে, আত্মাকে না ছুঁতে পারে
শরীর ছেড়ে আমরা এখন আলো, এখানে সবাই আছি ভাল।

চোখ থেকে জল মুছে ফ্যাল খোকা, কাঁদিস তুই কেন খামাকা!
যার লাগি কাঁদিস জাগি, দিন রাত নির্বিশেষ, কবরে তার নেই কিছু আর অবশেষ।

শরীর সেত কেবল কায়া, শুধু জাগায় মায়া, সবই তার অস্থায়ী আর অযথা
স্থায়ী কেবল আলো, আছি আমি তোরই পাশে আলো কিম্বা কালো
কালো দেখে ভয় পাবি না, কালো মানে আলো আছে ধারে কাছে খুব দূরে না।

যখন যেদিন কোন ক্ষনে, আমাকে তোর পড়বে মনে
চোখ খুলে নয়, বন্ধ করে খুজবি মোরে।
চোখ শুধু দেখতে পারে, যা কিছু থাকে আকারে
আমিতো আকার ছেড়ে, আছি নিরাকারের নীড়ে।

Category: Taken from Life

Write a comment