মেঘমুক্ত বিকেল বেলা, দেখতে দেখতে ওয়াকওয়েটা হাটতে আসা মানুষের পদশব্দে মুখরিত হয়ে উঠলো। কিন্তু আজ কেন জানি আমার হাটতে একদম ইচ্ছে করছে না। পা দুটো যেন চলতেই চাচ্ছে না। লেকের চারধার পেচিয়ে তৈরী ওয়াকওয়ের গাঁ ঘেসে কিছু দূর পর পর নির্মিত ছাতার নিচে সিমেন্টের তৈরী বেঞ্চ, তারই একটাতে বসে পড়লাম।
অনেক চেনা অচেনা মানুষ হেটে চলেছে। আমার মত দু’এক জন হাটা শেষ করে ক্লান্ত হয়ে লেকমুখি বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে।
কিন্তু আমার বিশ্রামটা অন্যান্য সবার মত হাটা শেষ করে ক্লান্ত হয়ে নয়। মনটা আজ একদমই ভাল না, একবার ভেবেছিলাম হাটতে আসবো না, আবার ভাবলাম বিকেল বেলা ঘরে বসে বসে কিই বা করব। ওয়াকওয়েটা আমার খুব পছন্দের একটা জায়গা তাই ভাবলাম শেষ বিকেলটুকু এখানেই কাটিয়ে যাই। ওয়াকওয়েটা একবার ঘুরলে আটশ মিটারের মত হয়, আর আমি সাধারণত পাচ ছয় বার ঘুরি। কিন্তু আজ এক ঘুর শেষ না করতেই শরীরটা ক্লান্তিতে ভরে উঠলো।
সন্ধ্যে হতে আরো ঘন্টা দেড়েক বাকি। ভাবছি এখানে বসেই সময়টা কাটিয়ে ফিরবো।
আমি বসতে না বসতে অন্য একজন ভদ্রলোক হাটা ছেড়ে এসে আমার বেঞ্চে অপর পাশে বসলো। আমাদের চোখাচোখি হল, দুজনেই ভদ্রতা করে হাই বলে মাথা নাড়লাম।
কাল ভোরে এ শহর ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি। আমার দীর্ঘ চাকুরী জীবনের সব বন্ধু বান্ধবেরা অবসর গ্রহনের পর এই আবাসিক এলাকাতেই বাসা বাড়ী বানিয়ে বসবাস করে। এসব কিছু ছেড়ে আমি আমার পিতৃপুরুষের ভিটেতে ফিরে বাকি জীবনটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার স্ত্রীও কিছুটা অনন্যোপায় হয়ে আমার সাথে যেতে রাজি হয়েছে।
পিতৃপুরুষের বাড়ী হলেও কেবল কালে ভদ্রে যাতায়াতের সম্পর্ক বাড়ীর সাথে। চাকরিতে থাকা অবস্থাই যখন সরকারী বিভিন্ন সংস্থার মানুষজন আমার অনুরোধ রক্ষা করতো তখন তাদের বদান্যতায় আমি আমার অঞ্চলের মানুষের কিছু কিছু উপকার করা, যেমন কারো চাকরী পাইয়ে দেয়া বা কারো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি সহ অঞ্চলে রাস্তা ঘাট করার ব্যাপারে সহায়তা করার সুবাধে মানুষের কাছে আমার কম বেশী সুনাম আছে। তার উপর বাপ দাদা পরদাদার পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে গ্রামের মানুষ আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে বলে ভরসা আছে।
কিন্তু আমার স্ত্রীর সেটা নেই, বিয়ের পর বেশ কয়েকবার বেড়াতে যাওয়ার মধ্যেই শ্বশুরবাড়িতে তার পরিচিতি সীমাবদ্ধ, তাই সে কিছুটা দ্বিধান্বিত।
গত সপ্তাহে আমরা এ কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়েছি, আর সে মোতাবেক টিকিট কাটা ইত্যাদি সব কিছুই সম্পন্ন করতে কয়েকটা দিন লেগেছে।
আমাদের একমাত্র ছেলে তাকে যে কোন বাবা মায়ের মত বুকে আগলে রেখে ভাল স্কুল কলেজে পড়িয়ে ডাক্তার বানিয়েছি এবং তাকে তার পছন্দের পাত্রির সাথে আমাদের সব ইচ্ছে অনিচ্ছেকে জলাঞ্জলি দিয়ে ধর্মীয় ভাবে বিয়েও দিয়েছি। আমাদের ডাক্তার বৌমার কিছুটা আবদার রক্ষার্থে বিয়ের অনুষ্ঠানটা পরবর্তী মাসে ধার্য করা হয়েছে। এমনি সময় আমাদের অতি আদরের ছেলে, যাকে আমাদের বৃদ্ধ বয়সে অন্ধের যষ্টি বলা যায়, তার একটা মন্তব্য আমাদের মনটা একদম ভেঙ্গে দিয়েছে। আর তাই খোকা আর ওর বউয়ের জন্য আমাদের আজীবন স্বপ্নের এ বাসাটা ছেড়ে দিয়ে আমারা জীবনের শেষ সময়টুকু কাটানোর জন্য আমার পিতৃপুরুষের বাড়ীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নিজের গড়া স্বপ্নের ভুবন ছেড়ে অচেনা হয়ে যাওয়া ভুবনে পদার্পণ করতে যাচ্ছি!
-ভেবে দেখ, তাওতো ভাল, যে আমারা আমাদের পৈত্রিক বাড়ীটা কেয়ারটেকার রেখে সংরক্ষন করে রেখেছিলাম বলে মাথা গোঁজার মত একটা আশ্রয়তো আছে। কিন্তু আমার অনেক বন্ধুকেই জানি যারা একটু বেশী হিসেব করতে যেয়ে বাপ দাদার ভিটের অংশ বিক্রি করে দিয়ে স্থায়ী ভাবে শহুরে হয়ে গিয়েছে।
আমার স্ত্রীর সাথে এ প্রসঙ্গটা আলোচনা করে ভগ্ন হৃদয়ে কিছুটা হলেও শান্তনার উদ্রেক করতে সামর্থ্য হয়েছি।
-আপনাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে!
আমার পাশে উপবিষ্ট ভদ্রলোকের কথায় নিমগ্নতা ভেঙ্গে চিন্তা জগত থেকে বেরিয়ে আসলাম। তাকালাম তার দিকে। খুব বেশী দেরি হল না ওকে চিনতে।
-আরে লিটন তুই!
-কবির, তোকে আমি দেখেই চিনেছি, কিন্তু তুই যেভাবে কোনরকমে একটু ভদ্রতা সেরেই নিজ জগতে ডুব দিলি তাতে সন্ধেহ না হয়ে পারে!
আমরা একই ব্যাচের, সুখ দুঃখের অনেক স্মৃতির সাথি ও। চাকরী থেকে স্বইচ্ছায় আগেই অবসর নিয়ে পরিবার সহ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল। চাকরীর নিয়মে আমরা ব্যাচমেট সবাই এই আবাসনে সকারের দেয়া জমি পেয়ে বাড়ি তৈরী করেছি। এখানে আমাদের জুনিয়র সিনিয়র সহ প্রায় হাজার খানেক পরিবারের বসবাস। সবাই সবার সাথে হয় সরাসরি না হয় চাকরীর সুত্র ধরে কোন না কোন ভাবে চেনাজানা।
এখানে বসবাসকারীদের একটা বড় অংশই লিটনের মত, হয় পরিবার নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে, নয়তো ছেলে মেয়েদের বিদেশে পাঠিয়ে স্বামী স্ত্রী একাকী দিন যাপন করছে। সেক্ষেত্রে আমরা বলতে গেলে ব্যতিক্রম। একমাত্র ছেলেকে নিজেদের কাছে রাখার চেষ্টা করেছি, শেষ জীবনে একসাথে থাকবো বলে।
এ বয়েসে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা হলে বন্ধুদের আলোচনার মুল বিষয় সংগত কারণে কার ছেলে মেয়ে কোথাই আছে, কি করছে এ গুলো নিয়ে ঘুরপাক খাই। যারা পরিবার সহ বিদেশে অবস্থান করে বা ছেলেমেয়েদেরকে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করে একাকী বসবাস করে তারা সামাজিক অবস্থানের মাপকাঠির হিসেবে এগিয়ে আছে বলে বিবেচিত হয়। এভাবে জীবনে কে এগিয়ে আর কে পিছিয়ে সে প্রসঙ্গটি যে কোন সামাজিক মেলামেশার অনুষ্ঠানে পার্শ্ব আলোচনার একটি মুল বিষয় হয়ে ওঠে।
আমার মত যারা, তারা এগিয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে থাকার মাপকাঠিতে কিছুটা হীনমনতায় ভুগলেও আমি ও আমার স্ত্রী আমাদের একমাত্র সন্তানকে নিজেদের কাছে রাখার সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে আত্মতুষ্ট থাকি।
লিটন আর আমি সহ আমাদের অধিকাংশ ব্যাচমেটরা বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এক সময় বুক উঁচু করে দেশে বিদেশে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছি এবং সে জন্য সরকার ও আমাদের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রশংসাও পেয়েছি। কিন্তু বর্তমানে প্রেৌঢ়ত্বের ভারে আমার বয়সি প্রায় সকলে কম বেশী কুঁজো হয়ে হাটে, চোখে কম দেখে বা কানে কম শোনে, বার্ধক্য জনিত অসুখ বিসুখের কথা না হয় বাদই দিলাম। সে দিন গুলোর দিকে তাকিয়ে নিজেকে এখন কাক তাড়ুয়ার মত লাগে। কেবল কাঠামোর উপর জামা গায়ে দাঁড়িয়ে বাতাসের জোরে নড়াচড়া করি।
লিটন একটু আগে ভাগে চাকরী থেকে অবসর নিলেও আমি চাকরীটা যথারীতি শেষ করে অবসর গ্রহন করে একমাত্র সন্তান সহ একত্রে বাস করার সুখ স্বপ্নে নিয়ে মনের মত করে বাড়ীটা বানিয়েছিলাম।
অঞ্চলের মানুষ অবশ্য আমাকে মান্যগণ্য করে থাকে। বাড়ীতে গেলে সবাই কম বেশী সময় দেয়, তাদের মনের কথাও শেয়ার করে। কিন্তু তবুও আমার জীবনের সব অর্জনই পড়ে আছে এই শহরে, সেটা সহায় সম্পত্তি হোক বা বন্ধু বান্ধব বা চেনা জানা মানুষই হোক। সর্বোপরি আমাদের একমাত্র ছেলে এখানেই থাকবে, আমরা গ্রামে গেলে ওর সাথে তো আর থাকা যাবে না। তায়তো এ সব ছেড়ে নিজ পিতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার মত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে খুব কষ্ট হয়েছে।
ভাবলাম -ভালই হল লিটনের সাথে দেখা হয়ে। ওতো বিদেশে থাকে, কালে ভদ্রে আসে তায় ওর কাছ থেকে বিদায় নেয়া যাবে। জানিনে আর কখনো দেখা হবে কিনা।
-ভালই হল বন্ধু, এখন থেকে তোদের সাথে সব সময় দেখা হবে।
লিটনের কথাই অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। ঠিক বুঝলাম না ওর কথা।
-ফিরে আসলাম বন্ধু একেবারে, ভাগ্যিস একটা ফ্লাট রেখেছিলাম আমার বিল্ডিঙয়ে, ওটাও বিক্রি করে টাকা পাঠিয়ে দিতাম যদি সরকারি বাধ্যবাধকতা না থাকতো। যাক, মাথা গোজার মত একটা ঠাই তো আছে। এখন বাকি সময়টুকু কাটাতে পারলেই সব শেষ।
একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে কথাগুলো বলল লিটন। ওর চোখে মুখে বেদনার অভিব্যক্তি সুস্পষ্ট।
-জানিস বন্ধু বাচ্চারা সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত, ওরা ওখানেই পড়াশোনা করে ওদেশের সংস্কৃতির সাথে পুরোপুরি মানানসই করে নিয়েছে। বাচ্চাদের সাথে বসবাসের জন্য আমিও পাড়ি জমিয়েছিলাম ওদেশে। ওখানে চাকরী করেছি বেশ কয়েক বছর, তারপর সিনিয়র সিটিজেন হিসাবে সুবিধাও ভোগ করতাম। আর্থিক কোন অসুবিধে ছিল না। তবে অসুবিধে যেটা হল সেটা জাগতিক নিয়মে বাধা। শরীর ভেঙ্গে পড়তে লাগলো, ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হতো। ছেলে বউ দুজনেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। তাই বউমা পরামর্শ দিল কোন উন্নত মানের ওল্ডহোমে গেলে ভাল হয়, কারণ সেখানে যেমন সার্বক্ষণিক ডাক্তারের ব্যবস্থা আছে তেমনি সমবয়সিদের সাথে সময় কাটাতে অসুবিধে হবে না।
-ডাক্তার ইত্যাদির ভাল ব্যবস্থা সে সব ঠিক আছে, ওখানকার বাসিন্দারাও আমারই বয়সি। কিন্তু ওরা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ, ওদের সাথে সময় কাটানো সুখকর হবে না, সে চিন্তাটা মাথায় রেখে ইতস্তত করে বউমার পাশে দাঁড়ানো ছেলের মুখের দিকে তাকালাম। কেন জানি মনে হল খোকা মুখটা ঘুরিয়ে নিল। বললো না কিছু।
-আমি জানি আমার অসহায় চাহনিতে খোকা বুঝলো আমার অনীহার বিষয়। কিন্তু বাস্তবতার কাছে ও যেন নতি স্বীকার করলো। মনে হল, বাস্তবতার কাছে বাবার প্রতি ওর ভালবাসার বিষয়টা পরাভূত হল।
-জানিস কবির, সেদিন থেকে নিজেকে নিজের কাছে বোঝা মনে হতে লাগলো।
-খোকা আমি না হয় দেশে ফিরে যাই।
কয়েকদিন পর খোকাকে কথাটা বললাম। খোকা জানে দেশে আমার আপন বলতে কেউ নেই, আর শেষ বয়সে খোকার সাথে বসবাস করা আমার চিরিদিনের ইচ্ছে, সেটাও ও জানে।
আশা করলাম খোকা একবার বলুক –বাবা, এই বয়েসে দেশে তুমি কার সাথে থাকবে?
-কিন্তু না, খোকা সেরকম কিছু বলল না।
ব্যস্তভাবে বেরিয়ে যেতে যেতে অনেকটা স্বগত স্বরে বলল –দেখ, তুমি যেটা ভাল মনে কর।
-বন্ধু, খোকার ওই কথার ভার আমি সইতে পারিনি, আর তাই একেবারে ফিরে আসলাম। অন্যান্যদের কথা এখনও জানিনে, কিন্তু অন্তত তুই তো আছিস, দুই বন্ধু মিলে গল্প করে বাকি সময় কাটিয়ে দেব, কি বলিস?
কথাটা বলে লিটন জোর করে হাসার চেষ্টা করল।
আমি নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলাম ওর কথা। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ওর যন্ত্রণার গভীরতা আঁচ করার চেষ্টা করলাম।
মানুষের মুখের উপর ফুটে উঠা অভিব্যক্তি অবলোকন করে রং তুলিতে সেটা ফুটিয়ে তোলা আমার চিরকালের একটা প্রিয় সখ। ক্যানভাসের উপর ওর ভারাক্রান্ত মুখাবয়বটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম।
ওর কথার কোন জবাব না দিয়ে জোর করে একটু মুচকি হাসলাম। তাতে ও কি বুঝল বলতে পারব না।
মানুষের মুখের বিভিন্ন অভিব্যক্তির ছবি রং তুলি দিয়ে কাগজ বা ক্যানভাসে আঁকা আমার খুব প্রিয় একটা সখ। আর শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে সেগুলো পেন্টিং করতাম, আর ওগুলো অতি যত্নে আমার বাসার ড্রইং রুমে সাজানো। আমার স্ত্রীর সেটা পছন্দ না, কিন্তু আমার সখের প্রতি সম্মান জানিয়ে সে তার আপত্তিটা সারা জীবন চাপা রেখেছে তা আমি জানি।
খোকা বিয়ে করে আমাদের ফ্ল্যাটটা ওর মনের মত করে সাজাবে বলে মনস্ত করেছে। কিন্তু আমার পেইন্টিং গুলো ড্রইং রুমে রাখা ওর একদম পছন্দ না। ব্যাপারটা ওর মাকে বলাই ওর মা প্রবল আপত্তি করে, কারণ ওগুলো আমার খুব পছন্দের জিনিস।
এ বিষয়ে মায়ের সাথে খোকা কথা কাটাকাটি করার এক পর্যায়ে বলে –ঠিক আছে, বাবা তো আর চিরদিন থাকবে না, তখন আমি ওগুলো ফেলে দেব।
সে রাতেই আমি আর আমার স্ত্রী ঠিক করেছি খোকার সাথে একত্রে থাকা বোধহয় আর ঠিক হবে না। খোকা এখন বড় হয়েছে, ওর আলাদা সংসার হয়েছে। এ সবের একটা আলাদা দাবি আছে। এ সব কিছু চিন্তা করে, বাস্তবতা মেনে নিয়ে আমরা দু’জনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সে ভাবেই কাল সকালে আমাদের এ শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।
এ সবের কোন কিছুই বললাম না লিটনকে।
জীবন চলার প্রতিযোগিতায় কেবল সামনে এগোনো বা অপরকে টপকে যাওয়াকে জীবনের লক্ষ ভেবে ছুটতে ছুটতে জীবন সায়াহ্নে এসে ক্লান্ত হয়ে বুঝতে পেরেছি যে –সামনেটা সীমাহীন, সেটার যেমন কোন শেষ নেই, তেমনি অপরকে টপকানোরও কোন অন্ত নেই।
দিনমনি পশ্চিম আকাশে দিগন্ত রেখা পার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে যেন শেষ বারের মত উঁকি দিয়ে দেখে নিচ্ছে প্রিয় জগতটাকে। ওয়াকওয়েটা ধীরে ধীরে জনমানব শুন্য হয়ে যেতে লাগলো। মৃদু বাতাসে লেকের জলের মৃদু মন্দ ঢেউগুলো কালো আঁধারে ঢেকে গেল। লেকের গাঁ ঘেসে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোতে ঘরে ফেরা পাখীর কিচির মিচির শব্দ মন উদাস করল।
ভাবলাম আমি, লিটন আর আমাদের মত সবাই ঘোরানো পেচানো দীর্ঘ পথ পরিক্রমণের পর বেলা শেষে একই সমতলে দাঁড়িয়ে একই গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।
প্রতিটি জীবনের সুখ দুঃখ পরিমাপে একই, ভিন্নতা কেবল প্রেক্ষাপটের আর কারোটা বা শারীরিক কারোটা মানসিক, কারোটা দেখা যায় কারোটা যায় না। পার্থিব অর্জনের ব্যাপারে এ দুনিয়াতে কেউ কারো আগে বা পিছে না, বিষয়টি আপেক্ষিক কেবল ব্যাখ্যার ভিন্নতা। বেলাশেষে সব হিসেব একই অংকে শেষ হয়।

Category: Meaning of Life

Write a comment