-ওর কপালটাই খারাপ।
বিয়ের দশ বছর পরও যখন অবনীর কোন সন্তান হচ্ছিল না তখন পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন সবাই বিরুপ ভাবে বিষয়টি আলোচনা করে এ ভাবেই মন্তব্য করতে লাগলো। অনেকে আবার ওর বউটা বন্ধ্যা ইত্যাদিও বলতে লাগলো।
প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনদেরই বা কি দোষ, সবারই বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে বাচ্চা জন্ম নেয় কিন্তু অবনী আর অরপার বেলাই কেবল ব্যতিক্রম। অবনী ওর বাবার একমাত্র সন্তান তাই বংশের বাতি জ্বালিয়ে রাখার জন্য একটা সন্তানের কথা তো মানুষ বলতেই পারে।
অবনীও ভাবে বিষয়টি নিয়ে, অরপার সাথেও আলোচনা করে। কিন্তু কি করবে কিছু ভেবে পায় না। ওরা নিজেদের মত করে ডাক্তার কবিরাজের কাছেও গিয়েছে, কিন্তু এ যাবত কোন ফল ফলেনি।
-মানুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় কি সন্তানাদি পয়দা করার জন্য, যাতে করে বংশ রক্ষা হয়! সাধারণত প্রায় সব পরিবারের সন্তানেরা বড়জোর দাদা পর্যন্ত খবর রাখে, পরদাদা থেকে তার আগের প্রজন্ম পর হতে হতে একদিন হারিয়ে যায়। শুধু কিছু নাম করা ব্যক্তিরা হারিয়ে যায় না, তবে তারা স্মরণে থাকে তাদের কর্মের মাধ্যমে। দুই তিন প্রজন্ম পর তাদের আপন জনদেরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুজে পাওয়া যায় না। তাহলে বংশ রক্ষার বিষয়টি সাময়িক, চিরস্থায়ী না।
-না কি, সবাই বিয়ে করে বয়স হলেই, কারণ পরিবার ও সমাজের নিয়ম কানুন ধর্ম ইত্যাদির বাধ্যবাধকতা সেজন্য!
বিষয়টি নিয়ে নিজের মনেই ভাবে অবনী। কিন্তু সঠিক কোন উত্তর খুঁজে পায় না।
-তোর ভাগ্যটাই খারাপ, বলে আপন জনেরা মন্তব্য করে আফসোচ করে। অবনী তখন উদাস ভাবে উত্তর দেয় -ভাগ্য খারাপ না ভাল সেটা কি চট করে বলা যায়।
যাহোক, শেষ মেস সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এগারো বছরের মাথায় ওদের ফুটফুটে একটা সন্তান জন্ম নিল। সবাই ভীষণ খুশী হল।অবনীর ভাগ্যটা খুবই ভাল, দেরী হলেও ছেলে সন্তান হয়েছে।

ভাগ্য খারাপ না ভাল সেটা কি চট করে বলা যায়।
আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীদের মন্তব্যে তেমনি উদাস ভাবে উত্তর দেয় অবনী।
ছেলেটা বংশের প্রদিপ জ্বালিয়ে রাখবে সেটা ভেবে সবার অনুরোধে ছেলের নাম রাখল প্রদিপ। ছেলের নাম দেয়ার ব্যপারেও অবনী বাড়তি কোন উৎসাহ দেখাল না।
প্রদিপ বড় হতে লাগলো, ওকে ভাল স্কুলে ভর্তি করাল, ভাল শিক্ষক রেখে প্রদিপের লেখাপড়ার প্রতি যত্নবান হল বাবা মা।
পাহাড়ী অঞ্চলে বাড়ী ওদের, দেশের নাম করা পর্যাটন কেন্দ্র, দর্শনীয় অনেকগুলো এলাকা আছে, যেখানে বিশেষ করে শীতের সময় দেশী বিদেশী পর্যটকদের ভিড় থাকে। প্রদিপ ছোট কাল থেকেই পাহাড় আর জঙ্গলের প্রতি বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট। সময় পেলেই ও পাহাড় জংগলে চলে যায়। এ অঞ্চলের অধিকাংশ ছেলেরাই পাহাড় জংগলে যায়, শিকার করে, আনন্দ করে, বিভিন্ন পর্যটকদের সাথেও মেলামেশা করে থাকে। প্রদীপ সে ভাবেই বেড়ে উঠতে লাগলো।
সেবার পাহাড়ে উঠতে যেয়ে প্রদিপ পা ফসকে পড়ে ওর ডান পায়ের গোড়ালি মচকে গেল। অবনী ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে পায়ে শক্ত ব্যন্ডেজ করিয়ে আনল। এক মাসের জন্য ওর চলাচলের উপর ডাক্তার কড়া নিষেধাজ্ঞা জারী করল।
-প্রদিপের কপালটাই খারাপ। সবাই আফসোস করে মন্তব্য করল।
-ভাগ্য খারাপ না ভাল সেটা কি চট করে বলা যায়। অবনী অভ্যাসগত কন্ঠে উদাস ভাবে উত্তর দিল।
দিন পনেরো পর এই অসময়ে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি হল। শীতের শুরু এ সময়ে পাহাড়ে টুরিস্ট ভরা থাকে, সকলের জন্য এ এক বিভ্রাট। পাহাড় ধ্বসে বেশ কিছু টুরিস্ট সহ এলাকার মানুষ আহত নিহত হল। প্রদিপের এক নিকট বন্ধু প্রাণ হারাল।
-প্রদিপের ভাগ্যটা খুব ভাল। আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীরা মন্তব্য করল।ভাগ্য খারাপ না ভাল সেটা কি চট করে বলা যায়। অবনী পুনরায় চিরাচরিত ভাবে স্বভাবজাত উত্তর দিল।
ভেঙ্গে চুরে যাওয়া রাস্তা ঘাট আর টুরিস্ট রিসোর্ট গুলো আবার ঠিক ঠাক করে টুরিস্টদের আনাগোনা শুরু হল। প্রদিপও সুস্থ হয়ে উঠে আবার পাহাড় জংগলে যাতায়াত শুরু করল।
এ ঘটনার কয়েক বছর পর প্রদিপ টুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করার জন্য একটা কোম্পানির সাথে চুক্তি করে কাজে যোগ দেয়ার আগে বাবাকে জানালো।
অরপা ছেলের এ ধরনের চাকরীর বিরোধিতা করল। টুরিস্টদেরকে নিয়ে বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় যাতায়াত, তারপর সময় অসময়ে ডিউটি আর বিশেষ করে কয়েক বছর আগের দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে ছেলেকে চাকুরীতে যোগদান করা থেকে বিরত করার জন্য আমার কাছে পিড়াপিড়ি করতে লাগলো।
-তুমি কি প্রদিপকে বিষয়টি বলেছ?
শান্ত ও নিরুত্তাপ কন্ঠে অরপাকে জিগ্যেস করলাম।
-প্রদিপ আমার কথা না শোনার ফলেই তো তোমাকে বলছি।
কি বলব ভাবছিলাম।
-ছেলের মনটা কেমন যেন উড়ু উড়ু আজকাল। আমার মনে হয় একটা ভাল মেয়ে দেখে প্রদিপকে বিয়ে দিয়ে দিই।
অরপা জানে বৈষয়িক কোন বিষয়েই আমার আগ্রহ কম। যেটা যেমন ঘটছে সেটাকে আমি তেমনি ভাবে মেনে নিই।
-দেখ যেটা ভাল মনে কর। ছেলে বড় হয়েছে ওর মতামতটা জেনে নেয়া দরকার।
আমার কথা অরপার কানে গেল কিনা ঠিক বুঝলাম না।
ছেলের ব্যপারে অরপা চিরকাল অধিকারের একটা প্রচ্ছন্ন জোর দেখায়। ও বিশ্বাস করে ছেলে তার কথা সব সময়ই মেনে নেবে।
কিন্তু এবার সেরকমটি হল না। বিয়ের প্রস্তাবে প্রদিপ পরিস্কার না বলে দিয়ে বিষয়টি একান্তই ওর নিজের এবং এ ব্যপারে ও নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে বলে সাফ জানিয়ে দিল।
ছেলের এধরনের ব্যবহারে অরপা খুব আহত হল। ইতিপূর্বে আমি যখনি প্রদিপের কোন বিষয়ে একটু শাসন করা দরকার বলে অরপাকে বলেছি তখন ও বরং ছেলেকে কিছু না বলার জন্য আমাকে সাবধান করেছে। সেই অরপা ছেলেকে আর কোনদিন কিছু বলবে না বলে আমার কাছে ওর অভিমানের কথা জানালো।
কথা বলার সময় অরপার চোখ দুটো অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠলো।
কেন জানি আমি ওকে কোন শান্তনা দিলাম না। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আমরা এক সাথে, এ যাবত ওকে এত আহত হতে কখনো দেখিনি।
প্রদিপ জন্ম গ্রহনের পূর্বে কত হালকা ভাবে আমাদের দিন গুলো কাটতো। প্রদিপের জন্মের পর ওকে মানুষ করতে যেয়ে আমাদের জীবন চলার রুটিনটাই পরিবর্তন করে ওর সাথে মিলাতে হয়েছে। কত নির্ঘুম আর দুশ্চিন্তাই ভরা রাত কেটেছে প্রদিপের ছোট খাট অসুখ বিসুখ হলে। ওকে ঘিরেই আমাদের সব কিছু আবর্তিত হয়। ওকে দেখেই বোঝা যেত আমরা কেমন আছি।
বলতে গেলে প্রদিপ আজকাল পুরোপুরি স্বাধীনচেতা হয়ে উঠেছে। বেশ সকালে বেরিয়ে যায় আবার নিজের সময় মত বাড়ী ফেরে। বাড়ীতে খায় না বললেই চলে। কেবল ঘুমাতে আসে। তাতে কার কি আসে যায় সেটা ওর চিন্তার কোন বিষয় না।
ছেলের খাওয়া দাওয়ার খোজ খবর নেয়ার বিষয়ে আমি চির কাল একটু লাজুক, ওকাজটা অরপাই করেছে এতকাল। কিন্তু আজকাল অভিমান করে অরপা আর ছেলেকে তেমন ভাবে কিছু জিগ্যেস করে না। সময় মত খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখে, কিন্তু অধিকাংশ দিন খাবারগুলো ও ভাবেই থাকে।
বেশ কিছু দিন পর একদিন বেশ রাতে প্রদিপ বাসায় ফিরে টেবিলে রাখা খাবার না খেয়ে ঘুমানোর জন্য নিজ রুমে প্রবেশ করতে দেখে আমি খুব অনভ্যস্ত ভাবে জিগ্যেস করলাম-বাবা, তুমি খাবে না।
প্রদিপ যে অবাক হল সেটা ওর অঙ্গ ভঙ্গিমায় পরিষ্কার বোঝা গেল। ও থমকে দাঁড়িয়ে আমার দিকে দেখল একটু, তারপর নিচু স্বরে –বাইরে খেয়ে এসেছি, বলে নিজ রুমে ঢুকে গেল।
এ প্রদিপকে আমার কাছে কিছুটা অচেনা লাগলো।

-বাবা আমি বিয়ে করেছি। কয়েক মাস পর এক রাতে প্রদিপ বাসাই ঢুকে ওর রুমে যাওয়ার আগে কথাটা বলল কিছুটা গোমড়া মুখি হয়ে।
অরপা আর আমি সোফাই বসে। কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। আর প্রদিপ আমাদের কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজ রুমে ঢুকে দরজা বন্দ করল।
আমরা বসেই রইলাম সেভাবেই মূর্তির মত। এমন কি কেউ কারো দিকে দেখলাম না তাকিয়ে। এ ঘটনার পর বাসার তিনটি প্রাণী সবাই যে যার মত একা হয়ে গেলাম।
-অত চিন্তা করো না, এটা কি ভাল না খারাপ সেটা কি চট করে বলা যায়। বেশ কয়েকদিন এভাবে চলার পর একদিন সন্ধ্যাই পাশাপাশি বসে অনেক সাহস করে অরপাকে কথাটা বললাম।

মুল্যবান কোন কিছু কারো জীবনে যদি না থাকে তবে তার জন্য অভাববোধ করা কিছুটা সৌখিনতা বই কি, কারন সে বোধটা স্বপ্রনোদিত বা স্বউদ্যোগে ঘটে বলা যায়। প্রকৃতই কোন কিছু না থাকলে হারানোর কোন প্রশ্নই থাকে না। কিন্তু কোন কিছু থাকলে এবং সেটা যদি খুব দামি বা প্রিয় হয় তাহলে হারানোর যেমন ভয় থাকে আর তেমনি সেটি হারিয়ে গেলে কষ্টটাও খুব বেশী হয়। না থাকার বেদনাটা হারানোর বেদনার কাছে কিছুই না।

-বাবা আমি যে মেয়েটিকে বিয়ে করেছি ও বিদেশী। সে এখানে একটা কোম্পানিতে তিন বছরের চুক্তিতে চাকরী করছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে দেশে ফিরে যাবে।
সন্ধ্যা রাতে সোফাই বসে টিভি দেখছিলাম। খোকা কখন ঢুকেছে খেয়াল করিনি। ওর কণ্ঠস্বরে আমি তাকালাম পাশে দাড়ান প্রদিপের দিকে। অবাকই হলাম ওর কথা শুনে।
-ভাবছি কি বলছে এ সব খোকা!
খোকার উপর ওর মায়ের অধিকার বোধটা একটু বেশী, তাই আড় চোখে আশে পাশে দেখে নিলাম খোকার কথাটা অরপা শুনে ফেললো কিনা। দেখলাম না অরপাকে, বোধহয় রুমের ভিতর কোন কিছু করছে। একটু আশ্বস্ত হলাম।
-চুক্তির মেয়াদ আরো এক বছর আছে।
প্রদিপ থামল একটু, কি যেন একটা ভেবে নিচ্ছিল।
ভাবছি ছেলে বিয়ে তো করেই ফেলেছে। প্রদিপ এখন বড় হয়েছে, কিন্তু এত বড় হয়েছে যে কাউকে কিছু না বলে একাকী বিয়েটা করে ফেলল!
ভাবছি, ওর স্ত্রীর চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তারপর কি হবে!ও আমাকে স্পন্সর করবে আর এ সময়ের মধ্যেই আমার কাগজ পত্র সব ঠিক হয়ে যাবে, তারপর ওর সাথে আমি ওদেশে চলে যাব।
খোকা নির্দ্বিধাই কথাগুলো বলে আর দাড়াল না ওর রুমে ঢুকে দরজা বন্দ করে দিল।
-খোকা দেশ ছেড়ে, আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। কথাটা ভাবতেই একটা অচেনা ধাক্কা খেলাম। চিরকাল স্বাভাবিকতায় বিশ্বাসী আমি। সব কিছু মেনে নেয়ার মধ্যে আমি শান্তি খুজি। কিন্তু এখন আমার এমন হচ্ছে কেন। খোকা বড় হয়েছে, ও এখন আলাদা করে ভাবতে শিখেছে, ও ওর পছন্দের একটা মেয়েকে বিয়ে করে তার সাথে একটা উন্নত দেশে বসবাস করতে যাচ্ছে। সত্যিকার অর্থে এমন ভাগ্য ক’জনের হয়।
বসে বসে এসব কথা ভাবচিলাম। শরীরের জোর যেন হারিয়ে ফেললাম। উঠতে একদমই ইচ্ছে হচ্ছিল না।
কতক্ষন এভাবে বসে ভাবছিলাম ঠিক জানি না। ওর ঘরে খোকা এতক্ষন সুখ স্বপ্নে ডুব দিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে। যা ঘটছে তার সবকিছু খোকার জন্য ভাল হবে, এ সব ইতিবাচক চিন্তা করে নিজেকে শান্তনা দিয়ে নিজেকে সক্ষম করার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম অরপাকে তো বিষয়টা আমাকেই জানাতে হবে।

একটা ক্ষীণ কান্নার স্বর কানে আসতে লাগলো। প্রথমে ঠিক আন্দাজ করতে পারলাম না, কোথা থেকে শব্দটা আসছে আর কেই বা কাঁদছে!
অরপা নাত! কথাটা মনে হতেই বুকটা কেপে উঠলো। দেখলাম অরপার রুমের দরজাটা আধা ভেজানো।
ওকি ছেলের কথা সব শুনে ফেলেছে!

Category: Short Story

Write a comment