অচেনা জায়গা, হাটতে হাটতে চার রাস্তার মোড়ে এসে থমকে দাড়ালাম। যদিও আমার নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই তবুও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম।
মানুষের জীবনটা এরকমই, যখনি বেছে নেয়ার জন্য একাধিক পছন্দের বিষয় থাকে তখনি মনে দ্বিধার জন্ম নেয়, চাহিদা বেড়ে যায়। চৌরাস্তার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রাস্তা ঠিক করার ভাবনাই মনোনিবেশ করলাম।
রাস্তা চারটির গাঁ ঘেঁসে কিছুটা দূরে দূরে দাঁড়িয়ে একটি করে ছনের ঘর। কোন রাস্তাটা নেব? ভাবলাম প্রথমে দেখি কি আছে ঘর গুলোতে।
প্রথম ঘরটা বেশ প্রশস্ত, একপাশে রান্না বান্না করে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে, সাথে প্রস্তুতকৃত নানা শুখনো খাবারও বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ বসে খাচ্ছে আবার কেউ কেউ প্যকেটে সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। ঘরটার অন্য পাশে জামা জুতা ইত্যাদি পরিধেয় দ্রব্যাদির সম্ভার। অন্ন বস্ত্রের বিষয়, ভীষণ ব্যস্ততা, কার আগে কে নেবে তার যেন একটা নীরব প্রতিযোগিতা। সবার প্রয়োজন মিটাতে দোকানীও হিমসিম খাচ্ছে।
দ্বিতীয় রাস্তার ঘরটাতে প্রবেশ করলাম। সেখানে চাল ডাল মসলা আর তরিতরকারি সহ বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্যাদি, থান কাপড়, সুই সুতা, বোতাম ইত্যাদি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিক্রি হচ্ছে। প্রথম দোকানের মত ব্যস্ততা এখানেও বিরাজমান।
তৃতীয় রাস্তার দোকানটাতে প্রবেশ করলাম। সেখানে একপাশে কাঠ, তার, লোহা, পেরেক জাতীয় জিনিসপত্র আর অন্য পাশে পুরনো গাছ থেকে কেটে আনা নানা ধরনের পরগাছা আর জংগল থেকে সংগৃহীত অর্কিড ফুল সাজানো। রংবেরঙের খাঁচা ঝুলানো তার ভিতর নানা রঙের পাখী আটকানো। বন্দি পাখিগুলো কোনটা বা খেতে ব্যস্ত, কোনটা ডাকছে, পাখা ঝাপটাচ্ছে আবার কোনটা উদাস নয়নে খাচার বাইরে তাকিয়ে আছে। ব্যস্ততা আছে কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় দোকানের মত অতটা না।
তিনটি রাস্তাতেই মানুষের নিত্য যাতায়াতের পদচিহ্নের ছাপ সুস্পষ্ট।
কিন্তু চতুর্থ রাস্তাটা একেবারে ভিন্ন, অন্য রাস্তাগুলোর মত না। মানুষের পদচিহ্নের কোন ছাপই স্পষ্ট নয়। চলাচলের অভাবে রাস্তাটা জংলা হয়ে আছে।
এ রাস্তার ঘরটি শান্ত, ব্যস্ততা নেই। একটি ছায়া ঘেরা শাখা প্রশাখা ছড়ানো পুরনো বটবৃক্ষের নিচে বলে অন্যান্য ঘরগুলোর তুলনায় শীতল। এই কাঠ ফাটা দুপুরে ক্লান্তু দেহে বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত জায়গা। অন্যান্য ঘরের মত বেড়ার বেষ্টনী নেই, আয়তকার ঘরটির চার পাশ খোলা, ভিতরটা ফাকা, কেবল ইতস্তত ভাবে কয়েকটি কাঠের বেঞ্চ পাতা। সবগুলি খালি কেবল এক কোনাই একটি বেঞ্চের একপাশে বসে সাদা চুল দাড়ি ভর্তি একজন শতবর্ষী কৃশাঙ্গ মানুষ, চোখ দুটো বন্ধ, আত্মনিমগ্ন হয়ে একতারা বাজাচ্ছে। যেন সাক্ষাৎ সিদ্ধপুরুষ!
কিন্তু এ বাদক অন্য কোন বাদকের মত নয়। বাদক তার শ্রোতাদের বাজনা শুনিয়ে তৃপ্তি পায় আর শ্রোতারাও করতালি দিয়ে বাদককে অভিনন্দন জানায়। কিন্তু ওসবের কিছুই এখানে হচ্ছে না। একতারা থেকে নিঃসৃত সুর এতই ক্ষীণ যে মনে হচ্ছে বাদক যেন কেবল নিজের জন্য বাজাচ্ছে। শ্রোতা যেন তার নিজের শরীরের মধ্যে বসে শুনছে সে সুর।
বট গাছের শাখা থেকে দু একটি পাখী নেমে এসে বসছে বেঞ্চে বা মাটিতে, তাকাছে আত্মনিমগ্ন বাদকের দিকে তারপর আবার উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে উপরে। মৃদু মন্দ বাতাস কিছু বট ফল পাতা ঠেলে ঠেলে দিচ্ছে ঘরটার ভিতর।
জায়গাটা আমাকে দারুন ভাবে আকর্ষণ করলো।
একটু ঘন হয়ে বসলাম বাদকের পাশে যাতে বাজনার ক্ষীণ সুরটা শোনা যায়।
বাদক আমার উপস্থিতি টের পেল বলে মনে হল না।
একতারার সে সুর এত ক্ষীণ যে সে তরঙ্গ কানের পর্দাই কোন রকম অনুভূতির সৃষ্টি করল না। সে সুর যেন কান দিয়ে শোনার জন্য নয়, বরং হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার জন্য। আর তার জন্য পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সব কটিই বন্ধ করে নিতে হয়।
আমি ইন্দ্রিয়ের সব কটি জানালা বন্ধ করে হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়ে সে সুর উপলব্ধি করতে করতে হারিয়ে গেলাম। একটি তারের সরল যন্ত্র থেকে যে এত রকম সুরের অবতারণা করা যায় সেটা আমার প্রকৃতই অজানা ছিল।
একতারার ক্ষীণ সুরের সাথে প্রকৃতির রূপ রস যেমন, পাখীর কিচির মিচির, গাছের শাখা আর পাতায় বাতাসের সু সা শব্দ, চালা ঘরের ছন আর বাশের ফুটোর সাথে বাতাসের ধাক্কায় সৃষ্ট সুর, সব মিলে মিশে এক বিচিত্র সুরমূর্ছনার সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতি এখানে সরব আর একে অপরের পূর্ণ সমার্থক ও সহায়ক। সব গুলো শব্দ যখন ঐকতানে এক হয়ে নৈসর্গিক সুরের সৃষ্টি করছে তখন বিভিন্ন সুর সৃষ্টিকারী সত্ত্বাগুলোকে একটা থেকে অন্যটার কোন পার্থক্য করা যাচ্ছে না। ঐ পর্যায়ে বাদক আর প্রকৃতি অভিন্ন এক সত্ত্বাই পরিণত হয়েছে।
কিছুক্ষন এভাবে থাকার পর উপলব্ধি করলাম যে আমার বুকের ভিতিরেও ওই একই সুর বাজছে। এ সুর চিরন্তন।

সারাক্ষণ বুকের মাঝে বসি, ধুকধুকিয়ে বলেছ দিবা নিশি
ফিরে চল মানিক আমার।
এপারে যা কিছু, ধাবিছ পিছু পিছু, সব মিছে সোনা মধু মরিচিকা শুধু
আবাস যে ওপারে তোমার।

কে যেন আনমনে, বলে কানে কানে
শোণ! অমৃতের খোঁজ পাবে না এ জীবনে।
সে স্বাদ যে কেবল মরণের মাঝে, স্বর্গের জিনিস মর্তে কি সাজে!
মর্তে বসে আমি, হায় অন্তরযামী! স্বর্গের জিনিস খুজেছি এ ভূবনে!

-কিরে এত অলসতা করলে চলবে। ওঠ, বেলা যে গড়িয়ে গেল।
কতক্ষন নিমগ্ন ছিলাম বলতে পারবো না। এক মায়াবী কণ্ঠস্বরে আমি চোখ মেলে তাকালাম। সামনে সাধু লোকটি বসে ঠিক তেমনি ভাবে।
তিনি একতারাটা পাশে নামিয়ে রাখলেন।
-নিরেট পাথর খণ্ড নিজের সব জড়তা কাটিয়ে মোহভঙ্গ হয়ে নিজের দেহে আলো প্রবেশ করতে দেয়ার ফলেই তো সেটা স্ফটিকে রূপান্তরিত হয়ে অত মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। দেহের চাহিদাকে নিয়ত্রন করতে হবে, মনের দুরন্তপনায় লাগাম লাগাতে হবে। পার্থিব সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, এই ক্ষণস্থায়ী সামগ্রীর মালিকানা লাভের উন্মত্ততা পরিহার করতে হবে, না হলে জীবনটা যে কেবল হারাবার ভয়ের মধ্যেই কাটবে।
-মানুষ দূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বস্তু জগতের সব কিছু কুক্ষিগত করতে চাই। সে চাওয়ার যেন কোন শেষ নেই। সেগুলো অর্জনে যেমন বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হয় তেমনি সেগুলো রক্ষার্থে অনেক নিপুণ কৌশল উদ্ভাবন করার প্রয়োজন হয়। এ ভাবেই জীবন অতৃপ্ততা আর ভয়ে ভয়ে কেটে যায়।
আমি নিস্পলক নেত্রে সাধুর দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনতে লাগলাম।
-মানুষ ছাড়াও অন্যান্য কিছু প্রাণী ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে। তার মধ্যে আমাদের সবার পরিচিত ইঁদুরকে যদি লক্ষ্য কর তবে দেখবে তারা কৃষকের কষ্টার্জিত পাকা ধানের ক্ষেত থেকে ধানের শীষ কেটে কেটে ক্ষেতের মধ্যে গভীর গর্ত করে সেখানে লুকিয়ে রাখে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। ধান কাটার পর কৃষক যখন ইঁদুরের গর্তের মুখটা দেখতে পায় তখন সেটি খুড়ে ধানের শীষ গুলো বের করে নেয় এবং সব থেকে দুঃখের বিষয় অনেক ক্ষেত্রেই ইঁদুরটারও জীবনে মারা পড়ে। চুরী করে সঞ্চিত সম্পদের জন্যই এই অকাল মৃত্যু!
-বস্তুবাদী দুনিয়ার সব ক্ষেত্রেই এটাই নিশ্চিত পরিণতি। সবই দুঃখ দিয়ে শেষ হয়ে যায়।
কথাটা বলে সাধু ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস টানলেন।
-দেহ আছে তাই এর চাহিদাও থাকবে, এটাই চিরন্তন, এটাই বাস্তব। কিন্তু দেহ শুধু ভোগ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে এটার ভিতর দিয়ে আলো প্রবেশ করবে কি ভাবে? দেহকে ভোগী থেকে ত্যাগীতে পরিনত করতে হবে।
-ভোগের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী কিন্তু ত্যাগের তৃপ্তি চিরস্থায়ী। ত্যাগের তৃপ্তি যে একবার পেয়েছে সে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করেছে। মন দেহকে নিয়ন্ত্রন করে তাই মানুষের মন কেবল দেহেরই চাহিদার কথা শুনতে পায়। দেহের ভিতর যে আত্মার বাস সেও প্রতিনিয়তই কথা বলছে, তার কথাও শুনতে হবে। তার জন্য মানুষকে বস্তুবাদী জগতের নিরঙ্কুশ আধিপত্য কমাতে হবে।
-বয়েস বাড়লে মানুষের ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা ও চাহিদা দুটোই যখন কমতে থাকে, তখন ত্যাগের আনন্দ ধীরে ধীরে তার মধ্যে প্রকাশ পেতে থাকে। জীবন যৌবন থাকতে থাকতে যখন এই চিরন্তন সত্যটাকে কেউ উপলব্ধি করতে পারে, বস্তুবাদী দুনিয়ার অসারতা যখন কেউ অনুধাবন করতে পারে তখন সে আলোকিত হয় আর পার্থিব সবকিছু হাসি মুখে ছেড়ে যেতে দ্বিধা বোধ করে না।
-বস্তুবাদী দুনিয়ার টানে আচ্ছন্ন থাকা অবস্থাই মৃত্যু যখন কাউকে শরীর থেকে আলাদা করতে চায় তখন পৃথিবীর মায়া তাকে খুব কষ্ট দেয়। মৃত্যুর মুহূর্তে সকল প্রাণ অনুধাবন করতে পারে যে, পার্থিব কোন কিছুরই স্থায়িত্ব নেই, তখন তার ভিতর আলো ঠিকই প্রবেশ করে কিন্তু সে আলো পৃথিবীর কারো কোন কাজে আসে না।
আমি তন্ময় হয়ে সাধুর দেকে তাকিয়ে।

-তোমার বোধহয় কিছু খাওয়া হয়নি। দোকান বন্দ হওয়ার আগে যাও কিছু মুখে দিয়ে একটু বিশ্রাম করে নাও। না হলে সময়ের আগেই যে শরীর অচল হয়ে বোঝার মত হবে। এমনিতেই শরীর বোঝা বই অন্য কিছু না। তবে যতক্ষণ নিজের বোঝা নিজে বহন করতে পারবে, ততোক্ষণ কোন সমস্যা নেই। কিন্তু নিজের শরীরের বোঝা বইতে যদি অন্য কারো সাহায্য লাগে তবে সেটা অসহনীয় যন্ত্রণাদায়ক। যাও দেখ দোকানটা বন্দ হয়ে গেল কিনা।
-চিন্তা করোনা, ঘরটার মত এ রাস্তাটাও যাওয়ার জন্য সব সময় খোলা থাকে।

আমি ধীরে ধীরে উঠে দাড়ালাম। একটু অন্যমনস্ক ভাবে সেদিকে পা বাড়ালাম।
ততোক্ষণে কালো আঁধার আর নির্জনতা চারধার ধীরে ধীরে গিলে ফেলতে শুরু করেছে। ক্রেতারা সবাই যে যার ঘরে ফিরে গিয়েছে আর দোকানীও সব গুটিয়ে নেয়ার প্রয়াসে অর্জিত মুনাফার হিসেব করতে ব্যস্ত।

Category: Meaning of Life

Write a comment