সন্মুখে দিগন্ত বিস্তৃত প্রশস্ত খোলা প্রান্তর -বিশাল জলাভূমি। যতদূর চোখ যায় সবুজ ধান ক্ষেত, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নলখাগড়ার ঝোপ আর স্বচ্ছ জল, যার উপর সাদা সাদা বক ডানা মেলে উড়ে উড়ে বসছে। খোলা প্রান্তরের যেন কোন শেষ নেই, যেন প্রকৃতই অসীমতার অংশ। অসীমতাকে প্রদর্শন করে এমন যে কোন কিছুই মানুষকে আকর্ষণ করে ক্ষনেকের জন্য হলেও মনকে উদাস করে। মানুষ অসীমতার সৃষ্টি বলে তাঁর সাথে অন্তরাত্মা একাত্মতার সাধ পায়।

বিশাল এই খোলা প্রান্তরের উত্তর ধার বরাবর পূর্ব পশ্চিম একটা উঁচু রাস্তা অনেকটা বাঁধের মত। এই রাস্তাটাই সন্মুখে নিচু জলাভুমি থেকে উত্তরে মানুষের বসতি গুলোকে আলাদা করেছে। এই বাঁধের সাথেই দক্ষিণে জলাভুমির বেশ কিছু অংশ নিয়ে উঁচু পাড় বাধা বিশাল একটা দিঘীর সান বাধানো ঘাটের উপর বসে এক পথিক দিগন্তের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে, যেখানে আকাশ মাটির উপর ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আজকাল সচারচর দিগন্ত দেখা যায় না। বিশেষ করে শহরে আকাশ ছোয়া সব অট্টালিকার ঈট পাথরের জংগলে দিগন্ত দেখা যাওয়া তো দূরে থাক সূর্যটাকেও কেবল ফাঁক ফোঁকর দিয়ে দেখতে হয়। ঘন বসতির কারণে আজকাল গ্রামেও বাসা বাড়ীর ফাঁকে ফাঁকে খোলা মাঠগুলোও তেমন প্রশস্ত নয় তাই সেখানেও দিগন্তের দেখা মেলা ভার।
অন্তরটা হাফিয়ে ওঠে। তাই ক্লান্ত পথিক এখানে এসেছে দিগন্তের টানে।
চার দিক কেবল নির্জনতা।
দীঘির উল্টোদিকে বাঁধের থেকে একশো গজের মত উত্তরে প্রকান্ড এক পুরনো জমিদার বাড়ী কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।

ব্যস্ততায় ভরা পৃথিবীতে সবাই জীবনটা কাটিয়ে দেয় কাজ আর দায়িত্বের মাঝে ডুবে থেকে। জীবিকার জন্য উপযোগী বস্তগত সবকিছু পেতে ছুটে চলে মরীচিকার পিছনে।
সামনে এগোনো আর অন্যকে টপকে যাওয়ার মধ্যে জীবনের অর্থ খোঁজে সবাই। কিন্তু শত সহস্র পথ ঘুরে জীবনের নিম্নগামী ঢালুতে এসে মানুষ যখন বোঝে যে, সামনের যেন কোন শেষ নেই, আর অপরকে টপকানোরও কোন অন্ত নেই। তখন জীবনের অর্থের খোঁজে এত দিনকার আঁকা ছবিটা এলোমেলো হয়ে যায়।

-চা নিন।
আমার গম্ভীর কণ্ঠস্বর উদাস পথিকের নিমজ্জিত চিন্তা ধারাই পরিষ্কার ছেদ ফেললো।
ভারি শরীরে মাথা ভর্তি সাদা চুলে আমার মত বয়সের ভারে শরীরটা নিয়ে কিছুটা নুজ্য হয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বৃদ্ধকে দেখে সে অবাক হয় একটু। হাতে একটা ট্রে তার উপর একটা কেটলিতে চা আর দুটো কাপ।
ট্রেটা ঘাটের বেঞ্ছের উপর নামিয়ে পথিকের অন্য পাশে বসলাম।
-বেশ সময় ধরে বসে আছেন, তাই ভাবলাম নিশ্চয় চায়ের তেষ্টা পেয়েছে। অবশ্য এসময়ে আমি এখানে বসেই চা পান করি। রাস্তার ওপারে যে বাড়ীটা দেখছেন ওটা এখন আমার বলতে পারেন, আমার পরদাদার সময়ে তৈরী।
সৌজন্যতাবসত উঠে দাঁড়িয়ে পথিক তাকিয়ে রইল আমার দিকে। উচ্চতা ছ’ফুটের কিছুটা নিচে প্রায় আমার কাছাকাছি হবে, তবে বয়েসটা আমার থেকে ঢের কম, ফর্সা রং তৃপ্তির একটা হাসি লেগে আছে তার চোখে মুখে।

দীঘির ওপারটাতে পানির কিনারে যেখানে লম্বা লম্বা ঘাস মাজা অব্দি ডুবিয়ে মাথা খাড়া করে দাড়িয়ে আছে সেখানেই পা ডুবিয়ে একটা সাদা দাড় বক স্থির দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে।
সেদিকে পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম –দেখছেন বকটা মনে হচ্ছে ধ্যানে বসেছে। হ্যে, ধ্যানে ঠিকই বসেছে তবে সে ধ্যান আত্মউপলব্ধির জন্য নয়, ওর নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। আমাদের সমাজে এ ধরনের লোক দেখানো বক ধার্মিকেরা সমাজকে ছেয়ে ফেলেছে।
মৃদু হেসে কথা বলতে বলতে ইশারায় পথিককে বসতে বলে কাপ দুটো পূর্ণ করলাম। দু’জনেই কাপে চুমুক দিলাম।

-এখানে বসে যেমন আকাশ আর মাটির শেষ আর শুরুর পুরোটা দেখা যাই তেমনি জীবনের শত পথ ঘুরে আমি এখন যেখানে দাঁড়িয়েছি সেখান থেকে একটা জীবনের শুরু থেকে শেষ অব্দি দেখতে পাই। তাইতো তরুনদের কোন বিষয়ে অতি উৎসাহ আদিখ্যেতা বলে মনে হয়। ওসব দেখে মনে মনে হাসি। ভাবি আমি জানি সব রঙ্গিন স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফ্যাঁকাসে হয়ে একদিন সবকিছুই দুঃখ দিয়ে শেষ হয়ে যাবে।
-নেয়ার আনন্দটা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু দেয়ারটা চিরস্থায়ী। পথিক তাকিয়ে আমার চোখে।
-দিগন্তে লক্ষ্য করুন, সাদা বক গুলো যেমন বস্তুগত পৃথিবীর সব আকর্ষণকে ঠেলে ফেলে কেমন হালকা হয়ে বাতাসের উপর ভর করে আকাশে উড়ছে, অন্যদিকে জলাভূমির জল সূর্য কিরণ যা বিধাতার দান সেটি পুরোপুরি শুষে না নিয়ে নিজের নুন্যতম প্রয়োজন মিটিয়ে বাকি সবটা ফিরিয়ে দিচ্ছে। এ দুটি অপূর্ব সৃষ্টি তাদের পার্থিব সব কিছু প্রত্যাখ্যান করার কার্যকলাপের প্রদর্শনী করে এক নৈসর্গীক পরিবেশের অবতারনা করেছে। এখানে যেন বস্তুগত যা কিছু তা ভোগ না করে বরং দান করার এক মহড়া চলছে।

বকগুলোর শ্বেত শুভ্র ডানাই সূর্যালোক প্রতিফলিত হওয়ার ফলে ওদেরকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। অন্য দিকে মৃদু ঢেউখেলা জলের উপর সূর্য কিরণ প্রতিফলিত হয়ে স্ফটিকের মত জ্বলজ্বল করছে। বস্তুবাদিতা থেকে বের হয়ে দানের আলোই মহিমান্বিত হওয়াই ও দুটো সৃষ্টি এত দৃষ্টি নন্দন হয়ে উঠেছে। দান আর ত্যাগের মহিমা সব কিছুকে উজ্জ্বল করে দেহকে জ্যোতিতে ভরপুর করে দেয়।
পৃথিবীতে পায়ে হাটা বা বুকে চলা প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র পাখিই মাধ্যাকর্ষণের টানকে অস্বীকার করে একদম হালকা হয়ে আকাশে উড়তে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে স্ফটিকের জন্ম নিরেট শক্ত পাথর থেকে। দীর্ঘ দিন বিভিন্ন পরিস্থিতির মোকাবেলায় ওই ঘনতম আলোক দুর্ভেদ্য বস্তুটি রুপান্তরের মাধ্যমে তার আনবিক গঠনের পরিবর্তন ঘটিয়ে এর ভিতর দিয়ে আলোর প্রবেশ ঘটিয়ে স্ফটিকে পরিণত হয়েছে।
এ দুটি স্বর্গীয় ঘটমান বিষয় এখান থেকে প্রত্যক্ষ করে আমরা দুজনই পুরোপুরি নিমগ্ন।

-বাবা তোমার জন্য কিছু খই আর খেজুর গুড়ের পাটালি আনলাম। জানি এসময় তুমি এখানেই থাকবে। রতন জ্যাঠার ডাকে আমাদের নিমগ্নতা ভাঙল।
কৃষ্ণকায় শীর্ণ লম্বা শরীরের গায়ে পুরনো গেঞ্জি আর পরনে ধুতি, রতন জ্যাঠা স্মিত হাসি মুখে দাঁড়িয়ে। মূর্তিমান হাড়ের কাঠামো, প্রয়োজনের চেয়ে একটুও বেশী মাংস চর্বি ওর দেহে নেই। কি হালকা, যেন এক ফুঁৎকারে উড়ে যাওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত।

দেশ বিদেশে জীবন কাটিয়ে বছর পাচেক হল আমি শেকড়ের কাছে ফিরে এসেছি। জীবনের সব উপার্জনকে পিছনে ছেড়ে চলে আসার দিনটি অন্য কোন দিনের মত ছিল না। সেদিন ভোর রাতে ছেলে আর বৌমাকে স্থায়ীভাবে বিদেশে পাড়ি দেয়ার জন্য এয়ারপোর্টে বিদায় জানিয়ে ওইদিনই ঈট পাথরের জংগল থেকে নিজেকে মুক্ত করে প্রকৃতির কাছে ফেরত এসেছি।
এয়ারপোর্ট থেকে সোজা ড্রাইভ করে গ্রামে পৌছাতে পৌছাতে বেলা প্রায় গড়িয়ে গিয়েছিল।

কয়েক শো মাইল ড্রাইভ করার পর মেইন রাস্তা থেকে নেমে কাঁচা রাস্তা ধরে এগুচ্ছি গ্রামের পথে। মনটা হরিষে বিষাদে ভরা। ছেলে বউ বিদেশে চলে গেল, ওখানেই সেটেল হবে। দুজনই ভাল চাকরী করে, ভাল থাকবে ওরা।
কিন্তু একমাত্র ছেলে চলে যাওয়াই অবুঝ মনটা হু হু করছে।
বাড়ীতে পৌছাতে তখনও কয়েক শো গজ পথ বাকি। কাঁচা সরু রাস্তা, সামনে একজন বাইসাইকেলে প্যাডেল মেরে ফিরছে। সরু রাস্তা সাইড দেয়ার মত জায়গা নেই। ড্রাইভারকে হর্ন না বাজিয়ে বাকি পথ টুকু আস্তে আস্তে সাইকেলের পিছনে পিছনে যেতে বললাম।
আমার বাড়ীর সামনে পৌঁছালে গাড়ীটা রাস্তা ছেড়ে উত্তরে মোড় নিয়ে একশো ফুটের মত আমার বাড়ীর রাস্তা ধরতেই লোকটি সাইকেল থেকে নেমে আমাদের গাড়ীকে লক্ষ্য করতে লাগলো।

বাড়ীর সামনে আমি গাড়ী থেকে নামতে না নামতেই লোকটি সাইকেল নিয়ে গাড়ীর পিছনে এসে দাঁড়ালো।
-আমাকে চিনতে পেরেছ, আমি রতন জ্যাঠা।
আমার বাড়ীর কয়েকটা বাড়ী পর রতন জ্যাঠার বাড়ী। কুমোর ওরা, মাটির হাড়ি পাতিল তৈরী করে হাট বাজারে বিক্রি করে। বয়সে আমার থেকে দু এক বছরের বড় হবে।
অনেক দিন পরে দেখা তবুও চিনতে দেরী হল না।
ড্রাইভার গাড়ী থেকে জিনিস পত্র নামিয়ে বাড়ীর ভিতরে নিতে লাগলো, আমি জ্যাঠাকে নিয়ে বৈঠক খানায় বসলাম। কেয়ারটেকার খোদাবক্স আমার আসার কথা জেনে বৈঠক খানাটা খুলে রেখেছে আগে থেকেই।
-বুঝলে বাবা, ছেলে বউকে রাজধানীর বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসলাম। ছেলেটা ম্যাকানিক স্কুল থেকে পাশ করে রাজধানী শহরে একটা অটো গ্যারেজে চাকরী পেয়েছে। তাই বিয়ে দিয়ে বৌমা সহ বাসে উঠিয়ে দিয়ে ফিরলাম। আমি একেবারে একা হয়ে গেলাম, কিন্তু ওদের সুখই তো আমার সুখ নাকি বল বাবা!

রতন জ্যাঠার মুখটা স্মিত হাসিতে ভরা, কিন্তু সে হাসির সরুপটা ঠিক বুঝলাম না।
আমি সংক্ষেপে জানালাম যে, আমি এবার থাকার জন্য গ্রামে ফিরেছি।
-যাক তাহলে তো ভালই হল, গল্প সল্প করে বাকি সময়টুকু কাটিয়ে দেয়া যাবে।
আমি তাকিয়ে রইলাম রতন জ্যাঠার দিকে। ভাবলাম, শত সহস্র পথ ঘুরে জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি আর রতন জ্যাঠা একই সমতলে দাঁড়িয়ে, আমাদের দুজনার সুখ দুঃখ চিন্তা দুশ্চিন্তার পরিমাপ একই।
খই ভর্তি বেতের টুকরিটা রেখে রতন জ্যাঠা আর দাড়ালো না। ভাবলাম প্রতি রাতে একবারতো সে আসে আমার বাড়ীতে তখন না হয় পাত্রটা দিয়ে দেব।

সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু, কি মোহনীয় সে দৃশ্য।
বাকা চাঁদের ফালিটা পশ্চিম দিকে মাঝ আকাশ বরাবর দেখা যাচ্ছে। নতুন চাঁদ, বোধহয় সপ্তাহ খানেক হল উঠেছে। সূর্য ডুবতেই চাঁদের ফালিটা আর তারা গুলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠলো। একসাথে এত তারা এখানে না বসলে দেখা যায় না।
একের প্রস্থান অপরের উত্থান! কি অপরুপ!
সূর্যটা আমাদের দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেল কিন্তু তাই বলে শেষ হয়ে গেল না। অন্য কোন খানে নতুন রুপে আবির্ভূত হবে বলে তার এ প্রস্থান। এ পৃথিবীর কোন কিছুই একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় না, কেবল রুপ পরিবর্তন করে অন্য কোন আকারে আবির্ভূত হবে বলে।
ভাবছি -প্রস্থান না হলে নতুন করে উত্থান হবে কি ভাবে!
চাঁদের আলোই সামনের সবুজ খোলা প্রান্তর আর বিলের জল অনন্য রুপ ধারণ করল। উপরে তারাই ভরা অসীম আকাশ আর বিলের অথৈই জলের মিলন রেখাটা দিগন্তে পরিষ্কার প্রতিভাত। একের শেষ অন্যের শুরু। দিগন্তের শেষ আর শুরুর মায়াবী আবেশ আর অপ্রতিরোধ্য টান যে কাউকেই আচ্ছন্ন করে ফেলে!
-বাবু খাবেন চলুন।
সন্ধ্যে গড়িয়ে রাতটা একটু গাড় হতেই খোদাবক্সের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম।

Category: Meaning of Life

Write a comment