দীর্ঘ সময় ধরে সুনামের সাথে চাকরী শেষে অমর চৌধুরী যেদিন আনুষ্ঠানিক বিদায় শেষ করে শেষ বারের মত সরকারী গাড়ীতে করে বাড়ী ফিরবেন বলে অফিসের সামনে গাড়ী বারান্দায় দাঁড়ালেন, সেদিনই নিরেট বাস্তবতাটা একেবারে সামনে এসে তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো।
অমর চৌধুরী এক সময়ের ডাকসাইটে অতি বড় সরকারী কর্মকর্তা, সহকর্মী আর অধস্তন সবাই তার প্রশংসাই সব সময় পঞ্চমুখ থাকতো। তারা কখনই তার কোন কর্মকাণ্ডে খুঁত খুজে পেত না। তিনি কোন আইডিয়া দিলে সকলে এ ভাবে আফসোস করতো যে, আইডিয়াটা এর আগে কেন পাওয়া গেল না।
এভাবে চলতে চলতে নিজের উপর বিশ্বাসটা সত্যি সত্যি মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল অমর চৌধুরীর।
অফিসের দীর্ঘ দিনের কলিগরা দল বেধে ফুলের মালা হাতে গাড়ী বারান্দার সিড়ির উপর জড়ো হল। যদিও ইতিমধ্যে অসংখ্য ছবি তোলা হয়েছে তবুও সবাই আবদার করলো গাড়ীবারান্দার সিড়িতে বিদায়ী অতিথির দুপাশে দাঁড়িয়ে শেষ মুহূর্তের একটা গ্রুপ ছবি নেবে বলে।
সবাই আছে কিন্তু অমর চৌধুরীর পি এস সেখানে নেই দেখে সবাই তাকে খোজা খুজি শুরু করল। যিনি চার্জ বুঝে নিলেন তিনিও ছিলেন না, তবে তিনি যে একটা জরুরী মিটিংয়ে যোগদানের জন্য থাকতে পারবেন না সেটা আগে থেকেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু পি এস, তার তো থাকার কথা। যাহোক, কিছুক্ষন খোজা খুজি করে তাকে না পাওয়াই ওকে বাদেই গ্রুপ ছবিটা নেয়া হল।
অফিস খোলা তাই সবাই ব্যস্ত। বিদায়ী অনুষ্ঠান করতে এমনিতেই বেশ কিছুটা সময় নিয়েছে তাই কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য সবাই উদগ্রীব। যাহোক, গাড়ী আসতে দেরী দেখে কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করে অমর সরকারের কাছ থেকে বিদায় নিল। এত দেরী হওয়াতে অন্যান্যরাও এক এক করে নিঃশব্দে সে স্থান ত্যাগ করে যে যার কাজে চলে গেল।
গাড়ী বারান্দার সিড়িতে অমর চৌধুরী একা দাঁড়িয়ে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র অফিসের একজন পিয়ন, এক গাদা ফুলের মালা হাতে। ফুলগুলো এখনও জীবন্ত কিছুক্ষণ আগে সংঘটিত বিদায় অনুষ্ঠানের স্মৃতির মত। মালাগুলো সবাই ওর হাতে দিয়ে গিয়েছে অমর চৌধুরীর গাড়ীতে উঠিয়ে দেবে বলে।
গাড়ী আসতে দেরী করছে তাই অনন্যোপায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় কি!

পিছন থেকে আসা ঠুক ঠুক শব্দে তিনি পিছন ফিরে তাকালেন।
গাড়ী বারান্দার এক পাশ দিয়ে উপরে যাওয়ার সিড়ি অন্য পাশে লিফট। বহুতল ভবনের চার তলা পর্যন্ত যাদের অফিস তাদেরকে লিফটের পরিবর্তে সিড়ি ব্যবহার করার জন্য অমর চৌধুরী সব সময় উৎসাহিত করতেন। বিপুল করতালির মধ্যে নাতিদীর্ঘ একটা বক্তৃতা শেষে সেদিন তিনি লিফট আর সিড়ির সামনে ‘বিদ্যুৎ নয় ক্যালোরি পোড়াও’ লেখা একটি করে বড় পোস্টার আর সিড়ির দেয়ালে বিভিন্ন মনিষীদের উক্তি লেখা সাড়ে তিন বাই ছয় ফিট আকারের অনেকগুলো পোষ্টারও টাঙিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে সিড়ি দিয়ে উঠার সময় সেগুলো সবার চোখে পড়ে।
কন্ট্রাক্টটারের কয়েকজন লোক হাতুড়ী দিয়ে ঠুক ঠুক করে ওগুলোই খুলছে।
অমরের অনুরোধেই বিদায় অনুষ্ঠান একটা দিন পিছানো হয়েছিল। সাধারন বিবেচনায় বোঝা যায় নতুন বসের আদেশে ওগুলো খোলা খুলির কাজ বিদায়ের পরদিন নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে কাজটা বিদায়ী অতিথির সামনে না ঘটে।
-কন্ট্রাক্টটা নিশ্চয় কিছু দিন আগে দেয়া তাই দিনটি বদলানোর ব্যপারে ব্যস্ততার মধ্যে হয়ত কেউ খেয়াল করেনি। তানা হলে বিদায়ী অতিথির সামনে এ কাজটি করা হতো না নিশ্চয়।

প্রায় মাস ছয়েক আগে যখন পোস্টার গুলো বেশ আয়োজন করে লাগানো হয়েছিল সেদিনকার উচ্ছ্বাসিত প্রশংসার কথা সবার স্মৃতিতে এখনও অম্লান। অনেক ছবিও তোলা হয়েছিল সে অনুষ্ঠানের, সেগুলো অফিসের দেয়াল এ্যালবামে রাখা আছে।
-পোষ্টার গুলো যখন উঠে যাচ্ছে, তখন এ্যালবাম থেকে ছবি গুলোও সরে যাবে, হয়ত আজই!
কথাগুলো ভাবতেই বুক খালি করে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল।

গাড়িটা এখনো আসছে না, দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় কি!
প্রায় আধা ঘন্টা পর একটা অচেনা জিপ এসে ড্রাইভওয়েতে দাড়ালো। পি এস হন্ত দন্ত হয়ে নেমে কিছুটা অপরাধীর মত অমর চৌধুরীর সামনে এসে দাঁড়ালো।
-সরি স্যার, দেরী হয়ে গেল। পুলের গাড়ী, কাগজপত্র সাক্ষর করিয়ে আনতে দেরী হল।
অমর চৌধুরী অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন ওকে। তরুন অফিসার, গত বছর দুয়েক থেকে অমরের সাথে কাজ করেছে।
-স্যারের একটা মিটিং আছে জানেন তো, স্যার আমাদের গাড়ীটা নিয়ে গেছে। আমি ঠিক জানতাম না ব্যপারটা, কিছুক্ষণ আগে গাড়ীর জন্য ড্রাইভারের কাছে টেলিফোন করাতে জানতে পারলাম। তায় পুলের গাড়ী আনতে হল।
কথা বলতে বলতে, পি এস তাড়াহুড়ো করে ফুলের মালাগুলো গাড়ীতে উঠাতে লাগলো।
-সরি স্যার, আমাকে এখনই একটা মেল পাঠাতে হবে, না হলে বাসা পর্যন্ত যেয়ে আপনাকে বিদায় জানাতে পারতাম।
ওর কথা শুনতে শুনতে অমর গাড়ীতে উঠে বসতেই ড্রাইভার গাড়ী স্টার্ট করলো। পি এস ছেলেটা কিছুটা মলিন মুখে হাত নাড়লো।
সব কিছু যেন নিমেষেই এলোমেলো হয়ে গেল।

গত প্রায় বছর খানেক ধরে সরকারী বাসায় অমর চৌধুরী বলতে গেলে একাই থাকতেন। তাই মাস দুই আগে সরকারী বাসা ছেড়ে নিজের বাসায় উঠেছেন।
নিজ বাসায় গাড়ী থেকে নামতেই এ্যলফি দৌড়ে এসে সামনের পা দুটো উচু করে অমরের কোলে উঠতে চাইল। বাসার পোষা কুকুর। অমর নিচু হয়ে বসে এ্যলফিকে আদর করে ওর সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
গাড়ী থেকে ফুলের মালাগুলো নামাতে দেখে ড্রাইভারকে ওগুলো নামাতে নিষেধ করে ওকে বকশিস দিয়ে করমর্দন করে ওকে বিদায় জানালেন।
সব কিছুই কেমন যেন অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তন হয়ে গেল।
তবে এ্যলফির ব্যবহারে বা আচরণে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। এ্যলফি ও বাড়ীর একজন সদস্যকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে কোন কিছু না ভেবেই। অমর চৌধুরী ওকে নিয়ে অন্য দিনের মতই খেলায় মেতে উঠলেন।
মনটা হালকা হয়ে গেল। তিনি চাকরীতে আছেন বা নেই সে বিষয়টি এ্যলফির চালচলনে কোন প্রভাবই ফেলেনি। নিজের বাড়ী এমনই হওয়া উচিত যে কোন সময় যে কোন পরিস্থিতিতে একজন মানুষ নিজের বাড়ীতে সমান ভাবে স্বাগত ও সমাদৃত হবে। তা না হলে প্রকৃত অর্থে সেটাকে বাড়ী বলা যাবে না।

শেষ জীবনে নিজের একটা বাড়ী তৈরী করা সব সীমিত আয়ের মানুষদের একটা স্বপ্ন থাকে। মাথা গোঁজার ঠাই আরকি। অমর তার নিজের বাড়ী তৈরীর কাজ শেষ করেছে বছর দেড়েক হল। তাদের একটাই সন্তান, সে বাবা মায়ের সাথেই সরকারী বাসায় থাকতো। কিন্তু নিজেদের বাড়ীটা নির্মাণ হওয়ার পর ওরা শিফট করেছে। সাত তলা বাসার একটা ফ্লাট নিয়ে থাকে সেই প্রথম থেকেই।
ও অমর চৌধুরীর একমাত্র ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার, বর্তমানে ভাল চাকরী করে, বছর ছয়েক হল বিয়ে করেছে। ওদের একটা ছেলে সন্তান আছে। বিয়েটা ওর মায়ের পছন্দ মতই হয়েছে। বউটা খুব শাশুড়ি ভক্ত। অমরের স্ত্রীও বলতে গেলে খোকার সাথেই থাকে। ছেলে বউয়ের প্রতি ভালবাসা ছাড়াও পোতা ছেলেটা তার খুব ভক্ত, দাদিকে ছাড়া রাতে ঘুমাতে চায় না।
এ্যালফি’র সাথে সময় কাটানোর ছলে অফিস থেকে বিদায়ের তিক্ত স্মৃতি টুকু ঝেড়ে ফেলে লিফটে উঠে তিন তলাই নিজের ফ্লোরে নামতেই ভিতর থেকে আসা উঁচু গলার আওয়াজ শুনে দরজার বেল টিপতে যেয়েও থমকে দাড়ালেন অমর চৌধুরী।
বাসার ভিতর উঁচু গলায় অনেকটা চিৎকার করে কেউ কথা বলছে।
ছেলের গলা, বুঝতে কষ্ট হল না। কিন্তু চেচামেচি কি জন্য? সেটা আঁচ করার চেষ্টা করলেন।
-অবসরের পর বাবাতো একটা বছর সরকারী বাসায় থাকতে পারতো। খাওয়া শোয়ার তো কোন অসুবিধা হত না, বাসায় রান্নার জন্য লোক, দারোয়ান সবই আছে। ততদিনে আমি না হয় একটা ব্যবস্থা করে নিতাম।

অমর চৌধুরী জানেন যে তিনি নিজের বাসায় আসার পর থেকে একটু আধটু সমস্যা হচ্ছে পোতাকে নিয়ে। ছেলেটা দাদিকে ছাড়া ঘুমাতে চায় না। অমর আসার পর থেকে তার স্ত্রী পোতাকে নিজেদের বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে পরে বাবা মায়ের বিছানায় দিয়ে আসে পাশের রুমে। কিন্তু প্রায়ই মাঝ রাতে ও ঘুম ভেঙ্গে উঠে দাদির সাথে ঘুমাবে বলে কান্না কাটি করে সবাইকে জাগিয়ে দেয়। খোকার খুব অসুবিধা হয় কারণ রোজ সকালে ওকে অফিসে দৌড়াতে হয়।
-সরকারী বাসায় আমি আরো একটা বছর থাকতে পারতাম সেটা ঠিক। ওখানে আমার খাওয়া শোয়ার কোন অসুবিধা হতো না তাও ঠিক। কিন্তু জীবনের এ পর্যায়ে এসে মানুষের কি কেবলমাত্র খাওয়া আর শোয়ার চাহিদা থাকে! আর আমি আরো এক বছর সরকারী বাসায় থাকলে এর মধ্যে খোকা কি ব্যবস্থা করে নিত! থমকে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন ভাবলেন অমর চৌধুরী।
সে রাতেই তিনি স্ত্রীকে একান্তে বললেন –সরকারী বাসাটা এখনও আমার নামেই বরাদ্দ আছে, আমি কালকেই শিফট করবো ওখানে।
সরকারী বাসায় মাস খানেক অবস্থান করে সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্মকর্তা অমর চৌধুরী বেরিয়ে পড়লেন অজানা গন্তব্যে। সারা জীবন ধরে তিনি যা কিছু করেছেন সব তার নিজের জন্য। জীবনের এই প্রান্তে এসে যাপিত জীবনের অসারতা অনুধাবন করে তিনি ঠিক করলেন -নিজের জন্য আর না, বাকি সময় টুকুতে যা কিছু করবেন তা কেবল পরের জন্য।

এ ভাবেই তিনি বিচ্ছিন্ন একটি পাহাড়ী গ্রামে উপস্থিত হলেন। আকাশ ছোঁয়া উঁচু শৃঙ্গের পর্বত মালার পাদদেশে সব ধরনের আধুনিকতার সুবিধা বঞ্চিত গ্রাম। মানুষ প্রায় সবাই নিরক্ষর, সহজ সরল। পাহাড় জঙ্গলে বিভিন্ন কাজে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে অন্য সবার মত জীবিকা অর্জনের মাধ্যমে শান্তির মরিচিকা ধরতে ব্যস্ত।
কেবল জীবিকা দ্বারা শান্তি পাওয়া যাবে না, প্রয়োজনে বা বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই প্রকৃত শান্তি। এই শান্ত গ্রামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সরল মানুষদের এই সরল মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করলেন অমর চৌধুরী।
ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ তাকে ওদেরই একজন হিসেবে গ্রহন করে তার পরামর্শ শুনতে শুরু করল। তিনি সকলকে বুঝালেন যে; -প্রকৃত শান্তির জন্য বস্তুগত নয় বরং অবস্তুগত জিনিস যেমন ভালবাসা, সহমর্মিতা এগুলোর প্রয়োজন। -অপরের জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে কিছু করার মধ্যে স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করা যায়, কারণ এটা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট।

তিনি গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সবাইকে এভাবে উদ্বুদ্ধ করলেন যে, নিত্য দিনের সব কাজ কর্মের পাশাপাশি সকলে প্রতিদিন নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষ বা প্রাণী বা প্রকৃতির কল্যানার্থে কিছু না কিছু করবে তা যত ক্ষুদ্র বা তুচ্ছই হোক না কেন।
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সবাই একত্রে জড় হলে অন্য সব আলোচনা শেষে সেদিন কে কি পরকল্যানমুলক কাজ করেছে তার সংক্ষিপ বর্ণনা দেয়ারও ব্যবস্থা করলেন।

একদিন একটা ছোট্ট শিশু যখন বর্ণনা করল যে, গত কাল অন্ধ মুয়াজ্জিন যখন মসজিদে আসছিলো তখন সে দেখল অন্ধের একটু সামনে পথের উপর একটা পাথর খণ্ড পড়ে আছে, সে চুপি চুপি সেটা সরিয়ে দিল। এই নিঃস্বার্থ উপকারের কথা বর্ণনা করার সময় শিশুটির চোখে মুখে এক অভূতপূর্ব দ্যুতি ভেসে উঠলো তা কারো নজর এড়াল না।

তিনি মানুষদেরকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, প্রকৃত শান্তির জন্য কেবল আর্থিক সামর্থ্যতা নয়, অত্যাবশ্যক হল সহমর্মিতা আর সহযোগিতা। মানুষ বুঝল যে, প্রতিযোগিতা হল নেতিবাচক, একই জিনিস পাওয়ার জন্য সকলের প্রচেষ্টা, তাতে করে ভাই ভায়ের, বন্ধু বন্ধুর শত্রুতে পরিণত হয়ে সবাইকে প্রতিশোধ প্রবণ করে তোলে। অপরদিকে, সৃজনশীলতা মানুষের চিন্তা চেতনার গন্ডি উন্মুক্ত করে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির অনুপ্রেরণা যোগায়। সব মানুষ এক একজন সহ-স্রষ্টা, প্রভুর সৃষ্টিতে মৌলের কোন ঘাটতি নেই, ঘাটতি কেবল যৌগ সৃষ্টির প্রচেষ্টার।
সবাই বুঝল যে, আর্থিক অনটনের বিষয়টি কেবল মাত্র একটা উপলন্ধি ছাড়া কিছু না। সুখে দুখে সবাই সবার পাশে দাঁড়ানোর ফলে মানুষের মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন নিরাপত্তা বোধ ও শান্তি বিরাজ করতে লাগলো। গ্রামটি প্রকৃত অর্থে বিশাল অরণ্যের মধ্যে একটুকরো স্বর্গে পরিণত হল।

এই বৃদ্ধ কোথা থেকে এসেছিলেন, কেনই না এসেছিলেন, তা কেউ জানতো না। কিন্তু আজ এই দেবতুল্য মানুষটির মৃতদেহ সমাহিত করা নিয়ে এলাকার মানুষ চিন্তিত হয়ে পড়ল।
-গ্রামের কোন কোণে তাঁকে সমাহিত করব তা ঠিক বুঝতে পারছি না। কারণ তিনি তো আমাদের কারো মত আলাদা সত্ত্বা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরো লোকালয়ের সাথে গ্রথিত এক মহাপ্রাণ। গ্রামের সব থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটির কথাই সবাই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো।
-ঐ যে পর্বত শৃঙ্গ দেখছ ওখানে উঠার খুব স্বাদ ছিল তাঁর। তিনি নীরবে ওদিকেই তাকিয়ে উদাস হতেন। আমাদেরকে বলতেন, দেখ ওখানে আকাশের মেঘ পৃথিবীর মাটিকে চুম্বন করে। ঐ উচ্চতায় উঠলে নিজেকে উপলব্ধি করা যাবে। কিন্তু সে ভাগ্য কি আমার হবে!
একটা অল্প বয়সী যুবকের কথা সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করল।
গ্রামের সব যুবক শ্রেণী অশ্রুসিক্ত নয়নে জড় হল নিষ্প্রাণ দেহকে ঘিরে। তারা পাহাড় থেকে খুঁজে খুঁজে সব চেয়ে পুরনো চন্দন গাছের কাঠ কেটে কফিন তৈরী করল। পাহাড় শৃঙ্গ থেকে নেমে আসা ঝর্নার নির্মল পানিতে মৃত দেহটা ধুয়ে পাক পুত করে তাতে সুগন্ধি লাগিয়ে শ্বেত শুভ্র নিষ্কলুষ কাপড়ে আবৃত করল। সমস্ত ধর্মীয় আচারাদি শেষে তরুনেরা কফিন কাঁধে পর্বত শৃঙ্গে উঠার বন্ধুর পথে রওয়ানা হল।
শান্তির অন্বেষক চির শান্ত হয়ে ঊর্ধ্ব লোকে গমন করল আর নিচে পড়ে রইল তাঁর সৃষ্টি অশ্রুস্নাত শান্তরসাস্পদ গ্রাম।

Category: Meaning of Life

Write a comment