মানুষের ভাবনাগুলো খুব শক্তিশালী একটা বিষয়। কিন্তু একে শুধুমাত্র শক্তিশালী বললে বোধহয় ভুল হবে, সেগুলো প্রকৃতই সবচেয়ে শক্তিশালী। মানুষ এ জীবনে যে যা অর্জন করেছে এবং করবে তা নিশ্চিত ভাবে তার ভাবনার ফসল।
অমর নিজ গ্রামের সরকারি প্রাইমারী স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক। দুটি ছেলে মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ওদের। অমরের স্ত্রী অধরা ওর থেকে পাচ বছরের ছোট। অধরা বি এ পাশ করার পর পরই বিয়ে হয় ওদের। তারপর বছর গড়াতেই ওদের প্রথম ছেলের জন্ম। ছেলের দু’বছরের মাথায় মেয়েটার জন্ম। তার বয়েসও এখন প্রায় এক বছর। মেয়েটা একটু বড় হলে অধরাও একটা চাকরীর চেষ্টা করবে। নিজেদের জমিজমা আর অমরের মাইনে সব মিলে স্বচ্ছল পরিবার ওদের। তার উপর অধরা চাকরী করলে বাড়তি টাকা জমিয়ে রাখবে ছেলে মেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য।
এ সব নিয়ে ওরা স্বপ্ন দেখে দেখে হাসি খুশিতে দিন কাটায়। কোন কিছুর অভাব যেন ওদের মধ্যে কোন আলাদা বোধের সৃষ্টি করতে পারে না।
অধরার জন্য ভাল একটা চাকরী ছাড়া আর যে একটা সুখস্বপ্ন ওরা স্বামী স্ত্রী লালন করে সেটা হল; অমর একদিন ওই স্কুলের হেডমাষ্টার হবে। তাতে ইনকাম বাড়ার থেকে যে জিনিসটা ওদেরকে আকর্ষণ করে সেটা সন্মান। বিশেষ করে ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার সময় বুক উচু করে বলতে পারবে হেডমাস্টারের ছেলে বা মেয়ের বিয়ে।

অমরের বেশ কছু শখ আছে, তার মধ্যে গান বাজনা করার শখ অন্যতম। অমরের পরিবারটাকে মিউজিক্যাল পরিবার বলা চলে। অমরের স্ত্রীও ভাল গান গায়। ছেলেটার জন্য প্রতিদিন গানের টিচার আসে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন গুলো খুব আনন্দে কাটে ওদের। অমরের বন্ধুরা পালা করে একেকজনের বাড়ীতে বিকেলে চায়ের আসর বসায়। খুব সাদাসিদা অনুষ্ঠান কিন্তু হাসি গানে ভরা থাকে।
স্কুলের যে কোন অনুষ্ঠানে অমর গলা ফাটিয়ে গান করে। স্কুলের বাচ্চাদের সাথেও গলা মিলিয়ে গান করে অমর। আর গেমস পিরিয়ডে বাচ্চাদের সাথে মিলে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলাতেও মেতে ওঠে সে।
স্বাধীনতা দিবস, বর্ষা বরন ইত্যাদি অনুষ্ঠান সংগঠন করার দায়িত্ব হেডমাস্টার সাহেব সব সময়ে অমরকেই দিয়ে থাকে।

অমর পর পর দুবার জেলার শ্রেষ্ঠ প্রাইমারী শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে পুরস্কারও পেয়েছে। দ্বিতীয় বার পুরস্কারটা তারই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভা শেষে স্বয়ং মন্ত্রি মহোদয়ের হাত থেকে গ্রহণ করার সময় সারা শরীরে যে শিহরণ জেগেছিল তা আজও ওর স্মৃতিতে অম্লান।
নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা শেষে পুরষ্কারটা উঠিয়ে দিয়ে অশীতিপর মন্ত্রি মহোদয় অমরের পিট চাপড়ে দিয়ে ছোট একটা শ্বাস টেনে বলেছিলেন –উঁচু মানের মেধা আর একনিষ্ঠতা নিয়ে তোমার মত যারা অবহেলায় আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান আর সুযোগ সুবিধা থেকে এত দূরে পড়ে আছে তাদের জন্য আমার দুঃখ হয়। এটা প্রকৃতই আমাদের অকৃতকার্যতা।
মন্ত্রির মহোদয়ের মন্তব্যে অমর কিছুটা বিহব্বল হয়ে তাকিয়ে ছিল।
অমরের বিহব্বলতা লক্ষ্য করে মন্ত্রি মহোদয় সে কিছু বলতে চায় কিনা জিগ্যেস করলে অমর অতি সাধারন ভাষায় বলেছিল –সত্যি আমি বুঝতে পারছি না স্যার, আমরা কি সব আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান আর সুযোগ সুবিধা থেকে দূরে পড়ে আছি যেটি আপনি বললেন?
অমরের সরলতার সৌন্দর্যে অশীতিপর মন্ত্রি আবিভুত হয়ে ওর মাথায় হাত রেখে ওর আর ওর পরিবারের জন্য দোয়া করেছিলেন।
মন্ত্রী মহোদয়ের কথাগুলো নিয়ে অমর তার স্ত্রী অধরার সাথে আলাপ করেছিল।
-ওরা তো খুব ভাল আছে, স্কুলের ছেলে মেয়েদের পড়ানোকে অমর চাকরী বা পেশা নয় বরং এবাদত মনে করে, তাইতো কাজটি করতে ও কখনো যেমন ক্লান্তও হয় না তেমনি একাগ্রতার কোন ঘাটতিও পরিলক্ষিত হয় না। স্কুলের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মধ্যে অমর নিজের ছেলে মেয়েকে দেখতে পায়। ওরা যখন বইয়ের বিদ্যাগুলো হৃদয়ঙ্গম করে সে ভাবে নিজেদেরকে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তখন অমরের অন্তরটা এক স্বর্গীয় সুখানুভূতিতে ভরপুর হয়ে ওঠে। কোন কিছুর অভাব বোধ ওর মনে স্থান পায় না।

এর মধ্যে স্কুলের হেডমাস্টারের ভায়ের ছেলে গ্রামে আসলো, সে ছোট কাল থেকে ওর বাবা মায়ের সাথে থেকে আমেরিকাতে বড় হয়ে ওখানেই স্পেস সায়েন্সে পড়াশোনা করে নাসাতে চাকরীর জন্য চেষ্টা করছে। চাকরীটা পেয়ে যাবে বলেও ওর খুব ভরসা।
গ্রামে এসেছে মাস খানেক থাকবে বলে। নাম রয়েল, বয়সে অমরের থেকে দশ বারো বছরের ছোট। হেডমাষ্টার একদিন তার অফিসে রয়েলের সাথে অমরের পরিচয় করিয়ে দিল। পরিচয়ের সময় রয়েলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বর্ণনা দেয়ার পাশাপাশি হেডমাস্টার সাহেব অমরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার কৃতিত্বের কথাও উল্লেখ করলেন।
রয়েল খুব আগ্রহ সহকারে সব শুনে অমরের ভূয়সী প্রশংসা করল।
দিনে দিনে ওরা বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো। অমর মাঝে মাঝে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদেরকে স্কুলের হল রুমে জড় করে রয়েলের মুখে তার নিজের জীবনের সফলতার গল্প শোনানোর ব্যবস্থা করল। একদিনের এমনই একটি আলোচনার কথা অমর ভুলতে পারে না।
-ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা তোমরাই দেশের, জাতির ভবিষ্যৎ, মনের জড়তাকে ভেঙ্গে অনেক উপরে উঠার স্বপ্ন দেখতে হবে। তাহলেই তো তোমরা বড় হতে পারবে।
রয়েলের কথা মন দিয়ে শুনতে লাগলো সকলে।

-শুনুন অমর, আপনি যদি বাচ্চাদের ডেকে সবার হাতে একটা করে পাথরের টুকরো দিয়ে সেটি উপরের দিকে ছুড়ার প্রতিযোগিতা করতে বলেন তাহলে প্রথমে যে কাজটি করতে হবে তা হল, ওদের জন্য টার্গেট নির্ধারণ করা। এখন আপনি যদি টার্গেট হিসেবে ধরুন স্কুলের মাঠে অবস্থিত সব থেকে বড় গাছটির মগ ডালটা নির্ধারণ করে দেন তাহলে কিন্তু আপনি ওদের উঁচুতে উঠার চিন্তাটা সীমাবদ্ধ করে দিলেন।
-ওরা পাথর ছুড়বে, দুএকজন হয়তো মগ ডাল বা তার কিছু উপরেও ঢিল ছুড়বে আর অন্যান্যরা টার্গেটের অনেক নিচু পর্যন্ত ছুড়তে পারবে।
অমর নিমগ্ন হয়ে রয়েলের কথাগুলো শুনছিল।
-ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? দুএকজন যারা টার্গেট ছুঁয়ে ফেলবে বা একটু উপরে যাবে তারা আত্মতুষ্টিতে ভুগবে আর বড় অংশ যারা টার্গেট পর্যন্ত ঢিলটা ছুড়তে পারিনি তারা প্রানান্ত চেষ্টা করবে বড় জোর মগ ডাল পর্যন্ত ঢিলটা পৌছাতে।
-আমাদের সমস্যাটা ওখানেই, উপরে উঠার সীমা নির্ধারণ করে দেয়া।
রয়েলের কথাগুলো অমরের কাছে কেমন যেন দুর্বোধ্য লাগছিল। কিছুটা মন্ত্রী মহোদয়ের কথার মত।
-তার থেকে আমি বলি সবার মনের জড়তাকে ভেঙ্গে দিতে হবে, বলতে হবে তোমাদের টার্গেট গাছের মগ ডাল অব্দি না, ঢিল ছুড়ে আকাশের মেঘ ছুঁতে হবে।

-তা কি করে সম্ভব!
অমর যেন আঁৎকে উঠলো।
-আপনি ঠিকই বলেছেন, ঢিল ছুড়ে আকাশের মেঘ ছোঁয়া অসম্ভব কিন্তু অবাস্তব বা অলীক কোন কল্পনা নয়। এক্ষেত্রে বাচ্চারা খালি হাতে তাদের ছোড়া ঢিল কখনই আকাশের মেঘ ছোয়াতে পারবে না, তবে মগ ডালের উচ্চতার তুলনায় অনেক গুন উপরে পৌছাতে পারবে সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন। অধিকন্তু, টার্গেটে পৌঁছানোর জন্য তারা চিন্তা করবে বিকল্প কোন পদ্ধতি বের করার। আসলে অল্পে তুষ্ট বিষয়টি মানুষের মধ্যে সুপ্ত সম্ভাবনা বিকাসের পথে অন্তরায়।
রয়েলের কথাগুলো সে মুহূর্তে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মনে কি প্রভাব ফেলল সেটা সঠিক ভাবে বলা মুশকিল, তবে স্বল্পে তুষ্ট অমরের মনের উপর তা এক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলল।
রয়েল চলে যাওয়ার আগে কয়েকবার অমরের বাড়িতে আসলো এবং অধরার সাথেও একই বিষয়ে আলাপ আলোচনা করল।
অমরের সাথে যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে গেল রয়েল। অমরের ছেলে মেয়েরা বড় হলে তাদেরকে উন্নত শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি তাদের খেয়ালে রাখার কথা বলে গেল এবং এ ব্যাপারে সে যথাসম্ভব সহযোগিতা করার পূর্ণ আশ্বাসও দিল।
রয়েল চলে যাওয়ার পর অমর আর অধরার চিন্তা চেতনায় আমুল পরিবর্তন দেখা দিল। ওদের জীবন ধারনের সেই হালকা ভাবটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

অল্পে তুষ্ট বিষয়টি মানুষের মধ্যে সুপ্ত সম্ভাবনা বিকাসের পথে অন্তরায়, বিষয়টা অমরের মনে গভীর ভাবে রেখাপাত করল। একই সাথে রয়েলের দেয়া উদাহরণটা অমরকে সারাক্ষন তাড়া করে ফিরতে লাগলো।
এই গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার হওয়ার স্বপ্নটা তার কাছে নিতান্তই অপ্রতুল বলে গণ্য হতে লাগলো। এ গ্রামের স্কুল ছেড়ে শহরের কোন বড় স্কুলে যোগদান করা এবং গ্রাম ছেড়ে শহরে যেয়ে বসবাস করার একটা তাড়া অনুভব করতে লাগলো ওরা। ছেলে মেয়েদেরকে এই গ্রামের স্কুলে পড়ালে জীবনে বড় হয়ে মাথা তুলে দাড়াতে পারবে না, তাই ওদেরকে শহরের স্কুলে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা করল অমর। বড় ছেলেটার স্কুলে যাওয়ার বয়েস তো হয়েই গিয়েছে। এখন থেকে ওকে কোচিং করিয়ে শহরের ভাল স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য যোগ্য করে তুলার তাড়না অনুভব করতে লাগলো।
এ সব কিছুর জন্য আরো বেশী উপার্জন দরকার। তাছাড়া ওর স্ত্রী বসে না থেকে তাড়াতাড়ি কোন চাকরীতে যোগদান করানোর একটা তাগিদও অনুভব করতে লাগলো।
ওদের মধ্যে একটা তাড়াহুড়া আর অসহিষ্ণুতা কাজ করতে শুরু করল। মনে হতে লাগলো দেরী হয়ার আগেই সব কিছু করতে হবে। নিজেরাতো জীবনটা গতানুগতিক ভাবে কাটিয়ে দিল কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভাল কিছু করতে হবে।

পালা করে বন্ধুদের বাড়ীতে বাড়ীতে ছুটির দিনে আসর বসানো ধীরে ধীরে প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। একই ভাবে স্কুলে বাচ্চাদের সাথে গান গাওয়া বা খেলাধুলাতে অংশ গ্রহন করার সব উৎসাহ দিনে দিনে হারিয়ে ফেলল অমর।
অমরের ভিতর থেকে ওর স্বভাবজাত উৎফুল্লতা ক্রমে হারিয়ে যেতে লাগলো। অমরের স্ত্রীর ভিতরও ওই একি ধরনের ভাব পরিলক্ষিত হল।
মন্ত্রী মহোদয়ের সেদিনের মন্তব্যটা ওদেরকে সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরতে লাগলো।
অল্পে তুষ্ট সদা হাসি খুশিতে ভরা অমর আর ওর স্ত্রী দিনে দিনে যে যার মত একা হয়ে যেতে লাগলো।

Category: Meaning of Life

Write a comment