ক্লাবে বসে সকালের নাস্তা খেতে খেতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে মনটা একটু হালকা করবে বলে মনস্থ করলো অবনী।
একটা বিশেষ প্রজেক্টের কাজ নিয়ে অবনী আর ওর কয়েকজন বন্ধু মিলে সপ্তাহখানেক ধরে ওদের অফিস রুমে বলতে গেলে ঘরবন্দি থেকে কাজটা শেষ করার পর একটু বাইরে কোথাও যাওয়ার জন্য মনটা হাফিয়ে উঠাই ওরা এ সিদ্ধান্তটা নিল।
ক্লাবটি ওদের রেসিডেন্সিয়াল এলাকা পার হয়ে হাইওয়ে ধরে মাইল দুয়েকের মত ড্রাইভ।
সকাল বেলা রাস্তা বেশ ফাকা। অবনী ওর দুজন বন্ধুকে নিয়ে গাড়ীটা ড্রায়িভ করে হাইওয়েতে উঠে মিনিট দুয়েক চালিয়েছে। হটাৎ করে সাইড রোড থেকে ময়লা বোঝাই একটা ট্রাক খুব স্পীডে হাইওয়েতে ঢোকার সময় অনেকটা সরাসরি অবনীর গাড়ীর মাঝ বরাবর ধাক্কা দিচ্ছিল। নিশ্চিত মারাত্মক কিছু একটা ঘটে যেত, যদি না শেষ মুহূর্তে অবনী তড়িৎ গতিতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ীটা আইল্যান্ডের উপর উঠিয়ে দিত।
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই ওরা হতবাক।
ততোক্ষণে ময়লা বোঝাই ট্রাকটাও হার্ড ব্রেক করে থেমে গেল। ট্রাকের ড্রাইভার সিটে বসেই জানালা দিয়ে মুখটা বের করে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছোড়াছুঁড়ি করে কারের চালক ও যাত্রীদের উদ্দেশ্যে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করতে লাগলো। ওর লম্বা অগোছালো চুল, বেশ কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি, ফোলা ফোলা চোখ তার সাথে ওর কন্ঠে পরিষ্কার অসংলঘ্নতা বলে দেয় যে ও হয় নেশাগ্রস্থ না হয় ঘুমের অভাবে ও কোন ভাবেই স্বাভাবিক নয়।
ততোক্ষণে ওরা সবাই অক্ষত আছে বুঝতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ব্যস্ত। ওর কথার উত্তরে কেউ কোন জবাব দিল না।
ভুলটা পরিষ্কার ট্রাক ড্রাইভারের আর এক্সিডেন্ট ঘটলে ওর নিজের তেমন কিছু হত না বরং কারের সবারই প্রান হারানোর ভয় ছিল। এত কিছু সত্ত্বেও একতরফা ভাবে দোষারোপ করে গালিগালাজ করার পরও ট্রাক ড্রাইভারের উত্তেজনা কমছিল না, আর সে কিছুতেই নিবৃতও হচ্ছিল না।
ওদের এক বন্ধু অগ্নিমূর্তি হয়ে গাড়ী থেকে নামলো ট্রাক ড্রাইভারকে উচিত শিক্ষা দেবে বলে।
অবনী তাড়াতাড়ি নেমে বন্ধুকে নিরাস্ত্র করলো।
ওর বন্ধুর আক্রমণাত্মক শারীরিক ভাবভঙ্গিমা প্রত্যক্ষ করে ট্রাকের ড্রাইভার আরো উত্তেজিত হয়ে উঠলো।
অবনী বন্ধুটিকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে পাশে সরিয়ে দিয়ে দু’হাত জোড় করে ড্রাইভারের কাছে পুনঃ পুনঃ ক্ষমা চেয়ে ওকে ওর কাজে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলো।

অবনীর জোড় হাতে নতজানু হয়ে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিমায় বেশ কিছুক্ষণ পর মনে হল ড্রাইভারটির সুভবোধের উদ্দ্রেগ হল আর ওর মনে যেন কিছুটা দয়া ভাবের উদ্দ্রেগ হল।
-আচ্ছা যাও, বাচ্চা মানুষ তোমরা, মাফ করে দিলাম। ভাগ্য ভাল, জানে বেচে গিয়েছ। কোন মাজারে শিরণী দিয়ে দিও আর মা বাবার দোয়া নিয়ে রাস্তাই চলাফেরা কোর।
কিছুক্ষন ধরে অবনীর নতজানু ভাব অবলোকন পূর্বক বিজয়ের স্বরে কথাগুলো বলল ট্রাকের ড্রাইভার।
এতক্ষণে ড্রাইভার গাড়ী থেকে নামলো। স্মিত হাস্য মুখে অবনীর কাছে এসে ওর চুলগুলো আদর বশে এলোমেলো করল। দাঁড়িয়ে দেখল কিছুক্ষন ওকে। তারপর সে তার ট্রাকের ড্রাইভার ক্যাবিন থেকে এক বোতল পানি আর দুটো চিপসের প্যাকেট ওর হাতে দিয়ে মৃদু হেসে ট্রাকের ড্রাইভিং ছিটে উঠে বসলো।
তার চালচলন আর মুখাবয়বে বিজয়ের তৃপ্তি, সাথে দয়া দেখানোর তুষ্টির ভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। মৃদু হাসি ভরা মুখে হাত নেড়ে যাই বলে ট্রাক চালিয়ে চলে গেল।

বিরক্তিতে ভরা মন নিয়ে দু’জন বন্ধু সহ অবনী ক্লাবের রেস্টুরেন্টে নাস্তার টেবিলে বসলো।
খুব খারাপ ভাবে দিনটি শুরু হওয়াই ওদের মনটা আফসোসে ভরা। টেবিলে খাবার রাখা কিন্তু কারো যেন ক্ষুধা নেই। সবাই চুপ চাপ।
-দিনটা কিছুটা অনভিপ্রেত তিক্ত ঘটনা দিয়ে শুরু হল, তাই বলে পুরো দিনটাকে তিক্ত ভাবা ঠিক হবে না। ভেবে দেখ অশিক্ষিত ট্রাক ড্রাইভার পরিষ্কার ভাবে প্রতিভাত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দিন শুরু করার পর অতবড় একটা অন্যায় করেও কেমন বিজয়ের আনন্দে তৃপ্ত হৃদয়ে দিনটা পুনরায় শুরু করল। আর আমরা কোন অন্যায় না করেও দিনটাকে তিক্ততাই পরিনত করবো, এ ধরনের বোকামি করা কি আমাদের সাজে, বল?
অবনীর মন্তব্য যেন দীর্ঘ মৌনতা ভাঙল।

-সব বুঝলাম কিন্তু তুই একটা কথার উত্তর দে, ড্রাইভারটি নিজে অন্যায় করেও আমাদেরকে যখন অযৌক্তিক ভাবে গালাগাল দিচ্ছিল, তুই তখন পাল্টা তাকে দোষারোপ না করে করজোড়ে কেন ক্ষমা চাচ্ছিলি?
-একটু ভেবে দেখ, ওরকম ভাবে ক্ষমা চেয়ে বেচারাকে জিতিয়ে না দিলে এখন এ ভাবে বসে আমরা কি ব্রেকফাস্ট করতে পারতাম?
অবনীর প্রশ্নের কোন জবাব দিল না ওর বন্ধুরা কেউ।
ঘটনার আদ্যপান্ত আলোচনা করতে করতে ওরা ব্রেকফাস্ট শেষ করে চায়ে চুমুক দিল।

ওদের একনিষ্ঠ আলোচনা পাশের টেবিলে বসে মাথা ভরা সাদা চুল আর উঁচু পাওয়ারের চশমা পরিহিত এক বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক শুনছিলেন। তিনি স্মিত হাস্য বদনে নিজের চায়ের কাপটা হাতে করে একটা চেয়ার টেনে ওদের পাশে ঘন হয়ে বসলেন।
-এখানে বসলে তোমরা খুব আপত্তি করবে?
-না না সে কি কথা, আপনি বসুন।
অবনীর আশ্বাসে তিনি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রাখলেন।
-আমাকে ক্ষমা করো, অনভিপ্রেত দুর্ঘটনার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে তোমাদের আলোচনা এতক্ষণ ধরে শুনছিলাম।
-হাড় ভাঙ্গা কায়িক পরিশ্রম করে দিন আনা দিন খাওয়া শ্রেনীর মানুষদের একজন ওই ট্রাক ড্রাইভার। দিন শেষে পারিশ্রমিক ছাড়া ওর কাজের অন্য কোন স্বীকৃতি ওরা পায় না। যা পায় তা হল সমাজের কাছ থেকে বঞ্চনা। ওদের পাওনাটা দেয়ার সময়ও সকলে এমন ভাব করে যেন ওদেরকে দয়া করা হচ্ছে। আর্থিক ভাবে যেমন ওদের হারানোর তেমন কিছু নেই তেমনি ভাবে সমাজ প্রতিনিয়ত ওই শ্রেণীর মানুষদের আত্মসম্মান বোধে আঘাত হানার ফলে ওদের সম্মান হারানোটা কোন বিষয় নয়।
বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোকের কথাই ওরা সবাই তার দিকে আকৃষ্ট হল।
-পৃথিবীতে কোন মানুষ স্বয়ং সম্পূর্ণ নয়, সে ভাবেই বিধাতা সৃষ্টি করেছে আমাদেরকে। কোন কিছু যখন নিজের শারীরিক, আর্থিক বা সামাজিক ক্ষমতার বাইরে চলে যায় মানুষ তখন সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়। কারো কাছ থেকে সেটা না পেলে তখন দয়ার জন্য প্রভুর শরণাপন্ন হয়। দয়ার উপরই মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করে।
-অন্যদিকে অপরকে দয়া দেখানোর প্রবনতাও মানুষের জন্মগত। দয়া করা প্রভুর কাজ তাই পৃথিবীতে কেউ যখন বিপদে পড়া কাউকে দয়া দেখায় তখন প্রভুর আলো তার ভিতর প্রবেশ করে। তার মন তৃপ্ত হয়। দয়া করার ফলে যে প্রশান্তি মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে তা কেবল অনুভব করা যায়, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
তিনি চায়ে চুমুক দিতে দিতে নিস্পলক চোখে তাকিয়ে থাকা ওদেরকেও চায়ে চুমুক দেয়ার তাগিদ দিলেন।
-সুবিধা বঞ্চিত মানুষগুলো যারা সারাক্ষন বঞ্চনার স্বীকার হয়ে অন্যের দয়া দাক্ষিনের উপর বেচে থেকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘুরে বেড়াই তারা সুযোগ পেলেই অযৌক্তিক ভাবে তাদের সেই ভারাক্রান্ত হৃদয়ের ভারের অংশ অন্যের উপর উগরে দিতে চায়। তাইতো রিকশাওয়ালা সামান্য বেশী ভাড়া আদায়ের জন্য বড় বড় কথা বলে, ঘাটের কুলি বাস ষ্টীমার থেকে নামা মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করে, আর আজকের মত ময়লা বহনকারী ট্রাকের ড্রাইভার নিজে অন্যায় করেও, দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে তার মনের জ্বালা মিটাতে চেয়েছিল। আমি বলবো যারা বোকা তারাই কেবল সে সমস্ত মানুষের সাথে অযথা বচসাই জড়িত হয়ে ওদের উগরে দেয়া যন্ত্রণার ভার না বুঝে গ্রহন করে থাকে।
চায়ে একটা চুমুক দিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক।একটু লক্ষ্য করলেই বুঝবে সব মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল জিততে চায়। এ চাওয়াটা সব প্রাণীর স্বভাবজাত। মানুষের জীবন শুরু হয়েছে জেতার মধ্য দিয়ে। কথায় আছে ডিম্বাণুতে পৌঁছানোর দৌড়ে আমরা সবাই জেতার ফলে পৃথিবীতে এসেছি। আর এ জগত সংসারে যারা নিজেদেরকে দুর্ভাগা মনে করে প্রতিনিয়ত জীবন ধারনের প্রতিযোগিতায় হেরে যায়, তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিকতার জন্ম নেয়, যেটাকে ‘বঞ্চিত মানসিকতা’ বলা যায়। এ ধরণের মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ গুলো ছোট ছোট বিষয়ে বা তাৎক্ষনিক ভাবে জেতার সুযোগ হাতছাড়া না করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোকের কথাগুলো ওরা সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিল।

-প্রথমত, অজ্ঞান মানুষের সাথে তর্ক করে কেউ কখনই জিততে পারে না, কারণ এ ধরনের অযাচিত তর্কের ব্যাপারে ওরা খুব দক্ষ, তাই সে ধরনের মানুষের সাথে তর্ক করা অনর্থক। দ্বিতীয়ত, অজ্ঞ ড্রাইভার যখন বুঝল ও জিতেছে তখন ও অস্বাভাবিকতা থেকে স্বাভাবিকতায় ফিরে এসে তোমাদের পিতার বয়েসের মানুষটি পিতৃত্বের দরদ ওর মত করে প্রদর্শন করল সেটা নিশ্চয় তোমাদের কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।
বন্ধুরা চুপ হয়ে রইল।
-প্রতিটি মানুষের মন আর হৃদয়কে আকর্ষণ করার জন্য আলাদা আলাদা সুইচ থাকে। কেউ যদি সুইচগুলো সঠিক ভাবে চিহ্নিত করে ঠিক ঠাক মত প্রেস করতে পারে তাহলে সে মানুষ বা প্রাণী যতই অপ্রকৃতিস্থ থাকুক না কেন তারা অবশ্যই স্বাভাবিক আচরন করবে।
ওদের চা খাওয়াও শেষ হল। ততোক্ষণে মন মেজাজটা একেবারে তরতাজা, এবার উঠার পালা। বিল মিটিয়ে গাড়ীতে উঠার আগে অবনীর বন্ধুটি মৃদু হেসে বলল- সকালটা খুব বাজে ঘটনা দিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের জোরে প্রাণে রক্ষা পেয়ে পরে অবনীর বিচক্ষনতাই ঘটনার মোড় পুরোপুরি ঘুরে আনন্দঘন হয়ে উঠল।
গাড়ী চালিয়ে গেট দিয়ে বেরনোর ঠিক আগে কি ভেবে অবনী গাড়ীতে ব্রেক করে থামল। আরে, আসার আগে বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোকের কাছ থেকে বিদায় নেয়া হল না।
-তাইতো, কিন্তু আসার আগে তাকে আসে পাশে কোথাও দেখলাম না।
অবনীর কথার প্রেক্ষিতে ওর বন্ধুটির জবাবে ওরা সকলে একে অপরের চোখে চোখে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।

Category: Meaning of Life

Write a comment