পাঁচশো বেডের হাসপাতাল নির্মাণের শেষ চেকটা সাক্ষর করার সময় চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠল অপর্ণার। চারধার পাহাড় আর সবুজ অরণ্য পরিবেষ্টিত স্বচ্ছ কাঁচে আটা অফিস রুম থেকে শ্বেত শুভ্র বরফ মুকুটে আবৃত পর্বত চুড়ার দিকে তাকিয়ে জীবনের এই পড়ন্ত বেলাই তিনি পুরোপুরি উদাস হয়ে গেলেন।
জীবন বৃত্তের শুরু আর শেষ দুটো বিন্দু তিনি শত চেষ্টা করেও মিলাতে ব্যর্থ হলেন।

তৃতীয় বিশ্বের এক অনুন্নত দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার। বাবা ছিলেন স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। উল্লেখযোগ্য তেমন কোন সহায় সম্পত্তি ওদের ছিল না। কিন্তু ওদের যা ছিল তা হল পরিবারে অবিচ্ছন্ন সুখ আর শান্তি কারণ ওদের যা কিছু আছে তাতেই ওরা সবাই তৃপ্ত থাকতো। অপর্ণা দেখতে ভারী সুশ্রী আর তাই গ্রামের ছেলেরা সব সময় ওর পিছনে লেগেই থাকতো। উপায়ন্তর না দেখে অপর্ণা যখন ক্লাস এইটে পড়ে সে বয়সেই ম্যাক্ট্রিক পাশ করা একটা ছেলের সাথে বাবা ওর বিয়ে দিয়ে দেয়।
অপর্ণা জীবনে সুখী হওয়ার গভীর প্রত্যাশা পোষণ করত কিন্তু সে প্রতাশ্যা পুরনের জন্য ওর চিন্তাতে কোন শর্ত ছিল না। সুখের জন্য কি কি দরকার তা কখনো ভেবে দেখত না। অপর্ণাদের বাড়ীর সাথেই দিগন্ত বিস্তৃত একটা জলাভূমি। গ্রামগুলোকে রক্ষার জন্য বিলের ধাঁর ঘেসে উঁচু বাধ নির্মাণ করা। বাধের সাথেই লাগোয়া ওদের বাড়ীটা। ছোট কাল থেকে কখনো কোন ব্যপারে ওর মন উদাস হলে অপর্ণা ওই বাঁধটার উপর গিয়ে বসতো। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে মনে মনে সুখী হওয়ার প্রাথনা করতো।
সেভাবেই সব মেনে নিয়ে স্বামীর সংসারে সুখেই ছিল অপর্ণা। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস, বিয়ের এক বছরের মাথায় ওর স্বামী বাজার থেকে সাইকেলে করে বাড়ী ফেরার পথে এক বেপরোয়া ট্রাকের চাপায় মারা গেল।
ওর শ্বশুর শাশুড়ি, বাবা মা আত্মীয় স্বজন সবাই বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করে অপর্ণাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিল।
ঘটনার আকস্মিকতায় অপর্ণা চাক্ষুস ভাবে ভেঙে পড়ল না তবে নির্বাক হয়ে রইলো। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুর বাড়ীতে থাকার বিষয়টি নিয়ে সমাজের মানুষ দিনে দিনে সরব হয়ে উঠলো। মানুষের নানা কথা সহ্য করতে না পারাই অপর্ণাকে শ্বশুর বাড়ী ছেড়ে বাপের বাড়ীতে ফিরে আসতে হল। বাবা মা আর ওর আপনজনেরা ওকে অভয় দিয়ে বলল- তোকে চিন্তা করতে হবে না, তোর চেহারা সুরত ভাল, কিছু দিন গেলেই তোকে ভাল জায়গায় বিয়ে দেব।
অপর্ণা তেমনি ভাবেই নির্লিপ্ত রইল।

স্বামীর মৃত্যুর পর বাবার বাড়ীতে ফেরত আসার কিছুদিনের মধ্যে অপর্ণা ধীরে ধীরে বুঝল, সে মা হতে চলেছে। এমন সময় ওর মামারা যখন নতুন করে একটা বিয়ে ঠিক করল অপর্ণা তখন পেটে বাচ্চা থাকার কথাটা চুপি চুপি মাকে জানালো। সে কথা শুনে সবাই আঁতকে উঠলো।
–নিজেও মরল আর আমাদের মেয়েটাকেও মেরে গেল।
মামার এই নিষ্ঠুর মন্তব্যটা অপর্ণার একদম পছন্দ হল না এবং সে এ্যবরসান করার প্রস্তাবটা ঘৃণা ভরে প্রত্যাক্ষান করল। এরকম একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অপর্ণা ওর নিজের ভেতর থেকে এক অভূতপূর্ব জোর অনুভব করল।
আর সেদিন থেকে অপর্ণা বাড়ীর সবার চক্ষুশূল হয়ে একঘরো হয়ে গেল।
এমনি অবস্থায়, একদিন খুব প্রত্যুষে অপর্ণা বাড়ী ছেড়ে বের হয়ে প্রায় দশ মাইল দূরে পাহাড়ী এলাকায় উপজাতি অঞ্চলে অবস্থিত খ্রিষ্টান মিশনারি ক্লিনিকে গেল। লোকজনের কাছে জিগ্যেস করে করে ওখানে পৌছাতে বেলা প্রায় গড়িয়ে গেল। ততোক্ষণে ক্লিনিকের সবাই বাড়ী ফিরেছে। কেবল মাঝ বয়সী বিদেশী এক ডাক্তার টিনের ছাউনি দেয়া উঁচু মাটির মেঝে ও দেওয়াল বেষ্টিত ক্লিনিকের বারান্দায় আনমনে বসে।
অপর্ণা কোন রকমে মাটির উঁচু বারান্দার একপাশে একটা বাশের খুটিতে হেলান দিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু পেটের ব্যথায় ওর মুখ দিয়ে ক্ষীণ স্বরে গোঙরানির শব্দ ডাক্তারের দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
ডাক্তার তাড়াতাড়ি উঠে ওর কাছে যেয়ে ওর মাথায় আলতো ভাবে হাত রাখল।
-কি হয়েছে মা তোমার?
অপর্ণা ডাক্তারের অতটুকু আদরের ভার সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ডাক্তার তাড়াতাড়ি ক্লিনিকের একজন আয়াকে ডেকে অপর্ণাকে ধরাধরি করে ক্লিনিকের বেডে শুইয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করলো।
অপর্ণার যখন জ্ঞান ফিরল তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। স্বল্প পাওয়ারের বাল্বের অপ্রতিভ আলোয় ও চোখ মেলে তাকাল।
-তুমি এত দুর্বল শরীর নিয়ে কেন একাকী এসেছ মা?
সেই দরদ ভরা কন্ঠ। অপর্ণার দুচোখ বয়ে অশ্রু বন্যা যেন বাধ ভাঙলো।
সপ্তাহ খানেক সেবা শুশ্রূষার পর অপর্ণা সুস্থ হয়ে উঠলো। ওর কাছ থেকে সব শুনে ডাক্তার বলল –এটা বিনা পয়সাই গরীব মানুষের চিকিৎসা কেন্দ্র, এখানে সবাই বলতে গেলে নুন্যতম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেবা প্রদান করে, তুমি চায়লে এখানে থাকতে পার, তোমাকে একটু ট্রেনিং দিয়ে দিলে তুমি আয়ার কাজ করতে পারবে। কিন্তু মা তোমার বাবা মাকে যে খবর দিতে হবে।
অপর্ণার বাবা আসলো। তাদের কথা না শোনার জন্য মেয়েকে তিরস্কার করল আর অপর্ণাকে তাদের পরিবারের তালিকা থেকে স্থায়ী ভাবে নামটা কেটে দিল।
অপর্ণা এক সপ্তাহের ট্রেনিঙের পর আয়ার কাজ শুরু করল। ওর একাগ্রতা আর কাজের প্রতি মমত্ববোধ সবার মন কাড়ল। ওদিকে ওর পেটে বাচ্চার অবস্থানটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগলো। সাথে সাথে ওর পেটের যন্ত্রণাটাও বেড়ে যেতে লাগলো।
ডাক্তার খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
-যাহোক, মুখপুড়ি এখানে এসে কোনরকমে নিজের জীবনটা বাচিয়েছে কিন্তু এখন দেখি ওর বাচ্চাটাকেও বাচান যাবে না আর সাথে সাথে বেচারির জীবনটাও সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে।
হেড আয়ার মন্তব্যে বিদেশী ডাক্তার চমকে উঠলেন।
-ও কথা বল না, তাহলে আমরা আছি কেন?
-আপনি নিজেই জানেন স্যার, ওর যে রোগ তার চিকিৎসা এদেশে নেই।
-অপর্ণাকে কিছু বলার দরকার নেই, ও যেমনি আছে তেমনি থাকুক। আমাকে একটু চিন্তা করার সুযোগ দাও। ডাক্তার বেকার হেড আয়াকে নিরাস্ত্র করলেন।

মাস খানেকের মধ্যেই ডাক্তার বেকার অপর্ণাকে দত্তক মেয়ে হিসেবে গ্রহন পূর্বক ওর সমস্ত কাগজপত্র তৈরি করে ওকে আমেরিকায় নিয়ে গেলেন চিকিৎসার জন্য।
অপর্ণাকে ওদেশে রেখে মাস ছয়েক পর ডাক্তার বেকার এদেশে ফেরত আসলেন।
-অপর্ণার একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তান হয়েছে। ওরা আমার বৃদ্ধ বাবা মায়ের সাথে ভাল আছে। মেয়েকে পেয়ে আমার বাবা মা খুব খুশী।
ডাক্তারের কথা সেদিন হেড আয়া নিমগ্ন হয়ে শুনেছিল। তারপর অনেকগুলো মাস বছর কেটে গেল। ইতিমধ্যে সেবা কেন্দ্রের প্রসারের জন্য নতুন জমি ক্রয় করা হয়েছে। অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি সহ চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থার আর্থিক সহায়তাই পাঁচশো বেডের বিশাল হাসপাতাল নির্মাণের কাজটাও প্রায় শেষের দিকে।
পড়ন্ত বিকেলে প্রৌঢ়ত্বের ভারে নুইয়ে পড়া ডাক্তার বেকার আর হাসপাতালের সবচেয়ে পুরনো মুখ হেড আয়া হাসপাতালের বারান্দায় বসে অপর্ণাকে নিয়েই আলোচনা করছিলেন।
-অপর্ণার কপালটা দেখেন স্যার। গ্রামের বকাটে ছেলেদের হাত থেকে সুন্দরী মেয়েকে রেহায় দেয়ার জন্য ওর বাবা মা অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিল, বছর না গড়াতেই ওর স্বামী এক্সিডেন্টে মারা গেল, অল্প বয়সে বিধবা হলে ওর বাবা মা ওকে আবার বিয়ে দেতে চায়লো কিন্তু ওর গর্ভে বাচ্চা আসাই ওরা ওকে বিয়ে দিতে পারল না। মুখপুড়ি এখানে আসার পর ওর পেটের বাচ্চাটা এমন একটা রোগ বাধাল যে তার চিকিৎসা এ দেশে সম্ভব না তাই তাকে বিদেশে পাঠানোর দরকার হল। আর ওদেশে চিকিৎসা করাতে হলে ওর একটা পরিচয় প্রয়োজন, আর সেজন্য আপনি ওকে মেয়ে হিসেবে দত্তক নিলেন।
হেড আয়া যেন এক নিঃশ্বাসে সব বলে থামল। -এতগুলো আপাতদৃষ্টিতে দুর্ভাগ্য অপর্ণাকে আজ যেখানে আছে সেখানে পৌঁছে দিল। এগুলো কি কাকতালীয়!
-না, কাকতালীয় না। ডাক্তার বেকারের কথায় হেড আয়া তাকাল তার দিকে।
-আমি অপর্ণাকে যেদিন দত্তক কন্যা হিসেবে গ্রহন করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে ওকে জানিয়ে বললাম –কথা দিচ্ছি তোমার জন্য আমি আমার সাধ্যের মধ্যে যা আছে তার সব কিছু করব। বল তুমি কি চাও? অপর্ণা শুধু বলেছিল যে –ও কেবল একটু শান্তি চায়।
ওর কথা শুনে বুঝেছিলাম ও যেটা চায় সে বিষয়ে ওর ধারণাটা একদম পরিষ্কার। কিন্তু কি পেলে ও সুখি হবে, শান্তি পাবে সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব ও নিজে না নিয়ে সে ভার যিনি দেবেন তাঁর উপর ন্যাস্ত করলো।
-তুমি তো জান, অপর্ণা আমার পূর্ব পরিচিত ছিল না তবে ওর দুর্দশার কথাগুলো আমার কাছে খুব জানা ঘটনা মনে হয়েছিল। বাচ্চা পেটে থাকা অবস্থায় আমার স্ত্রী গাড়ী এক্সিডেন্ট করে মারা যায়। দুর্ভাগ্যটা মেনে নিয়ে জীবন পুনরায় শুরু করা আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিল। আমি সম্পূর্ণ রুপে ভেঙ্গে পড়ে অপর্ণার মত জীবনে একটু শান্তি খুঁজছিলাম। কিন্তু আমি সত্যিই জানতাম না কি পেলে শান্তি পাব।
-শান্তির একমাত্র উপায় নিজেকে ভুলে থাকা আর সেটার জন্য সহজ উপায় হল- বিপদে পড়া মানুষদের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করা।
বাবার কথাই আশস্থ হয়ে আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে খোঁজ পেয়ে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই আমার এদেশে আসা। অপরকে একটু শান্তি দেয়ার মধ্যেই আমি শান্তি খুজে চলেছি।
-আমি আমার মা বাবার একমাত্র সন্তান, অপর্ণাকে পেয়ে আমার বৃদ্ধ বাবা মা যার পর নেই খুশী হয়েছিল। অপর্ণা আর তার ছেলে আমার বৃদ্ধ বাবা মায়ের একাকী জীবন পরিপূর্ণ করে তাদেরকে শান্তিতে চোখ বন্দ করতে সহায়তা করেছে।
অপর্ণা আমার মত কেবল শান্তির প্রত্যাশা করেছিল। আমরা দুটি প্রান সব হারিয়ে না চাওয়া প্রাপ্তি আমাদের জীবন পরিপূর্ণ করেছে।
আমি এখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে এ দেশটাকে আপন করে নিয়েছি। আর অপর্ণা ওদেশকেই নিজের করে নিয়েছে। বাবা মা চলে যাওয়ার আগে সব সম্পত্তি ওকেই উইল করে দিয়েছে।
জায়গাটা পাহাড়ী প্রায় দশ একর জমির মাঝামাঝি একটা উঁচু পাহাড়ের চুড়াই নির্মিত ওর ম্যানসনটা।
অপর্ণার ছেলেটা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, তার নিজের একটা বিজনেস ফার্ম আছে যেখানে প্রায় পঞ্চাশ জনের মত মানুষ কাজ করে। ছেলেটা ওরই ক্লাসমেটকে ভালবেসে বিয়ে করেছে, বউটাও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং ওরা দুজন মিলেই ব্যবসাটা চালায়।
অপর্ণা একটা দাতা সংস্থার সাথে জড়িত যারা তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে দারিদ্র বিমোচন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে সহায়তা প্রদান করে। বর্তমানে এই সেবা কেন্দ্রের প্রধান আর্থিক সাহায্য তার সংস্থাই করে থাকে।
হেড আয়ার সাথে আলাপ করতে করতে দুজনেই হারিয়ে গিয়েছিল।
অদুরেই সুউচ্চ ক্রেনের দ্বারা বহুতল হাসপাতাল ভবনে ভারী জিনিসপত্র উঠানোর শব্দে ওরা সম্বিত ফিরে পেল।

Category: Meaning of Life

Write a comment