মানুষটার বয়স কেউ বলে একশো দশ পনেরো আবার অন্যরা বলে তার থেকেও বেশী। সে যাই হোক, তবে তার বয়স নিশ্চিত ভাবে বলা যায় একশোর অনেক উপরে। এই মানুষটি দ্বীপের একেবারে নদীর গা ঘেসে বিরাট একটা অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে নিজের ঘরটা বেঁধেছে।
তিনি বলেন- আমি বিধাতাকে দেখতে পাইনা, কিন্তু সব সময় তাঁর অভাব বোধ করি।
তিনি নৃতত্ত্ব বিদ্যায় পড়াশোনা করে আমেরিকান এক ইউনিভারসিটিতে আইনস্টাইন কে নিয়ে গবেষণা করেছেন। ত্রিশ বছর বয়েসে বিদেশে চাকরী ছেড়ে দিয়ে এ তল্লাটে এসে এই নির্জন দ্বীপে একাকী বসবাস শুরু করেন।
জায়গাটা গভীর পাহাড়ি জঙ্গলের ধার ঘেসে বয়ে যাওয়া নদীর বুকে জেগে ওঠা বিশাল একটা দ্বীপ। দূরদূরান্ত থেকে আসা জেলে আর মাওয়ালিদের দল নদী আর জঙ্গলে কাজ শেষে এই দ্বীপে অস্থায়ী ভাবে অবস্থান করত। সে সময় ওই একাকী মানুষটা ওদেরকে খাবার পানি সহ যথা কিঞ্চিৎ আতিথেয়তা করত এবং তাদের সাথে নানা জীবন ঘনিষ্ঠ আলাপ আলচনা করত।
তারপর দিনে দিনে মানুষ এখানে বসতি স্থাপন করে গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে।
শ্বেত শ্মশ্রু আর ঝাকড়া কেশ ধারী এই ছিপছিপে গড়নের শতায়ু মানুষটাকে সকলে সুফি দরবেশ আর গ্রামটাকে দরবেশপুর বলে আখ্যায়িত করে থাকে।
বর্তমানে এখানে হাজারের মত মুলত জেলে আর মাওয়ালি পরিবার বসবাস করে। এখানকার মানুষ ভাবে তারা সবাই খুব সুখ শান্তিতি আছে, তাদের মনে অতৃপ্তি বলে কিছু নেই।
-এ পৃথিবীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা কি? একবার এক সাংবাদিক আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন।
-পৃথিবীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, আপনি কি বসবাসের জন্য একটা শান্তিপূর্ণ, সুখী, প্রাচুর্যে ভরা পৃথিবী চান, অথবা আশংকাযুক্ত, ভীতিপ্রদ, আকালে ভরা পৃথিবী চান?
আইনস্টাইন জবাব দিলেন।
সাংবাদিক বিহ্বল হয়ে জিজ্ঞেস করল –এটা কি ভাবে পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন?
উত্তরে আইনস্টাইন বলেছিলেন –কারণ আপনি সেটা কামনা করেন, সেটাই সৃষ্টি করেন।
বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনের আশাবাদ অনুসরন করে আজকে যিনি দরবেশ বলে পরিচিত তিনি এ জনমানব শূন্য প্রান্তরটিকে বেছে নিয়েছিলেন প্রকৃত শান্তির আধার একটি ক্ষুদ্র ভূস্বর্গ প্রতিষ্ঠা করবেন বলে। তাঁর বিবেচনায় আধুনিক সমাজ শান্তিকে বস্তুগত পণ্য বিবেচনা করে সেটা অন্বেষণে মরিচিকার পিছনে ছুটে চলেছে। তিনি চান মানুষ তা থেকে পরিত্রাণ পাক।
শরীর নিয়ে জন্মগ্রহনের পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সময়টুকুতে যা কিছু ঘটে তার সবকিছু, হয় শারীরিক নয় মানসিক। যা কিছু শরীর তার সবকিছুই সময়ের গন্ডিতে বাঁধা। শরীরটাকে যতই যত্ন নেয়া যাক না কেন একটা সময়ের পর তা দুর্বল হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে দুঃখের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। সুখের সময়টুকু একদিন যেমন শেষ হয়ে যায় তেমনি দুঃখেরও। নিরিবিচ্ছিন্ন সুখ বা দুঃখ বলে কিছু নেই।
সকল সুখের ঘটনা বা বিষয় একটা সময়ের পর অস্বস্তিতে পরিণত হয়ে দুঃখ দিয়ে শেষ হয়ে যায়। আর শেষে দুঃখের অতিসহ্য হলে মৃত্যু দিয়ে শেষ হয়।
অপ্রতিরোধ্য এক মায়ার টান পৃথিবীতে মানুষকে আচ্ছন্ন করে সীমা পরিসীমা সম্পর্কে এক ধরণের অজ্ঞানতা এনে দেয়। আর সেটাই মুলত সব দুঃখের কারণ। দুঃখটা প্রকৃতপক্ষে শারীরবৃত্তীয়। আকাঙ্ক্ষা এক ধরনের মোহজাল আর এটাই জীবনকে জটিল করে তোলে।
সুখ বা দুঃখ বস্তু নির্ভর কিন্তু শান্তিটা নির্ভেজাল অনুভব। বস্তুগত সব কিছু কম বেশী আর ভাল খারাপে পরিমাপ করা যায়, যা অর্জন করতে হয়। কিন্তু অনুভভটা আত্মার বিষয়, এটার জন্য শুধু আত্মার কথা শুনতে হয়। এটা জ্ঞানের নয় ধ্যানের বিষয়।
মৃত্যু পথযাত্রী মানুষও শান্তিতে চোখ বুঝতে পারে যদি সে সৃষ্টির এ অমোঘ বিধান মেনে নেয় যা পার্থিব সব রকম দুঃখের সমাপ্তি ঘটায়।
এখানকার বসতিগুলো গড়ে উঠেছে স্বাভাবিক নিয়মে।
দ্বীপের উর্বর জমি, নদী আর জংগল মানুষের শারীরিক ক্ষুধা মেটায়। উন্মুক্ত প্রান্তর বিস্তৃত নদী আর জংগল মানুষের বিনোদনেরও ব্যাবস্থা করে।
দ্বীপের একটি বড় অংশ জুড়ে ঔষধি গাছের বাগান। কালে কালে এগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে বেশ কিছু ভেষজ চিকিৎসক তৈরী হয়েছে। এখানকার মানুষের সব রোগের নিরাময় হয় সেখান থেকে।
দরবেশ বলেন আধুনিক মানুষ রোগ আর মৃত্যু এ দুটোকে এক পাল্লায় বিচার করে রোগের মত মৃত্যু থেকেও পরিত্রাণ কামনা করে। আর সেটাই অশান্তির অন্যতম উৎস।
এখানকার মানুষের মধ্যে জন্মগত ভাবে বস্তুগত জিনিসের উপর অধিকার বোধ ঢিলে ঢালা। এখানকার মানুষ সুখে দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মাঝে শান্তি অন্বেষণ করে। নেয়া নয় দেয়ার মধ্যেই এরা শান্তি পায়।
কারো কলা গাছে কাধিটা বড় আকারের হলে বা কোন ছাগল একসাথে তিন চারটা বাচ্চা প্রসব করলে গ্রামের লোক দল বেধে সেখানে জড় হয়ে আনন্দ করে।
গ্রামের কোন মানুষ অসুস্থ হলে ওরা বাইরের কোন ডাক্তার ডাকে না, আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করার চেষ্টা করে। শরীরের কোন কাটা ছেঁড়া করা এখানকার মানুষদের খুব অপছন্দ। সাধ্যমত চেষ্টার পর মৃত্যুটাকে তারা স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে গ্রহন করে।
কোন পরিবারের কেউ মারা গেলে পুরো গ্রামবাসী মৃতের বাড়ীতে জড় হয়ে মৃত মানুষটির অভাবে পরিবারের উপর নেমে আসা আর্থিক সব চাহিদা সম্মিলিত ভাবে পুরো করার চেষ্টা করে। তাতে করে পরিবারটির পক্ষে মৃত মানুষটির অভাব ভুলে থাকার সহায়ক হয়।

গাড়ী থেকে নেমে প্রায় ঘন্টা তিনেকের মত সরু আঁকা বাঁকা নদী দিয়ে ডিঙি নৌকায় করে আসার সময় ওই গ্রামের বাসিন্দা পরান মাঝির কাছ থেকে কথাগুলো শুনতে শুনতে দরবেশপুরের ঘাটে এসে নামলাম।
বেলা তখন গড়িয়ে নদীর ওপারে জংলা পাহাড়ের সারির আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। এরই মধ্যে তারাভরা মেঘমুক্ত আকাশের মাঝখানে অর্ধ গোলাকার রুপালি চাঁদটা জ্বলে উঠেছে।
পরান মাঝির কাছ থেকেই জানতে পেরেছি দরবেশ পুরের প্রতিটি বাড়ীতেই মেহমান খানা আছে। দরবেশপুর বাসী সবাই মেহমানদারী পছন্দ করে। তারা যা খায় মেহমানকেও তাই খেতে দেয়। আর নিকট প্রতিবেশীরাও মেহমানদের পালা করে আপ্যায়ন করে।
পরান মাঝি আমার মেহমানিত্ব করার দায়িত্ব নিজ থেকেই গ্রহন করল।
টিনের ছাউনি দেয়া পাকা দেয়ালের বাড়ী পরান মাঝির। দুটো ছেলেমেয়ে। মেয়েটা বড়, ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে ওই গ্রামেই বিয়ে হয়েছে তার। ছেলেটা শহরের কলেজে পড়ে। ছুটিতে এখন বাড়ীতে আছে, নাম শান্ত।
পরান মাঝি ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে শান্তই আমাকে সালাম করে ওদের উঠানের এক পাশে নির্মিত একটা ঘরে নিয়ে গেল।
গাছপালা ঘেরা আঙ্গিনাটা। তারি ফাক ফোকড় দিয়ে শরতের চাঁদ উঁকি ঝুঁকি মারছে। মৃদু মন্দ বাতাসে গাছের ছায়াগুলো উঠানে আর ঘরের চালে দুলছে। ইতিমধ্যের সৌর বিদ্যুতের আশীর্বাদে দু একটা বাতি জ্বলতে শুরু করেছে।
-চলুন আপনাকে গ্রামটা ঘুরে দেখিয়ে নিয়ে আসি।
ঘরের মধ্যে হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে শান্তর আমন্ত্রণে ওদের কল পাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে নিয়ে ওর আনা এক গ্লাস লেবু পানির সরবত খেয়ে শেষ করতেই কথাটা ও আমাকে বলল।
কয়েক ঘন্টা নৌকাই বসে হাত পা অবস অবস লাগছিল। তাই ওর প্রস্তাবে সাই দিয়ে বেরুলাম আমরা দুজনে।
ততোক্ষণে কর্মক্লান্ত সব মানুষ ঘরে ফিরেছে।
আমাদের নিজেদের সম্পর্কে প্রাথমিক ভাবে কিছু কথাবার্তা বলার পর দুজনই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে শুরু করেছি।
ততোক্ষণে হাটতে হাটতে আমরা নদীর পাড়ে চলে এসেছি। বসলাম একটা উঁচু টিবির উপর।
সামনে মায়াবী জ্যোৎস্না স্নাত নদী কুল কুল শব্দে বয়ে চলেছে যা ইন্দ্রিয়গুলোকে আস্টে পিষ্টে জড়িয়ে ধরে মনকে উদাস করে দেয়। আর ওপারে রহস্যাবৃত কাল ইন্দ্রিয় অভেদ্য পাহাড় জঙ্গল হৃদয়ের পিপাসা বাড়িয়ে দেয়।
-ভাবছি ডিগ্রি পাশ করার পর এখানেই ফিরে এসে এখানকার স্কুলে শিক্ষকতা করবো।
-কেন বলত?
-আমরা জীবনে এত শিক্ষা দীক্ষা লাভ করি বা ধণ সম্পদ উপার্জন করি শান্তি লাভের উদ্দেশে। সে শান্তি আমরা এই দরবেশপুরে প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রশান্তিতে ভরা আমাদের এ গাঁ।
আমারা দুজন বসে পাশাপাশি।
-শান্তিটা একটা বোধ। আমি চাই মানুষ শান্তির স্বরূপটা বুঝুক। অযথা আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে জীবনটাকে মোহাচ্ছন্ন না রেখে জীবনটা সহজ ভাবে যাপন করার কথা আমি মানুষকে শিখাতে চাই। সরলতা আর শান্তি হাত ধরা ধরি করে চলে।
আমি তাকালাম এই অল্প বয়সি যুবকের দিকে। আলো আধারিতে স্পষ্ট দেখা না গেলেও আমি ওর মুখাবয়বে তৃপ্তির স্ফুরন আঁচ করলাম।
সে বলতে লাগলো –মৃত্যুশয্যায় আলেকজান্ডারের তিনটি অভিপ্রায় পূরণের অনুরোধের কথাগুলো দরবেশ বাবার কাছ থেকে শুনে আমাদের মনে গেথে গেছে।
কথা বলার সময় তার দেহ ভঙ্গিমায় আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠছিল।
শান্ত বলতে শুরু করল;প্রথম অভিপ্রায়, মৃত্যুর পর শুধু চিকিৎসকরা আমার কফিন বহন করবেন। দ্বিতীয় অভিপ্রায়, আমার কফিন যে পথ দিয়ে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই পথে কোষাগারে সংরক্ষিত সোনা, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান পাথর ছড়িয়ে দিতে হবে। শেষ ইচ্ছা, কফিন বহনের সময় আমার দুই হাত কফিনের বাইরে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শান্তর কথা শুনতে লাগলাম।
-আলেকজান্ডারের একজন প্রিয় সেনাপতি তার অভিপ্রায় পূর্ণ করা হবে আশ্বাস দিয়ে এমন অদ্ভুত অভিপ্রায়ের কারন ব্যাখ্যা করার অনুরোধ করল।
-আলেকজান্ডার বলতে শুরু করলেনঃ
-আমার চিকিৎসকদের কফিন বহন করতে বলেছি এ কারণে যে, যাতে লোকে অনুধাবন করতে পারে চিকিৎসকরা আসলে কোনো মানুষকে সারিয়ে তুলতে পারেন না। তাঁরা ক্ষমতাহীন আর মৃত্যুর থাবা থেকে কাউকে রক্ষা করতে তারা অক্ষম।
-গোরস্থানে যাওয়ার পথে সোনা-দানা ছড়িয়ে রাখতে বলেছি কারণ মানুষকে এটা বোঝাতে যে, ওই সোনা-দানার একটা কণাও আমার সঙ্গে যাবে না। আমি এগুলো পাওয়ার জন্য অযথা সারাটা জীবন ব্যয় করেছি কিন্তু নিজের সঙ্গে কিছুই নিয়ে যেতে পারছি না। মানুষ বুঝুক ধন সম্পদের পেছনে ছোটা সময়ের অপচয় মাত্র।
-কফিনের বাইরে আমার হাত ঝুলিয়ে রাখতে বলেছি মানুষকে এটা জানাতে যে, খালি হাতে আমি এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, আবার খালি হাতেই পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছি।
প্রশান্তিতে ভরপুর শান্তর কথা শুনতে শুনতে কখন যে অর্ধ গোলাকার চাঁদটা আধারে মুহ্যমান পাহাড়ের পিছনে ডুব দিয়ে ওপারের সাথে এপারকে মিশিয়ে একেকার করে দিয়েছে আর ভোরের সূর্য পুনরায় ভিন্নতাই ভরা আরো একটা নতুন দিন শুরু করার জন্য উঁকি ঝুঁকি দিতে শুরু করেছে খেয়াল করিনি।
-দরবেশ বাবা ওপারের মত অভেদ্য রহস্যাবৃত। ওপারটা সব সময় অদেখাই থাকে, রাতের আঁধার এপারটকে ঢেকে দিয়ে এপার ওপার দুপারকে একই অভিন্ন সমতলে নিয়ে আসে। যেমন চোখ মেলে থাকলে আলো আর কালো দুটোই চোখে পড়ে কিন্তু বন্দ করলে সব ভেদাভেদহীন একই অভিন্ন জগত।
শান্তর কথায় যেন সম্বিত ফিরে পেলাম।

Category: Meaning of Life

Write a comment