-ওঠো, তাড়াতাড়ি ওঠো, বাতিটা জ্বালাও।
গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে নাসরুদ্দিন হোজ্জা ধড়ফড় করে উঠে পাশে ঘুমন্ত স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে উঠালেন।
-এত রাতে আবার কি হল?
বিরক্তিতে ভরা স্ত্রীর কন্ঠ।
-আরে উপর থেকে বাণী এসেছে, লিখে রাখতে হবে, বাতি জ্বেলে শিগ্রি কাগজ কলম দাও।
ততোক্ষণে স্ত্রীর ঘুম ভাল ভাবে ভেঙেছে। তিনি বাতি জ্বালিয়ে কাগজ কলম দিলেন।
কাগজে কিছু একটা লিখে হোজ্জা এক মিনিট না যেতেই হাই তুলে বাতি নিভিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন।
-সে কি কথা, কি লিখলে বল?
ঘুম কাতুরে হোজ্জা ততোক্ষণে বিছানায় গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
তার স্ত্রী কাগজটা হাতে নিলেন কি লিখেছে পড়ার জন্য।
-‘তুমি যেখানে যাও, সেখানেই থাক’।
এ লেখার মাথামুন্ডু কিছুই তিনি বুঝলেন না। অগত্য কি করা তিনিও বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
দুজনেই ঘুমের কোলে মুহ্যমান। হোজ্জা তার উপলন্ধিটা হৃদয়ঙ্গম করে নিশ্চিন্ত মনে আর তার স্ত্রী কথাটার কিছুই না বুঝেই বিরক্ত মনে।
কিন্তু এই ছোট্ট কাহিনী পড়ার পর আমি চোখ দুটো এক করতে পারলাম না। কারণ কথাটার আগা মাথা আমিও কিছুই বুঝলাম না।
সারা রাত ধরে তা নিয়ে আকাশ কুসুম কল্পনা করতে করতে ভোর রাতের দিকে চোখ দুটো নিজের থেকেই একটু বুজে আসলো।

প্রায় দুশো বছরের পুরনো আমাদের বংশ। আমার পিতৃপুরুষের ভিটের সন্মুখ ভাগে চারদিকে উচু পাড় বাধানো প্রকান্ড একটা দীঘি। শুনেছি আমাদের বংশপিতা মূল গ্রাম ছেড়ে এই বিচ্ছিন্ন ফাঁকা জায়গায় কি এক স্বপ্ন নিয়ে বসত বাড়ীটা স্থাপন করেছিলেন। আর সে সময় এই দীঘিটার মাটি দিয়েই প্রায় দশ একরের মত ভিটে বাড়ীটার সব ডোবা গর্ত বন্দ করে সমান করা হয়েছিল।
এখন বাড়ীতে আর তেমন কেউ থাকে না।
পূর্ব পশিম লম্বা আয়তকার দীঘিটার উত্তর পাড়ে সিড়ি বাধানো প্রশস্ত ঘাট। বাড়ীতে আসলে একাকীত্ব ঘুচাতে ওই ঘাটটার উপর বসি।
সময় কাটানোর জন্য সাথে করে খবরের কাগজ আর বেতের ছোট টুকরীতে করে চিড়ে মুড়ি নিয়ে আসি, নিজেও খাই আর মাঝে মাঝে তার থেকে কিছু কিছু জলে ফেললে মাছগুলোও খায়।
মর্মর পাথর দিয়ে বাধানো ঘাট, ব্যবহার না হতে হতে এখন মরার মত লাগে। সামনে প্রকান্ড দিঘীর হালকা আকাশী জলে মৃদু মন্দ বাতাস প্রতিনিয়ত জলকেলি খেলে। এছাড়া মাছের লাফালাফি, হাটু জলে দাঁড়ানো লম্বা ঠ্যাঙের সাদা বক আর মাছরাঙা পাখীর অবিরাম কর্ম তৎপরতার আশীর্বাদে জীবন্ত সবকিছু।
এখানে নিজেকে একটুও হারানোর উপায় নেই। কোন সময় একটু হারিয়ে গেলেই মাঝে মধ্যেই ঘাটের উপর হুমড়ি খেয়ে দাঁড়ানো বুড়ো শিমুল গাছটা থেকে ফুল খসে একদম গায়ে পড়ার উপক্রম হওয়ার ঘটনা নিজেকে বর্তমানে ধরে রাখার যেন এক অভিনব ব্যবস্থা।
এখানে সব জীবন্ত, বর্তমানের একচ্ছত্র প্রাধান্য। অতীত আর ভবিস্যৎ এখানে যেন অপ্রাসঙ্গিক।
কিন্তু মনের দৌরাত্বের কাছে হার মেনে জলের উপরের কর্ম চাঞ্চল্যতা দেখতে দেখতে মনের অজান্তে জলের তলে ডুব দিয়ে ছোট বেলার ডুব সাতারের স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে যায় প্রায়শই।
ঘাটের পিছনটাতে বেশ কিছুটা উঁচু সমতল জায়গা, তারই গাঁ ঘেঁসে সরু একটা পিচ ঢালা পথ। সে পথ ধরে গ্রামের মানুষ শহরে যাওয়ার পাকা রাস্তাই যাতায়াত করে। মাঝে মধ্যেই যাতায়াতরত মানুষের কেউ কেউ পিছন থেকে এসে ডেকে আমাকে ডুব থেকে উঠাই।
এদের কেউবা পাশে এসে বসে, আবার কেউ কেউ পিছনে দাড়িয়েই কথা বলে চলে যায়। সবাই চেনা জানা- অল্প আর বেশী আর কি।
কিন্তু সেদিন এক অচেনা শ্বেত শুভ্র চুল দাড়িতে ভরা শতবর্ষী বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে পিছনে এসে দাঁড়ালো।
ফিরে তাকালাম।
বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুব্জ হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি। স্মিত হাসিতে ভরা মুখখানি, যেন কত দিনের চেনা, কত আপন।

-কোথাই যেন দেখেছি তাকে! মনে করতে চেষ্টা করতে লাগলাম।
বৃদ্ধকে ওখানে দাড় করিয়ে রেখেই অতীত স্মৃতি ঘাটতে হারিয়ে গেলাম। আমার সত্তর বছরের যাপিত জীবনের পাতাগুলো উলটিয়ে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
দেশ বিদেশ, কৈশোর যৌবন বার্ধক্য, সেই সাথে ভবিষ্যৎ সব জায়গায় বিচরণ করতে লাগলাম।
তেমনি স্মিত হাসি ভরা মুখে বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। সেটা কেবল মাঝে মাঝে পলক ফেলার মত নজরে আসছে। অনেকটা ত্রুটিপূর্ণ সুইচের মত। কিছুক্ষন পর পর কানেকশান পেয়ে যেন বাল্বটা হটাৎ হটাৎ করে জ্বলে আবার নিভে যায়।
আমি অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝে ডুবে থাকলে কি হবে এদিকে বর্তমান ঠিকই তার কর্ম চাঞ্চল্যতা চালিয়ে যেতে ব্যস্ত।
এরই মধ্যে আমার অলক্ষে মাছ রাঙা পাখীটা বেশ কয়েকবার ছোঁ মেরে মাছ ঠোটে করে পাখা ঝাপটিয়ে চলে গেল। পাড়ের ধারে হাটু ডুবিয়ে বকধার্মিকের মত লম্বা পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বকটা বেশ কয়েকবার শিকার ধরে ধরে গলা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে গলধকরন করলো। ঘাটের পাড়ে দাঁড়ানো শিমুল গাছ থেকেও কয়েকটা লাল টকটকে ফুল সিড়ির উপর আছড়ে পড়লো।
প্রকৃতির যে কার্যকলাপ দেখার জন্য দীর্ঘক্ষণ পাড়ে বসে থাকি, যে দৃশ্যগুলো আমার হৃদয় ছুয়ে যায়, আমি শারীরিক ভাবে উপস্থিত থাকলেও এই মুহূর্তে তার সব কিছুই আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেল।
কারণ সেগুলো সব বর্তমান। আমার আশে পাশে দৃষ্টি বা শ্রবন শক্তির মধ্যে ঘটলেও আমি নিজেকে বর্তমানে ধরে রাখতে না পারায় সবগুলো আমি মিস করলাম।

আমার এই থেকেও নেই অবস্থার সুযোগ নিয়ে একটা দুষ্টু শালিক পাখি এদিক ওদিক দেখে নিয়ে সন্তর্পণে পাশে রাখা মুড়ির পাত্র থেকে কয়েক ঠোকর নিয়েও গেল। আবার এরই মধ্যে সুযোগ বুঝে বাতাস একটা হেচকা টান দিয়ে খবরের কাগজটা নিচে ফেলে দিল আর হালকা বেতের তৈরী মুড়ির ঝাকাটাও মৃদু ধাক্কা দিয়ে উল্টিয়ে দিল।
সন্ধ্যার আজানের শব্দে সম্বিত ফিরে পেয়ে আমার সমুখে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের অস্তিত্ব আবিষ্কার করলাম। কতক্ষণ ওভাবে হারিয়ে ছিলাম তা ঠিক আন্দাজ করতে পারলাম না।
-দাদু ভাই, আজান হয়ে গিয়েছে, আমাকে যেতে হবে। তোমার সাথে জরুরী কিছু কথা ছিল, বলা খুব দরকার। দেখি সময় করে আবার আসবো।

আজান শুনে বৃদ্ধ চলে গেল। আর সে শব্দে আমারও ঘুম ভেঙ্গে গেল।
বুঝলাম স্বপ্ন দেখছিলাম।
স্বপ্নটা এখনো যেন জীবন্ত।
উঠে খোলা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ভোরের প্রথম আলোর কিরণ পড়ে সামনের সবুজ লনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর পাতার উপর ঝিকমিক করছে। ওরা যেন হাসছে সবাই।
ভোরে না উঠলে এ সৌন্দর্যটা বুঝার কোন উপায় নেই। যত সৌন্দর্য তার অবস্থান সব বর্তমানে। বাসি শিশির বিন্দু বা বাসি সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত বলে কিছু নেই। বর্তমানে না থাকলে সেগুলো সব হারিয়ে যায়।
তায়তো প্রাকৃতিক সমস্ত নির্মল সৌন্দর্য অবলোকন করবো বলে আমি আমার অতি প্রিয় ঘাটটাতে গিয়ে বসেও নিজেকে বর্তমানে ধরে রাখতে না পারাই তার সব কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

অধিকন্তু পাখীর ক্ষুধা নিবারণের তাড়না থেকে আমার মুড়ি বা বাতাসের স্বভাবজাত প্রবণতা থেকে আমার না পড়া খবরের কাগজকে বাচাতে ব্যর্থ হয়েছি।
সর্বোপরি আমার অতি চেনা মানুষ যাকে চোখে না দেখলেও তার ছবি অনেকবার দেখেছি, যার দান এই ভিটেই আমি বসবাস করছি তার মুল্যবান কথাগুলো শোনা থেকেও বঞ্চিত হয়েছি।
আমি যেখানে থাকি সেখানে নিজেকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছি।
তার জন্য কত কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছি, কত কিছু হারিয়েছি।
আমার শরীরটা সাথে নিয়ে ঘাটের উপর ঠিকই বসেছিলাম, কিন্তু মনটা ঘুরঘুর করছিল অতীত আর ভবিষ্যতে।
পার্থিব জগতে শরীর আর মন দুয়ে মিলে মানুষ, এ দুটোকে সব সময় এক জায়জায় ধরে রাখতে হলে নিজের উপর পুরপুরি নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। না হলে নিরেট শরীরকে রেখে মন তার পাচ সৈনিকের সব গুলোকে নিয়ে ভ্রমনে বের হবে অতীত আর ভবিষ্যতে।
এ অবস্থাই কোন কিছু সামনে বা ধারে কাছে কোথাও ঘটলে চোখ, কান বা নাক খেয়াল করবে না। বিস্বাদ কোন কিছুকে জিহবা যেমন আলাদা করবে না তেমনি চির ক্ষুধার্ত মশা পেট ভরে রক্ত চুষে নেবে।
কথাটা ভাবতেই বুক স্ফীত হয়ে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল।

নিজের মনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সামর্থ্য হওয়ার পর সে উপলব্ধি নাসরুদ্দিন হোজ্জাকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল। তিনি তার এত দিনের সাধনার ফল লাভ করে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। তার স্ত্রী তার কিছুই বুঝলেন না।
আর আমি ধ্যান ঘুমে সেটা উপলন্ধি করে জেগে উঠলাম।

Category: Meaning of Life

Write a comment