-কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি তুমি এখানে ইতস্তত ভাবে হাটাহাটি করে বিভিন্ন বেঞ্চে একটু একটু বসে সারা দিন কাটিয়ে দাও। তোমার মধ্যে যেন একটা অস্থিরতা কাজ করে। এখানে নিজের মানুষ জন বলতে কে কে আছে তোমার?
এই বিদেশ বিভুয়ে অচেনা জায়গায় সহানুভূতিশীল কন্ঠে কথাটা শুনে পিছন ফিরে তাকাল সদানন্দ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে লাঠিতে ভর করে দাঁড়ানো একজন অশতিপর বৃদ্ধ।
-তোমার পাশে একটু বসতে পারি?
সদানন্দ কিছুটা অবাক নেত্রে তার দিকে তাকিয়ে নদীর ধার ঘেসে তৈরি বেঞ্চটার এক দিকে একটু সরে বসলো।
-একটা বিষয় কি জান, সহজেই বোঝা যায় যে তুমি কিছু একটা খোঁজ যেটা এখানে নেই।
বৃদ্ধ বেঞ্চে বসতে বসতে কথাটা বলল।

মাস কয়েক হল, সদানন্দ সাত সমুদ্র পার হয়ে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে আছে। বলা যায় নিষ্ঠুর সত্যের কাছ থেকে পালিয়ে বাচার জন্য সদানন্দ এখানে এসেছে।
সদানন্দ নামটা ওর বাপ দাদার দেয়া নাম নয়। নিজেই নিজের নামটা দিয়েছিল যাতে ওর নামটা ওকে সর্বদা আনন্দে থাকার কথাটা মনে করিয়ে দেয়।
জীবনকে বুঝে উঠার প্রারম্ভে ও এ নামাটা বেছে নিয়েছিল নিজের জন্য।
সত্যি সত্যিই আনন্দে কেটেছে ওর জীবনটা। সব বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তার মধ্যেই শান্তি খুজতে খুজতে জীবনের এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
ছেলেটা ভাল লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়ে দেশ ছেড়ে এই বিদেশে এসে এখানে বসতি গড়েছে। ছেলেটা বাবা মাকে তাদের কাছে আনার জন্য বারবার তাগিদ দেয়া সত্বেও সদানন্দ তার স্ত্রীকে নিয়ে নিজ দেশে নিজ বাড়ীতে আনন্দেই ছিল।
কিন্তু বলতে গেলে একদম সময় না দিয়ে হটাৎ করে স্ত্রী বিয়োগের পর সদানন্দ সে শোক ভুলতে দেশ ছেড়ে এখানে ছেলের কাছে চলে এসেছে।
এটা ব্যস্ততা আর গতিময়তায় ভরা দুনিয়া। এখানকার অন্যান্য সবার মত তার ছেলে আর বউ দুজনেই সকালে উঠেই দৌড়তে দৌড়তে বেরিয়ে যায়। বলা যায় ওরা বাড়ীতে ফিরে আসে রাত টুকুর জন্য ঘুমতে।
পাহাড়ী অঞ্চল, বাসার কাছ দিয়ে এই খরস্রোতা নদী বয়ে চলেছে। ছেলে বউ বেরিয়ে গেলে বাড়ীটা একদম ফাঁকা হয়ে মৃত মনে হয়। একাকী মন বসে না তাই চলে আসে এই নদীর ধারে। বসে বা হাটাহাটি করে দিন কেটে যায়। এখানে নদীর স্রোত, পাখীর ডাক, বাতাস সব কিছুই যেন জীবন্ত। মনকে অতীত মুক্ত করে বর্তমানে ধরে রাখার উপযুক্ত স্থান।
-হ্যে হ্যে, বসুন না।
বৃদ্ধের বয়সটা সদানন্দের থেকে কম করে হলেও দশ বছর বেশি হবে নিশ্চিত।
-আমার ছেলে বউ থাকে এখানে আমি তাদের সাথেই থাকি।
সদানন্দের উত্তরে মৃদু হাসল বৃদ্ধ।
-আমি এখানে একা থাকি। মেয়েটা ওর পরিবার নিয়ে হাজার মাইল দূরে থাকে। তবে বলা যায় রোজ টেলিফোনে কথা হয়। যৌবনে আমি চাকরীর সুবাদে এসে এখানেই বসতি গড়েছিলাম। আমাদের মেয়েটার জন্ম আর বেড়ে ওঠা এখানেই।
বেশ লম্বা, ছ ফুটের সামান্য নিচে মেদহীন শ্বেতাঙ্গ মানুষটাকে বেশ প্রানবন্ত লাগলো সদানন্দের।
-একা থাকলেও আমি এখানে একাকী না। বলা যায় আমার পুরো যৌবনের স্মৃতি এখানে লুকিয়ে আছে। আমার স্ত্রী মেরির সাথে এখানেই পরিচয়। তারপর একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ে করি আমরা।
বৃদ্ধের আন্তরিকতা সদানন্দকে আকর্ষণ করল। আর সেটা প্রদর্শনের জন্য খুব আগ্রহ সহকারে তার কথা শুনে অল্প কথাই অংশ গ্রহণেরও প্রয়াস পেতে লাগলো।
-দেখ আমার কথাই বলে চলেছি, তা তোমার কথা বল।
-এখানে আমি আমার ছেলে বউ এর সাথে থাকি। পাশেই বার্চ ট্রি লেনে বাসা।
-আরে সেত আমারই লেনে। তা কোন বাড়ীটা তোমার? বলতে গেলে এখানকার সবাই আমার চেনা পরিচিত।
বৃদ্ধের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হল সদানন্দ।
-৯৯ নম্বর বাসা, আর আমার ছেলের নাম রবিন।
-রবিন মানে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার, ও তোমার ছেলে?
-তূমি চেন রবিনকে! উৎফুল্ল হল সদানন্দ।
-হ্যাঁ, আমার নাম জন, আমার কথা বল ওকে। ও খুব ভাল ছেলে, আমি ওকে পছন্দ করি, ওর স্ত্রীর জন্ম এখানেই। আমার মেয়ের থেকে বছর পাচ সাতেকের ছোট হবে। ওদের বিয়েতে আমি আর আমার স্ত্রী গিয়েছিলাম।
যতই কথা এগুতে লাগলো ততোই ওদের মধ্যে সম্পর্কটা ঘন হতে লাগলো।
-ওটাই বোধহয় মেরি মানে আমার স্ত্রীর শেষ কোন পার্টিতে যাওয়া।
দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস টানলেন বৃদ্ধ।
-প্রায় চার বছর হল মেরি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।
জন আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস টানল।
বেশ হৃষ্ট পুষ্ট একটা কবুতর এসে বসলো ওদের বেঞ্চের সামনে। জন পকেট থেকে কিছু খাবারের দানা বের করে ছিটিয়ে দিল। কবুতরটা কুট কুট করে খেতে লাগলো। মনে হল কবুতরটাকে খেতে দেয়ার প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল তার।
-দেখ এই কবুতরটাও আমার চেনা। আমাদের অনেক দিনের পরিচয়। মেরিকেও চিনত ও। আমি যে কোন বেঞ্চে বসি না কেন ও ঠিক সেখানেই হাজির হবে। এর আগে ওর একটা সাথি ছিল কিন্তু কিছু দিন ধরে ওকে একাকী দেখছি।
কবুতরটা খাবার গুলো খুটে খুটে খেয়ে লেজটা উচু করে বেশ কয়েকবার ঘুরে ঘুরে বাকবাকুম করল তারপর উড়ে চলে গেল।
-এই নদীতে নৌকা চড়া আমার এর মেরির প্রিয় একটা শখ ছিল। বিশেষ করে ইউক এন্ডে আমারা হাউজ বোট নিয়ে অনেক দূরে দূরে যেতাম। বোট নোঙ্গর করে রাত্রি যাপনের অনেক ব্যবস্থা আছে পাহাড়ের ভিতরে ভিতরে।
কথা বলতে বলতে অন্য মনস্ক হয়ে গেল জন।
-নদীর প্রতিটা বাকে মেরির সাথে আমার অনেক স্মৃতি লুকিয়ে আছে। তুমি বিশ্বাস করবে আমি সত্যি সত্যিই মেরিকে এখানে খুজে পায়। তায়তো আমার মেয়েটা অনেক পিড়াপিড়ি করা স্বত্বেও এ জায়গা ছেড়ে ওদের সাথে যায়নি।
জন ওর কাছে রাখা একটা ছোট্ট ব্যাগ থেকে ক্যাসুনাটের একটা কন্টেনার বের করে তার থেকে নিজে কিছু নাট তুলে নিয়ে কন্টেনারটা সদানন্দের দিকে এগিয়ে ধরল।
সদানন্দ ওর আন্তরিকতা অগ্রাহ্য করতে পারলো না।
-আমি সদানন্দ, রবিন আমার একমাত্র ছেলে, হটাৎ করে আমার স্ত্রী বিয়োগের পর সে যন্ত্রণা ভুলার জন্য আমি দেশ ছেড়ে, সব ছেড়ে এখানে এসেছি।
সদানন্দের কথাই জন তাকাল ওর দিকে।
-ছেলে বউ সকালে বেরিয়ে যাওয়ার পর একদম একাকী লাগে, আমার স্ত্রীর কথা বেশি করে মনে পড়তে থাকে, দম বন্দ হওয়ার মত হয়, আর তায়তো এখানে এসে বসি।
জন নিস্পলক নেত্রে কিছুক্ষন সদানন্দের দিকে তাকিয়ে থেকে কি যেন ভাবল। তারপর সদানন্দের কাছে আরেকটু ঘন হয়ে বসলো।
-আমার মত তুমিও তোমার জীবন সঙ্গিনীকে শারীরিক ভাবে হারিয়েছ কিন্তু স্মৃতিটা আমাদের মনে জীবন্ত আছে। আর আমরা দুজনই সেই স্মৃতির মধ্যে লুকিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চায়।
কথা বলতে বলতে বৃদ্ধ স্নেহভরে সদানন্দের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে টেনে নিল।
-হারানো কোন কিছু খুজে পেতে হলে তামাম দুনিয়া নয়, যদি সেটা পাওয়া যায় তবে যেখানে হারিয়েছে কেবল মাত্র সেখানেই পাওয়া যাবে অন্য কোথাও না। তাই জিনিসটি পেতে হলে যেখানে হারিয়েছে সেখানেই খুজতে হবে।
সদানন্দ জনের দিকে তাকিয়ে তার কথা সবটা বুঝতে চাইছিল।
-তানা হলে সে হারিয়ে যেখানে লুকিয়ে আছে সেখানেই যেতে হবে, কি বল?
স্মিত হাসল জন। ব্যপারটাকে হালকা করার জন্য।
-আমার কথাই ধরো না, আমার আর মেরির সব স্মৃতিই এই ছোট্ট শহরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে। তাইতো আমার স্মৃতি থেকে ও হারিয়ে যায়নি, ওকে আমি সব সময় খুজে পাই। মেরি কেবল আমার সাথে একটু লুকোচুরি খেলে এই যা।
-আমি বুঝতে পারি, মেরি এখানে আমার সাথেই আছে। তায়তো এ জায়গা ছেড়ে আমি আমার মেয়ের সাথে যায়নি।
জন উঠে দাঁড়ালো।
আমার বাসা ১০১, তোমার একটা বাসা পরেই। তুমি যেকোন সময় আসতে পার।
লাঠিতে ভর করে হাটতে হাটতে জন চোখের আড়ালে চলে গেল।হারানো কোন কিছু খুজে পেতে হলে তামাম দুনিয়া নয়, যদি সেটা পাওয়া যায় তবে যেখানে হারিয়েছে কেবল মাত্র সেখানেই পাওয়া যাবে অন্য কোথাও না। তাই জিনিসটি পেতে হলে যেখানে হারিয়েছে সেখানেই খুজতে হবে।
-তানা হলে হারিয়ে সে যেখানে লুকিয়ে আছে সেখানেই যেতে হবে, কি বল?
জনের কথাটা কানে বাজতে লাগলো সদানন্দের।

সন্ধ্যে প্রায় হয়ে আসলো। আকাশের তারা গুলো এক এক করে জ্বলে উঠতে শুরু করলো। নদীর ধার ঘেসে তৈরী চওড়া পেভমেন্টের উপর দাঁড়ানো ঝাকড়া গাছ গুলোতে দিন শেষে পাখীরা ফিরে এসে কিচির মিচির করতে লাগলো।

Category: Meaning of Life

Write a comment