দুদিন হল বাবা মারা গিয়েছে। বিদেশ থেকে আজ ভোরেই ফিরেছে জীবন। খবর পাওয়ার পর পরই প্লেনের টিকেট কিনে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসতে দুদিন লেগেছে।
-মৃত্যু যে কোন জীবনের অমোঘ বিধান, যার কোন দিন ক্ষন আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। আমার মৃত্যু যেন তোমাকে কোন ভাবেই বিচলিত করে তোমার কর্ম তৎপরতায় কোন ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। আমার মৃত্যুর পর কারো জন্য অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব আমার মৃত দেহকে যেন সমাহিত করা হয়। আমি সব সময় তোমার সঙ্গেই থাকব খোকা। আমার কবরে এসে অযথা কান্নাকাটি করবে না কারণ আমি সেখানে থাকব না।
বর্ষা কাল, সকাল থেকেই বৃষ্টি ঝরছে। তারই মধ্যে বাড়ী পৌঁছেই বাবার কবরের কাছে গিয়েছিল জীবন। কববের মাটি তখনো আগলা আর ঘাস লতা বিহীন। বাবার কথাগুলো জীবনের কানে বেজেছিল কিন্তু তবুও কিছুতেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি সে।
চার দিক উচু প্রশস্ত বারান্দা ঘেরা শত বছরের পুরনো বাড়ী। প্রায় ত্রিশ একর জমির উপর গাছ গাছালিতে ঘেরা পিতৃ পুরুষের ভিটে ওদের। ওর পরদাদা বাড়ীটা বানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওর দাদা বাবারা কেউই এখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস না করলেও সবাই ভিটে বাড়িটা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করে যুগোপযোগী করে রেখেছেন।
আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও প্রকৃতি এখানে জাগ্রত এবং কথা বলে।
বাবার মত দাদুও শেষ জীবনে নিজ বাড়ীতে ফিরে এসে বসবাস শুরু করেন আর এখানে মৃত্যু বরন করে নিজ পারিবারিক গোরস্থানে চিরনিদ্রাই শায়িত আছেন।

উচু বারান্দায় পাতা ইজি চেয়ারে গাটা এলিয়ে দিয়ে কথাগুলো ভাবছিল জীবন।
হটাৎ করে ওর খেয়াল হল প্রায় চল্লিশ বছর আগে এই দিনেই ওর দাদা মারা গিয়েছিলেন এই বাড়ীতেই। তখন ও বেশ ছোট। দাদুর মৃত্যুর দুদিন পর বিদেশ থেকে এসে বাবার হাত ধরে ওদের পারিবারিক গোরস্থানে যাওয়ার সে দৃশ্যটা আবছা ভেসে উঠছে ওর মনে।
-বাবাকে দাদুও পড়াশোনার করার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে বাবা ওদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে ওখানেই বসবাস শুরু করে। তারপর আমি বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর বাবা তার পিতৃপুরুষের ভিটেই ফিরে আসে।
আমার মত বাবাও দাদুর একমাত্র সন্তান।
শুনেছি দাদু নিজ অঞ্চলেই ব্যবসা বাণিজ্য করে অনেক টাকা উপার্জন করেছিলেন। তিনি মুলত ব্যবসাটা তার বাবার অর্থাৎ আমার পর দাদার কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
তিন পরুষের জীবন কালে ধীরে ধীরে তাদের জ্ঞানের পরিধি এবং আর্থিক সামর্থ্যতা বাড়ার সাথে সাথে তাদের আকাঙ্ক্ষা বাড়তে বাড়তে দেশের সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
ইজি চেয়ারে শুয়ে শুয়ে কথাগুলো চোখ বুজে ভাবছিল জীবন।
-দেখ বাবা এখন স্পেস সায়েন্সের যুগ, মানুষের জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্র এখন পৃথিবী ছেড়ে ঊর্ধ্বাকাশের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
-এ ভাবেই বাবা আমাকে যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে স্পেস সায়েন্সে পড়ার অনুপ্রেরণা যোগাতেন। সেভাবেই আমি স্পেস সায়েন্সে পড়াশোনা করে বর্তমানে নাসাতে কাজ করি।
-আমার পর দাদা ছিলেন ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এক বীর যোদ্ধা। তাই তার জন্ম ও মৃত্যু দিবস ইতিহাসের অংশ। আর সেভাবেই সে সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। অন্যথায় পরদাদার খোঁজ কে বা রাখে? কারো জীবনে পরদাদা অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক। দৈনন্দিন জীবনে কোন নথি পত্র তৈরিতে কদাচিৎ দাদার নামটা লাগলেও পর দাদারটা লাগে না।
-আমার দাদুর মৃত্যু দিবসটা মনে আছে কিন্তু জন্ম দিবসটা জানিনা। তবে বাবার জন্ম ও মৃত্যু দিবস দুটোই আমার জানা।
এটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে পূর্বপুরুষদের কথা মনে রাখার বিষয়টি হৃদয়ের টান আর প্রয়োজনীতা দূটোই। এ ভাবেই কালের প্রবাহে আপন জনেরা স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।

-খোকা, এখেনে বৃষ্টির ছিটে এসে লাগছে, তুমি বরং ঘরের ভিতরে যেয়ে বিশ্রাম নাও। বিছানা পত্র সব ঠিকঠাক করা আছে।
এলিয়ানা আমাদের বাড়ীর পুরনো কাজের মানুষ। বয়েস নব্বই দশকের মাঝামাঝি, বাবার থেকে বছর দুয়েকের বড় হবে। শুনেছি ওর বাবাকে আমার দাদু পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এনেছিলেন। তারপর সে বড় হলে দাদু ওকে একটা গারো উপজাতি মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে আমাদের ভিটের ভিতর ওদের বসবাসের জন্য বাড়ী নির্মাণ করে দেন। ওর আরো দুটো বোন ছিল। তারা বিয়ে করে অন্য খানে স্বামী সংসার নিয়ে আছে। ওর বাবার মৃত্যুর পর এলিয়ানাই এই ভিটে ঘর বাড়ী সব দেখা শোনা করে রাখে।
ওর ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। বয়েসের ভারে একটু কুঁজো হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। গায়ের রংটা এখানকার অন্য সবার মত হলেও নাকে মুখে বোঝা যায় ওর গোড়াটা এখানকার নয় অন্য কোন খানের।
-এলিয়ানা, খোকা যখনি আসবে ওকে দেখে রাখবি। ও এখানকার চালচলন কিছুই বোঝে না।
তোমার বাবা কথাটা বারবার আমাকে বলে গেছেন।
বাবার মত করে এলিয়ানাও আমাকে খোকা বলে ডাকে। ওর দুই ছেলে এক মেয়ে। বেশ কয়েক বছর হল বউটা মারা গিয়েছে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে স্বামীর সাথে বসবাস করে আর ছেলে দুটো অল্প লেখাপড়া শিখে পাশের শহরে কাজ করে। বড় ছেলেটার বিয়ে দিয়েছে। সেই বউটাই ওদের রান্না বান্না সহ সংসার সামলাই।
-তুমি যাও আমি একটু বাদেই ঘরে যাচ্ছি।
এলিয়ানা চলে গেল।
অঝরে বৃষ্টি ঝরছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। চারদিকে দাঁড়ানো গাছগুলো নির্বিকারে ভিজছে।
আমার পরদাদা সাধ্যমত তার ছেলে অর্থাৎ আমার দাদুকে মানুষ করে তার অর্জিত ধন সম্পত্তি ছেলেকে বুঝিয়ে দিয়ে চোখ বুজেছেন। আমার দাদুও বাবার ব্যবসা ধরে রেখে নিজ মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে তার বাবার রেখে যাওয়া আর্থিক অবস্থার প্রভুত উন্নয়ন সাধন করেছেন। আর্থিক সামর্থ্য বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে তিনি তার একমাত্র ছেলেকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সাত সমুদ্র পার করে উন্নত বিশ্বে পাঠিয়েছিলেন।
আমার বাবা তার নিজের আর্থিক ও জ্ঞানের সামর্থ্যতার আনুকুল্যে আমাকে যুগোপযোগী শিক্ষাই শিক্ষিত করে সবে মাত্র চোখ বুজে তার বাপ দাদার মত নিজ উৎপত্তির সাথে একাত্ম হয়ে চির নিদ্রায় শয়ন করেছেন।
জীবনটা যেন কেবলমাত্র একটা রিলে রেস। লক্ষ্য হচ্ছে, নিজের নির্ধারিত ল্যাপটা সাধ্য মত দৌড়িয়ে রেসের ব্যাটনটা পরবর্তী জনকে হস্তান্তর করার মত।

বাবা কি মনে করে আমার নামটা জীবন রেখেছিল জানিনা, কিন্তু এটাই কি জীবন! যা আমার জানা আমার তিন পুরুষেরা যাপন করেছেন। আর আমিও ব্যাটন হাতে নিয়ে কি ওই একই গন্তব্যে ধাবিত হচ্ছি!
এলিয়ানার ডাকে আবার সম্বিত ফিরে পেলাম।
চিন্তা জগতে ডুবে থেকে এরই মধ্যে বেলা কখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে খেয়ালই করিনি। আর মেঘে ঢাকা আকাশ দেখে তা বোঝার একদম উপায় নেই। কাল মেঘ সূর্যকে ঢেকে রেখে সকাল সন্ধ্যা সব একই কাতারে দাড় করিয়েছে।
দেখলাম ওর পাশে দাঁড়িয়ে ওর বড় ছেলেটা, আমার বয়সেরই কাছাকছি হবে, নাম রবিন। সাথে ছেলের বউ আর ওদের বছর পাচেকের পোতা। এলিয়ানাই পরিচয় করিয়ে দিল।
তাকালাম ওদের দিকে।
এই মুহূর্তে এলিয়ানাকে আমার বাবার জাইগায় দাড় করিয়ে ওর মৃত বাবা যার ভস্ম এই ভিটেতেই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বলে শুনেছি, তার সাথে আমার মৃত দাদুর জীবনটা মিলিয়ে দেখতে খুব মন চাইল।
দূটো পৃথক জীবন চক্র একই দিকে এবং একই গতিতে ঘুরেছে, শুধু প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা।
জীবন চক্র পরিক্রমাই সবাই জীবনের সাত রঙের স্বাদ গ্রহন করেছে।
রবিনের দিকে তাকিয়ে ওর মধ্যে আমি নিজেকে দেখার চেষ্টা করলাম। রবিন পাশের শহরে একটা মটর গ্যারেজে কাজ করে আর আমি নাসাতে সফটওয়্যার প্রগ্রামারের কাজ করি। ওর কাজ শক্ত যন্ত্রপাতি আর যন্ত্রাংশ নিয়ে, ঠিক আমার উল্টো। কাজের জায়গা পরিবেশ আর পারিশ্রমিক একদম আলাদা আলাদা।
কিন্তু এই মুহূর্তে ওর আর আমার মধ্যে কোন পার্থক্য করতে পারলাম না।
মনে হল যেন আকুল কোন দরিয়াই অনেক গুলো ভেসে চলা নৌকার মধ্যে রবিন আর আমি আমারা দুজনে দূটো পৃথক নৌকা বয়ে চলেছি।
আমারটা ইঞ্জিন লাগানো হাই পাওয়ারের বোট আর রবিনেরটা দাড় বাওয়া নাও। একই গন্তব্যে বয়ে চলেছি দূজনেই। কিন্তু দৃশ্যত আমার নাওটা দ্রুত গতি সম্পন্ন হওয়া স্বত্বেও আমারা একই গতিতে একই দিকে অগ্রসর হচ্ছি।
-বাবা।
পাশে দাঁড়ানো রবিনের পাচ বছরের ছেলেটা বাবার হাত ধরে একটু হেচকা টান দিয়ে ওকে ডাকার সাথে সাথে আমার মোবাইলটাও বেজে উঠলো।
কলার আই ডি তে দেখলাম লেখা ‘বাবা’। আমার ছেলে সাত সমুদ্রের ওপার থেকে আমাকে কল করছে কিছু বলবে বলে।
সবই চিরন্তন। বাবারা যার যার সাধ্যানুযায়ী সন্তানদেরকে মানুষ করে। তারপর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে দেহ ত্যাগ করে চলে যায় অন্য কোন জগতে।
আমি, রবিন আর আমাদের সন্তানদের জীবনও ওই একই চক্রের আবর্তনে অগ্রসর হচ্ছে।

Category: Meaning of Life

Write a comment