শিশির বিশ্বাস এখন মৃত্যু শয্যায়।
নব্বয়ের উপর বয়েস তাই অবধারিত মৃত্যুকে আর ঠেলাঠেলি করে দূরে ঠেলে দেয়ার বৃথা চেষ্টা না করে নীরবে মেনে নিয়ে আত্ম উপলব্ধিতে ডুব দিয়ে এ সবের অর্থ খোঁজার মনস্থ করেছেন তিনি।
আর্থিক দিক দিয়ে কারো উপর নির্ভরশীল নয় তিনি। পিতৃপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পদ সম্পত্তির সুবাদে সেটা কোন বিষয় না, তদুপরি তিনি নিজের সরকারী চাকুরীর যে পেনসান পান সে টাকাতেই তার নিজের খাওয়া পরার খরচ বাদেও উদ্বৃত্ত থাকে যা দিয়ে তিনি অভাবী স্বজন আর পড়শিদের সাহায্য করে থাকেন নিয়মিত।
প্রায় শত বছরের পুরনো শরীরটার প্রতি যার পর নেই কৃতজ্ঞ তিনি, কারণ এ বয়েসেও শরীরটা তাকে সাধ্যমত সহযোগিতা করে চলেছে। এ বয়েসে যে সমস্ত কাজের জন্য শারীরিক ভাবে মানুষ অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, অদৃষ্টের আশীর্বাদে সে সব কাজ গুলো তিনি নিজেই সমাধা করে নিতে পারেন।
সব মিলে জীবন থেকে না পাওয়ার তেমন কোন আফসোচ তার নেই বললেই চলে।
সব কিছুর প্রতি, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধটা বিশ্বাসের আজন্ম।
বাসা থেকে বেরনোর সময় গার্ড ছেলেটি টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিলে এবং বাসার পোষা কুকুর অস্কার আনুগত্যতা প্রকাশ করতে তার হাতটা চেটে দেয়ার সময় এ দুটি প্রাণী তার সারাক্ষন তার পরিবারকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য দিনের শুরুতেই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে কখনো অন্যথা হয়নি তার।
শিশির বিশ্বাসের কৃতজ্ঞতা বোধের পরিধি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড বিস্তৃত; সৃষ্টিকর্তা থেকে শুরু করে তাঁর সৃষ্টির সব কিছুর প্রতি।
আলাল আর দুলাল দুই ছেলে শিশির বিশ্বাসের। আলাল ছোট কাল থেকেই একটু যেন বেশী সহজ সরল প্রকৃতির। সবার মতে যুগের তাল মিলাতে সে সক্ষম নয়। গোড়া থেকেই ওর যা আছে আর যা হচ্ছে তার সব কিছুকে গ্রহন করে খুশী সে। পড়াশোনার প্রতিও তেমন মনযোগী না আলাল। বড় হয়ে কি হবে সে সব ভাবনা ওকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি।
অনেকে বলত ও বোধহয় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। ছোট কালে বিশ্বাসের বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনরা বলেছিল ওকে ভাল কোন ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু বিশ্বাসের মন তাতে কোন রকম সাঁই দেয়নি। কিন্তু ওর মা অর্থাৎ বিশ্বাসের স্ত্রী ছেলেকে ভাল ভাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছে কিন্তু ডাক্তাররাও তেমন কোন সমস্যা পায়নি ওর ভিতর।
শারীরিক বা মানসিক কোন অসুবিধা না থাকায় বাবা মা ও যেমন সে ভাবেই ওকে মেনে নিয়ে ওর মত করে ওকে বড় হতে দিয়েছে।
দুলাল আলালের থেকে বছর পাচেকের ছোট। শারীরিক গঠনে দু ভায়ের সাথে বিস্তর মিল, কিন্তু বৈষয়িক বুদ্ধি বিবেচনায় দুলাল আলালের একদম বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। ছোটকাল থেকেই খুবই বুদ্ধি দৃপ্ত আর হিসেবি দুলাল।
আলাল আধুনিক স্কুলের পড়াশোনা আর আচার আচরনের সাথে একদম তাল মিলাতে না পারায় বিশ্বাস ওকে সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করিয়েছে। আর অবশেষে ওর মাঝ বয়েস পার করা দাদি অর্থাৎ বিশ্বাসের মা যিনি বলতে গেলে একাকী ওদের পিতৃপুরুষের ভিটে আগলে পড়ে ছিলেন তার অনুরোধে আলালকে ওদের পৈত্রিক বাড়ীতে পাঠিয়ে দাদির সাথে রেখে ওখানকার স্কুলেই লেখাপড়া করে সেখানেই স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেছে।
অন্য দিকে বুদ্ধিদৃপ্ত দুলাল দেশের সেরা স্কুল কলেজ পড়াশোনা করে খুব ভাল রেজাল্ট করে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে সে দেশেই চাকরী করে ওখানকার বাসিন্দা হয়েছে।
দু’ভায়ের মধ্যে খুব ভাল সম্পর্ক। দূরে দূরে বসবাস করলেও প্রায় প্রতিদিন ওরা কথা বলে। দাদি বেচে থাকতে আলালের টেলিফোনে দাদি এবং বাড়ির অন্যান্য সবার সাথে আলালের মত দুলালও যোগাযোগ রক্ষা করতো। একজন পাশে থেকে আর একজন দূর থেকে।
দু ভাই’ই ওদের মা বাবার সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে।
বিশ্বাস পরিবার এ অঞ্চলের বনেদি বংশ। চার পুরুষ আগে ওদের জমিদারী ছিল। এখন জমিদারী না থাকলেও প্রায় পঞ্চাশ একরের মত চাষের জমি আর দশ একরের মত জায়গার উপর জমিদারী আমলের বসত বাড়ী আছে।
বর্তমানে সেগুলো বলতে গেলে বড় ছেলে আলালই সামলে রাখে। আলালই ওর দাদির সাথে পরিকল্পনা করে বসত বাড়ীর ভিটেতে একটা হাসপাতাল আর একটা স্কুল তৈরী করেছে। হাসপাতালের চিকিৎসা আর স্কুলের পড়াশোনা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ফ্রী। এ সবের সব খরচ ওদের বিশাল সম্পত্তির আয় থেকে সংকুলান করা হয়। এ ব্যাপার গুলো সামলানোর ব্যপারে আলাল খুব দক্ষ।
ওর দাদি বেচে থাকতে এ অঞ্চলের এক ডাক্তার মেয়ের সাথে আলালকে বিয়ে দিয়েছিল এই শর্তে যে বউমা যেন হাসপাতালটা দেখেশুনে রাখে।
আলালের ঘরের ফুটফুটে একটা মেয়ে আর একটা ছেলের মুখ দেখে শান্তিতে চোখ বুজলেন আলালের দাদি।
-বাবা, যেখানে বা যে দেশে বসবাস করবি সেখানকার সংখ্যাগুরু শ্রেণীর একজন হয়ে বসবাস করবি। কোন বদ্ধ পুখুর বা ডোবা নয় সাগরের উন্মুক্ত জলরাশির অংশ হয়ে থাকার মধ্যে প্রকৃত বিকাশ সম্ভব।
বাবার উপদেশ মাথায় রেখে সেভাবেই দুলাল ওদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে ওদেশের একটা মেয়েকে বিয়ে করে সেখানকার একজন হয়েই বসবাস করছে। ওদের বিয়ের সময় শিশির বিশ্বাস আর ওর স্ত্রী গিয়েছিল ওদেশে। সিটি সেন্টারের অদূরে পাহাড়ী অঞ্চলে প্রায় পাচ একর জমির উপর নির্মিত একটা বড় বাড়ী কিনে ওরা বসবাস করে। খুব সুখে আছে ওরা। শিশির বিশ্বাস আর তার স্ত্রী প্রতি বছর অন্তত একবার যেয়ে ওদের সাথে দু এক মাস থেকে আসে।
দুলাল খুব পিড়াপীড়ি করে ওদের সাথে ওদেশে স্থায়ী ভাবে থাকতে। বলে ওদেশে বেড়ানোর অনেক জায়গা আছে, তাছাড়া ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থাও আছে।
-সময় হলে সে দেখা যাবে, বলে বছর দুয়েক হল দুলালের কাছ থেকে ফিরে এসে হটাৎ করেই কাউকে কিছু না বলেই মিসেস বিশ্বাস শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
আলাল গ্রাম থেকে ছুটে আসলো ওদের শহরের বাড়ীতে। সেই সব কিছু করে মায়ের লাশ নিয়ে যেয়ে পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করল।
মাকে হারিয়ে খুব কান্নাকাটি করল আলাল। দুলালও ওর ভাইকে টেলিফোন করে খুব কাদল, তখনই দেশে আসবে বলে জানালে আলালই ওর ভাইকে তাড়াহুড়ো করে আসতে নিষেধ করল।
স্ত্রীকে হারিয়ে শহরের বাড়ীতে সরোয়ার মন্ডল একদম একা হয়ে গেলেন।
দু ছেলেই বাবাকে শহরের বাসা ছেড়ে তাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য জিদ করতে লাগলো।
শিশির বিশ্বাসের শহরের বাসাটাও বিচ্ছিন্ন কোন এলাকায় অবস্থিত না। চাকুরীর সুবাদে সরকার থেকে বরাদ্দ প্রাপ্ত হাউজিং। সারা জীবন যাদের সাথে চাকরী করেছে যেখানে তাদেরই বসবাস। বলতে গেলে সবাই জানাশোনা। তাই সতীর্থদের সাথে পার্কে বা মলে বসে সময় কাটানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে।
কিন্তু এখানে যাদের সাথে শিশির বিশ্বাস বসবাস করে তাদের সাথে পরিচয় চাকরীর সুবাদে আর কাজের পরিধিতে, যদিও তা দীর্ঘ দিনের। তাই ওদের সাথে বসে আলোচনা কালে অতীত স্মৃতি রোমন্থনের সময় বিভিন্ন কাজের কথাই ঘুরপাক খাই।
এখানে সবাই পারিবারিক জীবনের আলোচনা বা কর্মজীবনের স্মৃতি রোমন্থন, বই পড়া বা একটু আধটু লেখালিখি করা, সামাজিক অনুষ্ঠানে একত্র হওয়া বা ধর্ম চর্চা করা, প্রয়োজনে ব্যাংক বা হাসপাতালে যাওয়া আর পরচর্চা তো আছেই, এসবের মধ্যেই গন্ডিবদ্ধ থাকে।
মোট কথা মৃত্যুর আগের সময়টুকু কাটানো আরকি।
এখানে যাদের বাস তারা সবাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত। অভিজ্ঞতাই ভরা তাদের জীবন। অভিজ্ঞতা গুলো কাজে লাগিয়ে তাদের পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভব। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রের অভাব। দেশে যখন বন্যা বা ঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় বা তীব্র শীতে মানুষ যখন কষ্ট পায় তখন কিছু সাহায্য সহযোগিতা করার বা নিজ অঞ্চলে স্কুল মসজিদ মন্দির বা মাদ্রাসা তৈরীতে সহযোগিতা করার মধ্যেই তাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্র সীমিত।
এ যেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গোডাউনে রক্ষিত উন্নত মানের বীজ, কিন্তু উপযুক্ত ক্ষেত অভাবে তা বপন করতে না পারার মত ব্যপার। বীজগুলো চিরস্থায়ী না, তাই একদিকে নির্দিষ্ট সময়ের পর তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভাল বীজ অভাবে খাঁ খাঁ করছে শূন্য ক্ষেত আর বুভুক্ষ মানুষ। যারা ক্ষুধা ভরা পেটে কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
বলতে গেলে এখানে বসবাসরত সবারই ওই অবারিত শূন্য ক্ষেতের সাথে কোন না কোন ভাবে সম্পৃক্ততা আছে। যেখানে দেশের নব্বই ভাগেরও বেশী মানুষের বাস। জাতির ভবিষ্যৎ এই শহরে মাত্র দশ ভাগ মানুষের মধ্যে নয় গ্রামের ওই নব্বই ভাগ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
ভবিষ্যতের নাগরিক শহর থেকে নয় ওই গ্রাম থেকেই উঠে আসবে। তাদের জন্য স্কুল হয়ত বা আছে কিন্তু ভাল শিক্ষক নেই, থাকলেও তারা যে কাজটা করছে তার গুরুত্ব না বুঝে শুধু শুধু চাকরী করে সময় কাটাচ্ছে। চিকিৎসা কেন্দ্র হয়ত আছে কিন্তু রক্ষনাবেক্ষন বা তদারকি নেই।

আর সব চেয়ে বড় কথা দেশের ওইসব ভবিষ্যৎ নাগরিকদের চোখে কোন স্বপ্ন নেই। তাদেরকে স্বপ্ন দেখতে শিখাতে হবে, তাদের হৃদয়ে স্বপ্নের বীজ বপন করতে হবে। শহরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গোডাউনে রক্ষিত উন্নত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বীজ পেলে ওই বুভুক্ষ মানুষগুলো তাদের বুকের উষ্ণতা দিয়ে তাদেরকে আপ্যায়ন করবে, সুরক্ষা দেবে নিশ্চিত।
আর এই অভিজ্ঞতাই সমৃদ্ধ মানুষগুলো যখন তাদের নিজ হাতে রোপন করা বীজের অঙ্কুরোদগমের স্বর্গীয় সৌন্দর্য একবার অবলোকন করবে তখন তারা বুঝবে জীবনের এ পর্যায়ে আসা মানে শুধু মরার জন্য বাচা না, এখনও পৃথিবীকে দেয়ার মত অনেক কিছু বাকি আছে, অনেক রাস্তা হাটতে এখনও বাকি।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ কোন বৃদ্ধ লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে যদি একটা গাছের চারা বা বীজ বপন করে, এটা জেনে যে সে গাছ ফলবতী বা ছায়াবত হয়ে ওঠা দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য তার হবে না, সেটা ভোগ করবে তার পরবর্তী প্রজন্ম, তখনই নিশ্চিত ভাবে সে জাতির সমৃদ্ধি আসবেই। আর এ উপলব্ধির মজা যিনি পাবেন তিনি সেটা বারবার করতে যেয়ে প্রয়োজন হলে মরেও বাচতে চাইবে।

কি করবে এখন শিশির বিশ্বাস!
ভাল চিকিৎসা নিয়ে ভাল ভাবে মরার জন্য দুলালের কাছে যেয়ে বসবাস করবে, না যতটুকু বীজের ভান্ডার তার কাছে গচ্ছিত আছে তা নিয়ে আলালের সাথে যোগ দিয়ে সে বীজ বিশাল শূন্য ক্ষেতের একটা ক্ষুদ্র অংশে ছড়িয়ে দেবে!

Category: Meaning of Life

Write a comment