প্রখ্যাত শিল্পপতির বারো বছরের ছেলে রবিন সপ্তম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষাই ফেল করলো। বড় লোক বাবার আদুরে ছেলে, সব বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা প্রাইভেট টিচার, তা স্বত্বেও ও ফেল করলো! ব্যাপারটি শুধু রবিন কেন, কেউই মেনে যেন নিতে পারছিল না।
খুব মন খারাপ রবিনের। বন্ধু বান্ধব বাবা মা কারো সাথে কথা বলা বন্দ করে দিল রবিন। সময় মত খাওয়া দাওয়াও প্রায় বন্দ। সবার এবং সব কিছুর উপরই যেন রাগ পড়ল ওর।

রাগটা অতীব তীব্র হয়ে উঠলো কারন ওর বাবার ব্যবসা দেখাশোনার জন্য নিয়োজিত ম্যানেজারের ছেলে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে সে বছর ভাল ভাবে পাশ করলো। এ যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া।
এ লজ্জা দৃশ্যত রবিনের বাবা মাকেও মুষড়ে ফেললো। ছেলেকে শান্তনা দেবে কি, ওরা নিজেরাও তাজ্জব বনে বিভিন্ন ভাবে প্রাইভেট টিচার, স্কুলের সঠিক প্রশ্ন না করা, খারাপ পরিবেশ ইত্যাদিকে দোষারোপ করতে লাগলো।

পরীক্ষার আগের দিন ম্যানেজারের ছেলে রাখাল বাবার হাত ধরে এসে সাহেব আর বেগমের পায়ে হাত ছুয়িয়ে সালাম করে দোয়া নিয়ে গেলেও তার পাশ করার আনন্দ সংবাদটা জানানোর জন্য এ বাড়ীর অন্দর মহলে আসার সাহস পর্যন্ত পেল না।
রাখাল তার সহপাঠী এবং বন্ধু রবিনের সাথে মেশা তো দূরের কথা, বলতে গেলে মহাজনের বাড়ীর অন্দরে প্রবেশও বন্দ হয়ে গেল। আর ওর বাবা সাহেবের নজর এড়িয়ে এড়িয়ে অপরাধীর মত কোন রকমে নিয়মিত কাজকর্ম গুলো চালিয়ে যেতে লাগলো।
কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হল না। রাখালের বাবা চাকরীটা হারাল আর এক সপ্তাহের মধ্যে ওদেরকে মালিকের দেয়া বাসা ছেড়ে অনত্র চলে যাওয়ারও আদেশ হল।

এ ভাবে কয়েকদিন নিজেকে ঘর বন্দি রাখার পর একদিন বিকেলে রবিন ওদের বিশাল বসত বাড়ীর সামনে অবস্থিত প্রকান্ড দীঘির সান বাধানো ঘাটের উপর গিয়ে বসলো। হাতে একটা সরু লাঠি আর সেটা দিয়ে ঘাটের ধার ঘেঁসে দাঁড়ানো ঝুলে পড়া হাসনা হেনার ডাল গুলোর উপর এলোপাথাড়ি আঘাত করে করে মনের রাগ মিটাতে লাগলো।
বৃদ্ধ মালি রঘু মিয়া রবিনের রাগের কারণটা জানে। তাই সে অদূরে দাঁড়িয়ে তা নীরবে অবলোকন করতে লাগলো। রবিন ওর রাগটা মিটিয়ে একটু শান্ত হলে মালি রঘু মিয়া স্মিত হেসে ঘাটের উপর এসে রবিনের কাছা কাছি দাঁড়ালো।
গোমড়ামুখি রবিন তা টের পেয়ে সে দিকে না তাকিয়ে গাট হয়ে বসে রইল।
রঘু মিয়াকে খুব পছন্দ করে রবিন। রঘু মিয়া সব সময় বাগান থেকে আম জাম, কামরাঙা, জামরুল ইত্যাদি ফল পেড়ে ওকে খাওয়াই। তাছাড়া ওকে নানান গল্পও শোনাই।
-খোকাবাবু, জানি তোমার মন ভাল নেই। আর থাকবেই বা কি করে, তোমার জন্য আমারও মন খারাপ। ভেবে দেখ, পরীক্ষার ঠিক আগেই গা গরম হয়ে তোমার জ্বর হল, বলতে গেলে জ্বর গায়েই তুমি পরীক্ষা দিলে। না হলে কি এমন হওয়ার কথা! তোমার মত ছেলে ফেল করবে কেন?
ওর কথায় রবিন কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে এতক্ষনে তাকাল রঘু মিয়ার দিকে। যেন রঘু মিয়াঁর আন্তরিকতা আঁচ করতে চাইলো।
-যত দোষ সব ভাগ্যের আর সে ব্যপারে কারো কোন হাত নেই তাতো সবার জানা।
নিজের অকৃতকার্যতার জন্য একটা ওজর খুজে পেয়ে রবিনের মুখের উপর জমে থাকা মেঘ যেন একটু একটু করে কাটতে লাগলো।
কথা বলতে বলতে রঘু মিয়াঁ তার কাছে রাখা গামছা খুলে কয়েটা লাল জামরুল রবিনের পাশে রাখল। সেগুলো দেখে ওর খুব পছন্দ হল, খুশীও হল। কিন্তু পরক্ষনেই আবার মুখের উপর সেই গোমড়া ভাবটা ফিরে আসলো।
তা দেখে কি যেন একটা ভাবল রঘু মিয়াঁ।
-আর দেখ, রাখালের ভাগ্যটা কি ভাল, ওতো পড়াশোনাই তেমন ভাল না, না বুঝে সব মুখস্ত করেছে, আর সেগুলোই পরীক্ষাই এসেছে। ওই ঝড়ে কলা গাছ ভাঙ্গা আর ফকিরের কেরামতি বাড়া আর কি।
রাখালের সাফল্যটা এভাবে খাট করাই এবার সত্যি সত্যিই কাজ হল। রবিনের মুখমণ্ডলটা স্মিত হাসিতে ভরে গেল। যাকে বলে আত্মতুষ্টি।
রবিন ওর পছন্দের একটা লাল টুকটুকে জামরুল তুলে নিয়ে তাতে কামড় বসাল।
রাখালকে খুব পছন্দ করে রবিন। ভাল কিছু খাওয়ার সময় রাখালকে ডাকতে ওর ভুল হয় না কখনো। বিশেষ করে বাগানের ফল মুল খাওয়ার সময় রবিন কখনো রাখালকে ডাকতে ভোলে না। নিজেরা খাওয়ার পর রবিন সব সময় বাড়তি ফল ফলাদি গুলো রাখালের ভাই বোনদের জন্য নিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়া দেয়।
কিন্তু আজ রবিন তেমন কিছুই করল না। আজ যেন ব্যতিক্রম।
-একটা কথা ভেবে দেখ খোকাবাবু, আজ যদি তোমার জায়গায় রাখাল ফেল করতো তবে কি কান্ডই না হতো!
রবিন প্রশ্নাতুর চোখে তাকাল রঘু মিয়াঁর দিকে।
-ওরা দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষ, তোমাদের মত এতসব কি আর বোঝে? কেদে কেটে ঝগড়া করে বেচারা রাখালকে হয়ত মারধোরও করতো ওর বাবা মা।
রবিন তেমনি ভাবে তাকিয়ে শুনছে রঘু মিয়াঁর কথা।
-তাই, রাখাল পাশ করেছে একদিকে ভালই হয়েছে, কি বল?
রঘু মিয়াঁ চাইলো রবিন আলোচনায় অংশ গ্রহন করুক।
কি একটা ভাবল রবিন।
-ঠিক আছে কাকা, তুমি রাখালকে না হয় ডাক।
ততোক্ষণে রবিনের মুখোমন্ডল থেকে কাল মেঘ পুরোপুরি কেটে গিয়ে ও একদম স্বাভাবিক হয়ে উঠলো।
-আচ্ছা, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। তুমি জামরুল গুলো খেতে থাক।

হায়রে মানুষের অবুঝ মন কোন ব্যার্থতার দায়ভার নিতে কত অনীহা। যৌক্তিক বা অযৌক্তিক ভাবে অন্য কারো ঘাড়ে সে দায় চাপাতে পারলেই যেন শান্তি। রবিন তার অসফলতার দায়ভারটা অন্য কিছুর উপর চাপানোর অবকাস পেয়ে নিজেকে পুরোপুরি দায়মুক্ত করতে পারাই তার ভিতর স্বভাবজাত ফুরফুরে ভাবটা ফিরে আসলো।
কিছুক্ষন পর কিছুটা ভয়ার্ত অবয়বে রাখাল আসলো। রবিন ওকে পাশে বসিয়ে নানা কথায় অভয় দিয়ে যা হয়েছে তা মেনে নেয়ার জন্য সাহস যোগাতে লাগলো।
রাখালের মধ্যে প্রথম দিকে কিছুটা বিহ্বল ভাব থাকলেও ধীরে ধীরে সেটা কেটে যেয়ে ওরা দুজনেই প্রানবন্ত হয়ে উঠে খেলা ধুলা আর জামরুল খাওয়াতে মেতে উঠলো।

ওদিকে একমাত্র আদরের ছেলের ভালবাসায় অন্ধ রবিনের বাবা মা ছেলের ক্লাসে ফেল করার ফলে তারাও ছেলের সাথে একই ভাবে মুষড়ে পড়ার ফলে পুরো পরিবারের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ কানা গলিতে গিয়ে ঠেকল। তারা যেন এর থেকে বেরনোর কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলো না।
উপরন্ত ম্যানেজারের ছেলে পাশ করার ঘটনা তাদের অন্তরদহে ঘি ঢেলে দিয়ে সে জ্বালা আরো অনেকগুন বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাতে করে তাদের সব রাগ বেচারা ম্যানেজারের উপর পড়ে নিজেদের ব্যাবসা ক্ষতিগ্রস্থ করেও ম্যানেজারকে ররখাস্ত করে ওর ছেলেকে নিয়ে এ তল্লাট পরিত্যাগ করার হুকুম দিল।
মর্মবেদনায় জর্জরিত অতি আদরের ছেলে রবিন সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বেশ কিছু দিন ঘরে শুয়ে বসে কাটানোর পর দীঘির ঘাটে একাকী বসে থাকাটা রবিনের মা বাবা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলেন না।
তাই ছেলে কি করছে দেখার জন্য ওরাও দীঘির ঘাটের কাছে জংগলের মধ্যে দাঁড়িয়ে তা দেখতে লাগলো।
কিন্তু ছেলের স্বাভাবিক আচরণ আর সর্বোপরি রাখালের সাথে ওর আগের মত হাসি খুশী মেলামেশা দেখে তারা দুজনই যেন হা হয়ে গেল।
অন্য দিকে দীর্ঘ দিনের চাকরী হারিয়ে, মনিবের দেয়া কোয়ার্টার ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসাবে ভগ্ন হৃদয়ে ছেলেকে ডাকার জন্য রাখালের বাবাও দীঘির ঘাটের দিকে আসার পথে রাখাল আর রবিনের হাসাহাসির শব্দে অবাক হয়ে সেও ঘাটের অদূরে জংগলের মধ্যে লুকিয়ে সব কিছু অবলোকন করতে লাগলো।

মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। স্বভাবজাত ভাবেই মানুষ যে কোন ভাল অর্জনের জন্য যেমন পুরপুরিই তার কৃতিত্ব দাবি করে নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে চায়, ঠিক তেমনি যে কোন অকৃতকার্যতার দায় ভার অন্য কিছু বা কারো উপর চাপিয়ে নিজে দায়মুক্ত থাকতে চায়। দরকার হলে সে দায় ভাগ্যের উপর চাপাতেও কুন্ঠা বোধ করে না।
প্রখ্যাত শিল্পপতির আদরের ছেলে রবিনের ক্লাস সেভেনে ফেল করা আর ওদেরই আশ্রিত ম্যানেজারের ছেলে রাখালের একই ক্লাসে পাশ করকে কেন্দ্র করে ঘটা সব কাণ্ডজ্ঞানহীন ঘটনাগুলো মানুষের নিচক সীমাবদ্ধতা। যা নিজ নিজ জীবনের অসফলতার জন্য অন্য কোন মানুষ, ঘটনা এমনকি সৃষ্টিকর্তার উপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করার প্রবনতা বই অন্য কিছু না।

তাইতো জীবনের অভিজ্ঞতায় পূর্ণ রঘু মিয়াঁ রবিনের জন্য অন্যের উপর দায় চাপানোর একটা সুযোগ তৈরী করে দিয়ে সে নিজে একটু দূরে সরে গিয়ে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছু অবলোকন করতে লাগলো।

Category: Meaning of Life

Write a comment