অবসরপ্রাপ্ত সরকারী বড় আমলা আবীর চৌধুরী জীবনের এই প্রান্তে পৌঁছে নিজ হাতে সাজানো সংসারের মানুষদের কাছ থেকে আশাহত আচরণ পেয়ে জীবনের উপর যেন ঘৃণা এসে জমা হল। মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা কারো কাছে প্রকাশ করা যায় না, তেমনি একটা ঘটনা তার জীবনকে যেন থামিয়ে দিতে চাইলো।
আবীর চৌধুরীর জীবনে কি ঘটনা ঘটেছে সেটা উল্লেখ করে এর সর্বজনীনতা হনন করতে চাই না। কারণ সাধারণত প্রতিটি জীবনে এ ধরনের ধাক্কা আসে; শারীরিক মানসিক বা আত্মিক যাই হোক, তার ধরণগুলো হয়ত আলাদা কিন্তু যন্ত্রণার স্বাদ অভিন্ন।

জীবনের আঘাতগুলো অবশ্য সবার উপর একই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এটা অনেকটা সূর্যের আলো পাশাপাশি রক্ষিত ধুলো আর কাঁচের উপর পড়ার মত ব্যপার। কাঁচ সে আলো নিজের মধ্যে না ঢুকিয়ে প্রতিফলন করে দেয়, আর ধুলো সে তাপ শুষে নিজের মধ্যে নিয়ে নিজেকে উতপ্ত করে। পাশাপাশি দুটো বস্তু সূর্যের তাপের প্রভাবে ভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া করলেও তাপের ধরণ বা বৈশিষ্ট্য সর্ব ক্ষেত্রেই কিন্তু একই থাকে।

আবীর চৌধুরী তার নিজের হাতে গড়া সংসার ছেড়ে পরদাদার আমলের তৈরী বিশাল ভিটে বাড়ীতে ফিরে এসেছে।
পুরনো আমলের জমিদার বাড়ীর আদলে তৈরী তার পৈত্রিক বাড়ী, কালে কালে সব জৌলুস হারিয়ে এখন কেবল কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে। এ বংশের কেউ এখানে বর্তমানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে না। সবাই জীবিকার তাড়নায় বাইরে বাইরে। সে তাড়না শেষ হয়ে গেলে সবাই যেন এখানে মৃত্যুর আগের দিনগুলো কাটাতে আসে।
জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় সংসার ও সমাজের কাছে উপযোগিতা হারিয়ে জীবনের শেষ আঘাতটা আত্মভুত করার জন্য সব ছেড়ে ছুড়ে আবীর চৌধুরী তার উৎপত্তির কাছে ফিরে এসেছে। বাড়ীর সম্মুখস্থিত প্রকান্ড দীঘির ঘাটের উপর নির্লিপ্তে বসে সামনে প্রশস্ত জলরাশি, খোলা প্রান্তর, এসব অবলোকন করে আর আকাশের দিকে তাকিয়ে সময় কাটে তার।
আবীর চৌধুরীর বাবা তার কর্ম জীবন শেষ করে কয়েক বছর ছেলের সাথে বসবাস করার সময় তিনি তার স্ত্রী অর্থাৎ আবীরের মাকে হারান। স্ত্রীকে হারানোর পর পরই তিনি ছেলের সংসার ছেড়ে এই পিতৃপুরুষের ভিটেই চলে আসেন।
বাবা কেন চলে এসেছিলেন একাকী বসবাস করার জন্য তা আবীর তখন না বুঝলেও এখন সেটা অনুধাবন করার চেষ্টা করে।

জীবনের আর কতটুকুই বা বাকি। তাই ডুবন্ত বেলার প্রতিটি দিন ক্ষন গুনে গুনে পার করাই যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
যখন শারীরিক যৌবন ছিল তখন কোন আঘাত আসলে সময় সুযোগ মত প্রত্যাঘাত করার জিঘাংসাই নিজের মনটাকে শক্ত করে জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়া যেত। প্রত্যাঘাত না করতে পারলেও জীবীকার জন্য ব্যাস্ততা যা সিড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠার আনন্দ বা নতুন নতুন আঘাত, সেসব কিছু ভুলতে সহায়ক হত।
কিন্তু এখন হাতে আর সময় নেই। আঘাতের ব্যাথা আর প্রত্যাঘাত করার অসামর্থ্যতা ওকে একদম মুষড়ে দিয়েছে।

-খোকা বেলা যে গড়িয়ে গেল, এখন ভেতরে চল।
এ্যলিয়েনের ডাকে সম্বিত ফিরে পেয়ে সেদিকে তাকাল আবীর চৌধুরী।
এ্যলিয়ান ওদের কেয়ারটেকার, আর দুএকটা বছর পার করলেই শতবর্ষী হবে। আবীরের থেকে বছর দশেকের বড়। ছ ফুটের মত লম্বা, এতই কৃশাঙ্গ যে মনে হয় হাড়ের কাঠামোর উপর কাপড় পরানো, বয়েসের ভারে ন্যুব্জ হয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে দাড়ান।
গায়ের রংটা এখানকার মানুষদের মত হলেও নাকে মুখে বোঝা যায় ও অন্য কোন খানের।
আবীর চৌধুরীর পরদাদা ব্যাবসার কাজে আসামে যাতায়াত কালে এ্যলিয়ানের দাদাকে এ বাড়ীতে এনেছিলেন। তিনিই ওকে এদেশের একটা উপজাতি মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে ওদের জন্য ত্রিশ একরের বিশাল ভিটের এক কোনে ঘর তৈরী করে পাকাপাকি থাকার ব্যাবস্থা করেছিলেন।
সে থেকেই বংশ পরস্পর ওরা এখানেই বসবাস করে। ওর একটা ছেলে একটা মেয়ে। মেয়েটা বিয়ে হয়ে শশুর বাড়ী আর ছেলেটা শহরে একটা কারখানাই ম্যাকানিকের কাজ করে। ছেলের বউ সংসারটা সামলাই। চারটে পোতা পুতি নিয়ে ওর সংসার।
আবীরের বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই এ্যলিয়েন ওকে বাবার মত করে খোকা বলে ডাকে।

স্মিত হাসিতে ভরা ওর মুখ। হাসিটা সব সময় যেন লেপটে থাকে ওর মুখে চোখে। বলতে গেলে উল্লেখ করার মত কিছুই নেই ওর তার পরেও কেমন হালকা ওর জীবন।
ওকে ইশারা করে পাশে বসতে বলল আবীর।

আবীর চৌধুরীর পরদাদার সাথে ইংরেজ ডিসি সাহেবের সখ্যতা ছিল। দশ বার বছর বয়সী নাম গোত্র বিহীন এ্যলিয়েনর দাদাকে সেই ইংরেজ সাহেব দেখে তাকে এ্যলিয়েন অর্থাৎ ভিনদেশী বলে সম্বোধন করেছিলেন সে ভাবেই এ্যলিয়েন ওদের বংশের নামে পরিনত হয়েছে।
এ্যলিয়েন বসতে বসতে ওর বেটার বউটা হাতে করে কিছু চিড়ে মুড়ি নিয়ে আসলো। এ সময়টাই প্রায় প্রতি দিনই চায়ের সাথে চিড়ে মুড়ি নারকেলের নাড়ু কিছু না কিছু খেতে দেয় ওকে।
বউটার সাথে ওদের তিনটে ছেলে মেয়ে। শুনেছি ওদের চারটে বাচ্চা, দুটো ছেলে আর দুটো মেয়ে। পনের ষোল বছরের বড় ছেলেটা শহরে বাবার সাথে গ্যারেজে কাজ করে, ফিরতে রাত হয়। পরের দুটো মেয়ে আর ছোটটা ছেলে।
বাচ্চা গুলো সবাই হাসি খুশী চঞ্চল। মাকে নানা ভাবে বিরক্ত করেই চলেছে।
বড় মেয়েটার বয়েস দশ বারো বছর হবে, ও এ্যলিয়েন অর্থাৎ ওর দাদুর গাঁ ঘেসে পাশেই বসলো।
-কি নাম তোমার?
-ইনানি। সংক্ষিপ্ত জবাব দিল আমার জিজ্ঞাসার।
-ভারী সুন্দর নাম তোমার, তা কোন স্কুলে পড় তুমি?
-এখন আর পড়ি না।
ওর জবাবে আমাকে একটু আশ্চর্য হতে দেখে এ্যলিয়েন বলল- খোকা, বছর পাচেক হল ওরা কেউ স্কুলে যায় না। এ তল্লাটে কোন স্কুল নেই আর শহরের স্কুলে পাঠানো সম্ভব না সেত তুমি বোঝ।
-এই বয়েসে যে বাচ্চাদের স্কুলে খেলাধুলা আর পড়াশোনা করার কথা ওরা সুযোগ অভাবে এ ভাবেই দিন কাটাচ্ছে! এ সময়টা ওদের প্রতিটি জীবনের জন্য খুবই মুল্যবান। এ সময়টা নষ্ট হলে ওদের জীবনটাই তো নষ্ট হয়ে যাবে!
কথাটা চিন্তাই আসতেই আবীর চৌধুরী যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মত ভিতর থেকে একটা ধাক্কা খেল। এদের জন্য কিছু একটা করার তাড়া অনুভব করল।এ্যলিয়েন তুমি বাচ্চাদেরকে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা কর, আমি সব খরচ বহন করব।
ওরা সবাই তাকাল আবীর চৌধুরীর দিকে।
-সে তোমার দয়ার শরীর খোকা তা আমি জানি। কিন্তু ক’জনকে তুমি শহরে পাঠাবে বল?
-তোমাকে সে সব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। কালই আমি শহরে যাব। তুমি ওদের সবার নাম ঠিকানা ইত্যাদি কাগজপত্র সব ঠিক করে রেখ।
আবীর চৌধুরীর কথাই এ্যলিয়েন যেন কিছুটা ইতস্তত বোধ করতে লাগলো।
-তোমার বাবা এ বাড়ীতে আসার মাস ছয়েকের মধ্যেই এ ভিটের এক কোণে একটা প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেই স্কুলটা চালাতেন। একজন টিচারকে সাথে নিয়ে তিনি নিজেই ছেলে মেয়েদেরকে পড়াতেন। সে কাজে তিনি এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে নিজের দিকে খেয়াল রাখতে ভুলেই যেতেন। আর তাইতো অকালেই তার শরীরটা ভেঙ্গে পড়ল। কাজ পাগল মানুষ যাকে বলে।
-সে স্কুল থেকেই বেশ কয়েকজন ছেলে মেয়ে বৃত্তিও পেয়েছিল। তিনি স্কুলটাকে হাই স্কুলে উন্নীত করার জন্যও অনেক খানি কাজ এগিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তোমার বাবার শরীর ভেঙ্গে যাওয়াতে সব বলতে গেলে তখন থেকেই বন্দ হয়ে আছে। তারপর তো তিনি চলেই গেলেন।
কথাটা বলে একটা চাপা নিঃশ্বাস টানলো এ্যলিয়ান।
-তোমার বাবাকে দেখছি এ অঞ্চলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আর স্কুল তৈরীতে নিজেকে নিমগ্ন করার পর কেমন হাসি খুশী থাকতেন।
-তিনি আমাকে বলতেন -এ্যলিয়েন, জীবন যদি কখনো কানা গলিতে ঠেকে যায়, তখন নিজের চিন্তা ভুলে অপরের সেবাই নিজেকে নিয়োজিত করবে। দেখবে কোন কষ্টই তোমাকে আর স্পর্শ করতে পারবে না। শেষ বয়েসে এসে জীবনের অর্থ কি সে সম্পর্কে মনে যখন হতাশা তৈরী হয়েছিলো তখনি অনুধাবন করলাম ‘অন্যকে সাহায্য করাই বোধহয় জীবনকে অর্থবহ করে তোলে’।
একটা দীর্ঘশ্বাস টানলো এ্যলিয়েন।
-কিন্তু তিনি তো সব এলোমেলো রেখেই বিদায় নিলেন!
আবীর চৌধুরী এ্যলিয়েনের শেষের কথাগুলো শুনতে শুনতে চেয়ার থেকে পিঠটা উঠিয়ে সোজা হয়ে বসলো।

সন্ধ্যা হয়ে এল। এ্যলিয়েনের বেটার বউ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে চলে গেল।
-খোকা আর দেরী কর না, আমি যাই ঘরে বাতি জ্বালিয়ে দিই।

ওরা সবাই চলে গেল। জায়গাটা অন্ধকার আর নির্জনতাই ডুবে গেল।
নির্জন অন্ধকারের আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য আছে। সব কিছুকে একই রকম মনে হয়। এমন পরিবেশে অদেখাকে দেখা যায়, নিজেকে দেখা যায়।
জীবনের চ্যালেঞ্জ গুলো শেষ করে বার্ধক্যে পৌঁছালে মানুষ নিজ নিজ জীবনের কর্মফলটা মিলিয়ে দেখতে চায়। কর্ম চাঞ্চল্যে ভরা দিন গুলোতে যার সুযোগ ছিল না। এই বয়েসে এসে যখন বড় হয়ে যাওয়া ছেলে মেয়ে, অতি যত্নে লালিত সংসার, এমনকি সারা জীবন ধরে এত যত্ন নেয়া শরীরটাও নিজের মত করে চলতে চাই তখন মানুষ দৃষ্টিটা নিজের দিকে ফেরাই। তখন সব কিছু গভীর ভাবে ডুবে থাকা স্বপ্ন ভেঙ্গে জেগে উঠার মত মনে হয়।

বার্ধক্যে শরীরের বল হারিয়ে গেলে যেমন যৌবনে পাওয়া ব্যথাগুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তেমনি জীবনের পড়ন্ত বেলাই কর্মচাঞ্চল্যতা হারানো মানুষের মনে অতীত অসফলতার ঘটনাগুলো অতীব তীক্ষ্ণ ভাবে বিধতে থাকে। বিষয়টাকে অনেকটা সেই ছোট বেলায় ফুটবল খেলার সময় পাওয়া ব্যাথার সাথে তুলনা করা যায়। খেলার সময় গা গরম থাকার ফলেই হোক বা প্রতিপক্ষের গোল পোষ্টে বলটা ঢুকানোর ব্যাকুলতার জন্যই হোক সে ব্যাথা অনুভুত হয় না। কিন্তু অবসন্ন দেহে ঘুমিয়ে পড়লে ঘুমের মধ্যে ব্যাথাটা ঠিকই অনুভুত হয়ে ঘুম ভেঙ্গে যায়।
বার্ধক্যে এসে মানুষ কোন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলে যাপিত জীবনের পরতে পরতে ঘটা বিফলতা গুলো মনের আকাশকে কালো মেঘে ঢেকে ফেলে জীবনের অর্থ সম্পর্কে মনে একটা হতাশা সৃষ্টি করে।

উঠে দাড়ালেন আবীর চৌধুরী। অন্ধকারে আকাশে চাঁদ না থাকলেও তারার আলোয় যে সবকিছু এত পরিষ্কার হয়ে ওঠে সেটা এই প্রথম উপলব্ধি করলেন তিনি। পাথর কালো অন্ধকারটা ফিকে লাগতে লাগলো।

Category: Meaning of Life

Write a comment