রবি আর সূর্য যমজ দুই ভাই। জমিদার অবনী আর তার স্ত্রী ভাবনা চৌধুরী ওভাবেই মিলিয়ে তাদের যমজ ছেলের নাম দুটো রেখেছেন। মিনিট পাচেকের ব্যবধানে দুজনের জন্ম। বিয়ের পর প্রায় সাত বছর পর যমজ সন্তানের জন্ম তাদের বাচ্চা না হওয়ার সব আক্ষেপ আর মর্মবেদনা সব যেন নিমেষেই উবে গিয়েছিল।
মায়ের কোল আলো করে যমজ দু ভাই আদরে সোহাগে বড় হয়েছে।
ছোট কাল থেকেই ওদের মা ভাবনা চৌধুরী দুই ছেলেকে একই রকম জামা কাপড় পরিয়ে একই রকম খেলনা কিনে দিয়ে বড় করেছেন।
দুজন যেন বাবা মায়ের চোখের দুটো মনি।
ওরা দুভাই দেখতেও অবিকল একই রকম, নাকে মুখে গায়ের রঙে সব কিছুতেই। পাশা পাশি দাড় করিয়ে খুব নিখুঁত ভাবে দেখলে রবিকে সূর্যের থেকে একটু লম্বা দেখা যায়। ওটা চোখের ভ্রমও হতে পারে আবার চুল ছোট বড় করে কাটার জন্যও হতে পারে।
দুজনই বাহ্যিক আচার আচরনেও একই রকম। দুজনই সমান ভাবে মা বাবা ভক্ত আর জমিদারীর সব কর্মচারী আর প্রজাদের অতি স্নেহের পাত্র। জমিদার বাড়ীর বিশাল অঙ্গনে সারাদিন খেলাধুলা দৌড়াদৌড়ি করে দিন কাটে দু’ভাইয়ের।
সন্ধ্যাই বাড়ী ফিরলে মা দু’জনকেই হাত মুখ ধুইয়ে দিয়ে নিজ ঘরে নিয়ে এসে কিছুক্ষন তাদের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আদর করে তারপর কিছু খাবার খায়িয়ে পড়াতে বসান।
এটা মা আর ছেলেদের চিরাচরিত একটা রুটিন।

কিন্তু ইদানিং ভাবনা চৌধুরী খেয়াল করছেন যে ওদেরকে বুকে জড়িয়ে আদর করার সময় রবি চুপচাপ মায়ের আদর উপভোগ করলেও সূর্য যেন সে ভাবে তা উপভোগ করছে না। ও যেন এসময়ে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে মায়ের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চায়।
বেশ কিছুদিন সেটা অনুভব করে ছেলের অপছন্দের কাজ না করার জন্য ধীরে ধীরে ভাবনা চৌধুরী সূর্যকে সেভাবে আলিঙ্গন না করে ওর কপালে আর চোয়ালে আদর করে আর রবিকে আগের মতই বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখে বেশ কিছুক্ষণ।

ছোটকাল থেকেই সূর্য নিজের পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারে খুব খুতখুতে আর সব কিছুতেই জিততেই হবে এমন একটা প্রবনতা ওর মধ্যে লক্ষণীয়। অন্য দিকে আন্তরিক ভাবে অংশগ্রহন আর খেলাতেই রবির আনন্দ, হার জিত কোন বিষয় না ওর কাছে।
দুই ছেলেকেই একই সাথে অবনী চৌধুরী একই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন।

পড়াশোনাই মনোযোগী সূর্য সব সময় রবির থেকে ভাল রেজাল্ট করে ক্লাসে বরাবরই ফার্স্ট হতে লাগলো। দিনে দিনে এ ব্যপারে সূর্যের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ লক্ষণীয় হয়ে উঠলো।
অন্যদিকে রবি জমিদার বাড়ির কর্মচারী আর প্রজাদের সাথে সারাক্ষন সময় কাটাতে পছন্দ করে, পড়াশোনার প্রতি ওর মনোযোগ একটু কম। তাই নিজের রেজাল্ট অতটা ভাল না হওয়ার জন্য ওর মনে তেমন কোন খেদ পরিলক্ষিত হত না। কিন্তু তার ভায়ের রেজাল্ট ভাল হওয়ার জন্য সে খুব খুশী হয় এবং তা নিয়ে গর্ব বোধ করে ভাইয়ের অলক্ষে সকলের কাছে ভাইয়ের প্রশংসাও করে থাকে।

প্রতি বছর ভাল রেজাল্ট করাতে এবং শিক্ষক, সহপাঠী এবং অন্যান্য গুরুজনদের কাছ থেকে প্রশংসা পেতে পেতে সূর্যের গর্ববোধ করাটা ধীরে ধীরে বেশ প্রতিভাত হয়ে উঠতে লাগলো। আর সে তার বন্ধু বান্ধব মা বাবা এমনকি তার যমজ ভায়ের কাছ থেকেও তার দেখানো স্বীকৃতি আদায়ের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করত বিভিন্ন ভাবে।
সাফল্যের স্বীকৃতি খোলাখুলি ভাবে না পেলে সূর্য আজকাল অধৈর্য হয়ে তার অসন্তুষ্টির ভাবটা প্রকাশ করেও ফেলতে লাগলো কখনো কখনো।
তার ভাই রবি তাকে সকলের সামনে প্রশংশা না করার জন্য তাকেও কয়েকবার মৃদু ভৎসনা করে সে ব্যাপারে মায়ের কাছে অভিযোগও করলো ইতিমধ্যে।

এমনিই বোধহয় হয়। মেধা বা ভাগ্যের জোর সে যে ভাবেই হোক, কেউ অবিরাম ভাবে সাফল্য পেতে থাকলে যতক্ষণ এই পাওয়াটা সে অর্জন বলে মনে করতে পারে ততোক্ষণ তেমন কোন সমস্যা হয় না। তবে এই লাগাতার পাওয়াটা অর্জন বোধের আঙ্গিনা ছাড়িয়ে যদি কারো মনে অধিকার বোধের জন্ম দেয় তাহলেই সমস্যা।
অধিকার বোধ অন্ধ। আর তাই এমন বোধসম্পন্ন মানুষ তার স্বীকৃতি আদায় করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

সেবার সূর্য এনট্রান্স পরীক্ষাই বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করল, আর রবি ফেল করলো। রেজাল্ট বের হলে স্কুলের হেড মাষ্টার সহ অন্যান্য মাষ্টাররা ওকে অভিনন্দন জানালো এবং স্কুলে আনুষ্ঠানিক ভাবে সকল মাষ্টার, গার্ডিয়ান অন্যান্য সহপাঠিদের নিয়ে সূর্যকে সংবর্ধনা দেয়ার আয়োজন করা হল।
জমিদার আবীর চৌধুরী নিজের গাড়ী করে ছেলেকে নিয়ে সে অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন।
অনুষ্ঠান শেষ হতে দেরী হওয়ার ফাকে রবি বাড়ীতে ফিরে আসলো এবং জমিদার বাড়ীর সব কর্মচারী এবং প্রজাদেরকে সূর্যের রেজাল্টের সংবাদ জানিয়ে তাদেরকে ফুলের মালা হাতে জমিদার এস্টেটের প্রধান গেট থেকে প্রাসাদ পর্যন্ত প্রায় দুশো গজ রাস্তার দুধারে দাড় করিয়ে ফুলের মালা সহ জয়ধ্বনি দিয়ে ভাইকে অভ্যর্থনার আয়োজন করল।
এস্টেটের গেটে এ অপ্রত্যাশিত আয়োজন দেখে কিছুটা অবাক হয়ে আবীর চৌধুরী সূর্যকে নিয়ে গাড়ী থেকে নামলেন। এস্টেটের বৃদ্ধ নায়েব আর রবি মিলে সূর্যকে মালা পরিয়ে দেয়ার সাথে সাথে দুধারে দাঁড়ানো কর্মচারী আর প্রজারা সূর্যের জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়ল।
সব কর্মচারী আর প্রজাদের কাছ থেকে ফুলের মালা গলাই পরতে পরতে সূর্য আত্মতুষ্টিতে ভরা পদক্ষেপে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভূতপূর্ব দৃশ্য প্রাসাদের সিড়িতে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন ভাবনা চৌধুরী।
দুপাশে দন্ডায়মান সকলের দেয়া জয়ধ্বনির সাথে তাদের পরানো মালা গলাই পরে বীর দর্পে প্রাসাদের দিকে হেটে আসার দৃশ্য এক অভূতপূর্ব আবহের অবতারণা করল। সূর্য তার গলা মালায় ভরে গেলে সেগুলো নামিয়ে পিছন পিছন হাটতে থাকা ভায়ের হাতে দিতে লাগলো।

এক ছেলের বিজয়ের উল্লাসিত আনন্দের অতিসহ্য আর অন্য ছেলের পরাজয়ের বেদনা ঢেকে ভাইয়ের আনন্দে আপ্লুত হওয়ার এক অভাবনীয় দৃশ্য। বিজয়ের উল্লাসে সূর্যের দেহযষ্টিতে যে আনন্দের বন্যা বয়ে চলেছে সে ঢেউয়ে রবিও পুরোপুরি আপ্লুত। এটা হরিষে বিষাদের মত একটি ঘটনা হলেও বিষাদের কোন লেশ মাত্র রবির মধ্যে পরিলক্ষিত না হওয়াই এটা একটা নির্বিষ সুখানুভবের দৃশ্যের অবতারণা হল।
বিজয়োল্লাস রত সূর্য আর তা থেকে উচ্ছরিত রশ্মিতে উদ্ভাসিত পরাজিত রবি, দুই ছেলের সাথে পদবিক্ষেপ রত জমিদার আবীর চৌধুরীর হাঁটুনির ভাষা যেন ছিল পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। তিনি যেন বিজয় আর পরাজয়ের মাঝে গোলকধাঁধায় মূর্ত এক শরীর।
প্রাসাদের উঁচু আস্থাপনের লম্বা সোপানের মাঝখানে দাঁড়ীয়ে ভাবনা চৌধুরী এ সব কিছু অবলোকন করতে করতে কখন সূর্য সোপানে উঠে এসেছে তিনি খেয়ালই করেননি।
বিজয়ের হাসিতে উদ্ভাসিত সূর্য মায়ের পাশে একই সোপানে দাঁড়ালো।
সেদিনের ছেলে হলে কি হবে একই সোপানে দাঁড়ানো সূর্যের মুখটা মায়ের থেকে প্রায় এক মাথা উচুতে। ছেলে এত বড় হয়েছে ভাবনা চৌধুরী এই প্রথম সেটা উপলব্ধি করলেন।
তিনি এক সোপান উপরে উঠে কোন রকমে ছেলের মুখোমুখি হয়ে তার গালে ও কপালে অভিনন্দনের চুম্বন করলেন।
আবীর চৌধুরী তার পত্নী ও দুই ছেলে সহ একই সোপানে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে জড় হওয়া সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন।
সূর্যের আকাশছোঁয়া রেজাল্ট জমিদারীর কর্মচারী আর প্রজাদের কতটুকু ছুতে পারল তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ এ ধরণের কোন প্রাপ্তি শুধু মাত্র যে পায় তাকেই সমৃদ্ধ করে আর তাকেই স্পর্শ করে। বলা যায় তাদের উল্লাস প্রকাশ সূর্যের ভাল রেজাল্টের জন্য যতটা নয় তার থেকে বেশী রবির আহবানে সাড়া দেয়া। রবির মহানুভবতা কর্মচারী এবং প্রজাদের ওর প্রতি সব সময় আকর্ষণ করে রাখে।
ধীরে ধীরে সবাই সে স্থান ত্যাগ করে নিজ নিজ কাজে চলে গেল।
অভিনন্দন গ্রহনে ক্লান্ত সূর্য সিড়ি বেয়ে উঠে উপরে তার কক্ষে চলে গেল। আবীর চৌধুরী অতিরিক্ত কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করা ছাড়াই কিছুটা নির্লিপ্ত ভাবে ক্লান্ত পদভারে হেটে প্রাসাদের পিছনে বাগানের দিকে চলে গেলেন।
রবি এক সোপান নিচে নেমে মাথা কিছুটা নুইয়ে মায়ের উচ্চতার সাথে সমতা এনে দাঁড়ালো। ভাবনা চৌধুরী ছেলেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। ছেলেরা বড় হয়েছে তাই তিনি তাদেরকে কখনই এভাবে প্রকাশ্যে আদর করেন না। কিন্তু আজ তার ব্যাতিক্রম ঘটল।
রবি কিছুটা অবাক হয়ে মায়ের চোখে তাকাল, তারপর স্বাভাবিক পদক্ষেপে নিচ তলায় মায়ের ঘরের দিকে চলে গেল।

ততোক্ষণে বেলা বেশ খানিকটা গড়িয়ে পড়েছে। গ্রীষ্মের এই পড়ন্ত বেলাই চারদিকটা নিস্তব্দ। গাছের ডালপালাও তেমন নড়ছে না। জমিদার এস্টেটের বনরাজীর শাখায় কয়েকটা ঘুঘুর ডাক ছাড়া আর কোন শব্দই কানে আসছে না।
ভাবনা চৌধুরী কিছুটা অনিচ্ছুক ভাবে ধীর পদভারে অন্দর মহলে প্রবেশ করলেন।
নিচে প্রকান্ড বসার ঘর সাথে লাগোয়া নায়েব সহ অন্যান্য কর্মচারীদের অফিস ইত্যাদি, এগুলো পার হয়ে ভিতরের দিকে একাটা প্রশস্ত কামরায় তিনি থাকেন। ছেলেরা উপরে পাশাপাশি দুটো রুমে থাকে আর উপর নিচ মিলে বেশ কয়েকটা মেহমান খানা।
দেখলেন তার শোয়ার কক্ষটার দরজা অর্ধ ভেজানো। উকি দিতেই চোখে পড়ল রবি উপুড় হয়ে শুয়ে।
একটু অবাকই হলেন তিনি। রবি যে মাঝে মধ্যে বাবা মার কক্ষে আসে না বা শোই না তেমনটি নয়। কিন্তু ছেলেকে ওভাবে তার বেডে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুজে শুয়ে থাকতে দেখে একদম ভাল লাগলো না ভাবনা চৌধুরীর। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছেলেকে দেখলেন।
উপরে সূর্যের ঘর থেকে গ্রামফোনে বাজানো গানের সুর ভেসে এসে তার সম্বিত ফিরাল।
কি করবেন কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

জীবনের অনেকগুলো বছর পার হয়েছে। আনন্দ বেদনায় ভরা এ জীবন তা তিনি জানেন। এর একটা ঘটতে থাকলে অন্যটা গা ঢাকা দেয়। কিন্তু এ কি হচ্ছে তার জীবনে, একই সাথে আনন্দের অতিসহ্যের পাশাপাশি বেদনার ব্যথাও প্রবাহমান।
কিছুদিন পর সূর্য বিদেশে পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমাবে। এ দেশ এ সব জমিদারী ইত্যাদি তার একদম পছন্দ না। আর ওর মত মেধা সম্পন্ন ছেলের জন্য লেখাপড়া শিখে ওদেশে স্থায়ী ভাবে থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা করা তেমন কোন বিষয় না।
পরের বার পাশ করা এবং এ দেশে থেকেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করা রবির জন্যও কঠিন কোন বিষয় না। আর রবি এই জমিদারী, এখানকার সব মানুষ ওর খুব পছন্দ। কর্মচারী প্রজা সবাই রবির সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই বাবার জমিদারী ভাল ভাবে চালিয়ে নিতে ওর কোন অসুবিধাই হবে না।

ভাবনা চৌধুরী কিছুটা অন্য মনস্ক ভাবে হাটতে হাটতে প্রাসাদের ভিতরে অবস্থিত দীঘিটার দিকে গেলেন। এদিকটা অন্দর মহলের অংশ তাই বাড়ির লোক ছাড়া অন্য কেউ এদিকে আসে না। প্রশস্ত দীঘির পাড়ে সান বাধানো ঘাট। নির্জনে সময় কাটানোর জন্য তিনি এদিকটাতে আসেন।
ঘাটে আত্মভোলা হয়ে বসা আবীর চৌধুরী। তিনি স্বামীর পাশে বসলেন। পাশে স্ত্রীর টের পেয়েও তিনি কিছু প্রকাশ করলেন না।
সূর্য ততোক্ষণে পশিম আকাশে হেলে পড়ে গাছের ছায়া ঢাকা ঘাটটা প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। কিছুক্ষনের মধ্যে রবি এসে বসলো বাবা মায়ের পাশে।
নিস্তব্দতাই ভরা চারদিক। সূর্যের কক্ষ থেকে হালকা ভাবে ইংরেজি গানের সূর ভেসে আসছে।

-মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে—— বেসুরো কন্ঠে মালি রামদয়ালের কন্ঠ শোনা গেল।

Category: Meaning of Life

Write a comment