মনের তৃপ্তি খুজে না পাওয়ার বেদনা মানিকের আজন্ম। তৃপ্তির জন্য ন্যায় অন্যায় কত কিছুই না করেছে জীবনে কিন্তু তবুও তৃপ্তিটা যেন মরিচিকার মত অধরাই রয়ে গেল।
তৃপ্তির অন্বেষণে রত মানিক এই মুহূর্তে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের উপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘ দিনের আশা পূর্ণ হওয়ার প্রশান্তিতে মনটা ভরপুর করতে দূহাত দিগন্ত বরাবর প্রসারিত করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল।
প্রশান্তিতে দেহ মন দুইই ভরে যেতে লাগলো।
আহ কি অপরুপ প্রকৃতির এ লীলা! তিন শত ফুটেরও অধিক উচ্চতা থেকে ধেয়ে আসা জিম্বেজি নদীর হাজার হাজার গ্যালন পানি প্রচণ্ড বেগে গভীর খাদে লাফিয়ে পড়ে যে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারনা করছে তা হাঁ করে দেখার মতই ব্যপার। এ দৃশ্য যে কোন অতৃপ্ত মনকে উদাস করে প্রশান্ত করে দেয়।
সব কিছু হৃদয়ের গভীরে অনুভব করে প্রকৃতির এই অতুলনীয় সৌন্দর্যকে হৃদয়ে গেথে রাখার মানসে চোখ দুটো বন্দ করলো মানিক।
ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের পাশে দাঁড়িয়ে দুচোখ বন্ধ করতেই মনে পড়তে লাগলো নায়াগ্রার কথা, রাইনের কথা। এটাকে অন্যান্য জলপ্রপাতের সাথে তুলনা করতে মন চাইল।
এটা বোধহয় মানুষের অতৃপ্ত মনের সীমাবদ্ধতা –মন সব কিছুকে তুলনা করে যাচায় করতে চায়। বর্তমানকে নিয়ে মন কখনো খুশী থাকে না, সব কিছু তুলনা করে দেখার জন্য অতীত স্মৃতিতে ডুব দেয় আর বাস্তব বা শোনা কিছু থেকে কল্পনাপ্রসূত ভবিষ্যতেও বিচরন করতে চায়।
চোখ বন্ধ করতেই মন স্মৃতি রোমন্থনে ডুব দিয়ে অতীতে হারিয়ে গেল। চোখ কান মনকে তৃপ্তি দেয়া সামনেই ঘটমান ভিক্টোরিয়ার অপরুপ লীলা যেন পর্দা থেকে সরে গেল।
পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া কয়েকজন ছেলেমেয়ের কথা বার্তায় সম্বিৎ ফিরে পেল মানিক। জলপ্রপাতের আরো ভিতর থেকে প্রকৃতির এই অপূর্ব লীলা অবলোকন করে আনন্দে ডগমগ করতে করতে ফিরছে তারা।
সময়টা ভরা দুপুর কিছুটা নির্জন। মানিকও ফেরার জন্য পা বাড়াল।
অদূরেই উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে লিভিংস্টোনের মর্মর মূর্তি। দাঁড়ালো মূর্তির পাদদেশে। সেদিকে তাকিয়ে ওই ফিরিঙ্গী ভিনদেশী মানুষটি যিনি এই জলপ্রপাতটি আবিষ্কার করেছিলেন তার ভাবনাই হারিয়ে গেল মানিক। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি এই জলপ্রপাতটা আবিষ্কার করে নামকরণ করেছিলেন তার দেশের রানীর নামে।

সে সময় এ জায়গাটা পুরো জঙ্গলে ভরা ছিল। দূর থেকে জলপ্রপাতের অবিরাম গর্জনরত জলের ধোঁয়া দেখে ওখানকার অধিবাসীরা এটাকে ‘গর্জনরত ধোঁয়া’ বলে আখ্যায়িত করতো এবং অনেকে ওটা দেবতার আক্রোশের বহিঃপ্রকাশের মত কিছু একটা ভেবে সভয়ে দূর থেকে মাথা নোয়াত। লিভিংস্টোনই প্রথম সাহস করে ডিঙ্গি নৌকায় করে খরস্রোতা জিম্বেজি নদী ধরে বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করেন।
-কি দেখছ এখানে দাঁড়িয়ে?
চিন্তা জগতে ছেদ পড়লো মানিকের। পাশে দাঁড়িয়ে জিম্বাবুইয়ান এক তরুণী।
অরণ্যে ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই নির্জন স্থানে ওকে অপরুপ লাগলো মানিকের চোখে। কৃষ্ণকায় মেয়েরা যে এত সুন্দর দেখতে হয় সেটা প্রকৃতই ওর জানা ছিল না।
মানিকের চেনা জানা বা দেখা স্মৃতিতে লেগে থাকা অনেক মেয়ের ছবিই আছে কিন্তু এই মুহূর্তে ওকে কারো সাথে তুলনা করতে একদম মন চাইলো না। এই মুহূর্তে ওকে দেখে মনে হল ও যেন এই অভেদ্য সুন্দর প্রকৃতির কন্যা।
মেয়েটি নিজেকে ফ্লোরা বলে পরিচয় দিয়ে হারারেতে একটি ইউনিভারসিটিতে পড়ে বলে জানালো। মানিকের মত সেও ঘুরতে এসেছে বলে জানালো সংক্ষেপে।
মানিকও নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে পরিচিত হল। ওরা দুজনে মর্মর মূর্তির স্তম্ভের পাদদেশে একটা সিড়ির উপর বসলো পাশাপাশি।
ফ্লোরা জানালো যে সেও মানিকের মত কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভিক্টিরিয়া ফলস টাউনে একটা হোটেলে উঠেছে। অল্প সময়েই বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো ওরা। এখান থেকে মানিকের গাড়ি করে ওরা একত্রে ফিরবে বলেও একটা অবলা চুক্তি হল।
সদ্য পরিচিত ফ্লোরা যাকে প্রথম দেখাতেই মানিকের খুব পছন্দ হল তাকে খুশী করার জন্য মানিক ওর ব্যাকপ্যাক থেকে ক্যাসুনাট আর দুটো কোকের ক্যান বের করে ওকে অফার করল।
-লিভিংস্টোনের কাছে সত্যিই আমরা কৃতজ্ঞ। এই গহীন অরণ্যে এই জলপ্রপাত আবিষ্কার করে সে তোমাদের দেশকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করিয়েছে, আর সে কল্যানেই আমি এবং আমার মত কত মানুষ প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে উপভোগের জন্য এই ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতে ছুটে আসছে।
ফ্লোরা কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল মানিকের দিকে।
মানিকের উচ্ছ্বাসে যোগ না দিয়ে ওভাবে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকাটা মানিককে কিছুটা অপ্রস্তুত করল।
মানিকও কিছুটা জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকাল ফ্লোরার দিকে।
-তুমি, এই জলপ্রপাতের কি নাম বললে?
-কেন, ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত। কিছু ভুল বলেছি?
মানিকের আত্মবিশ্বাসী উত্তরে ফ্লোরার মুখাবয়বের কোন পরিবর্তন নজরে পড়লো না।
-ভিক্টোরিয়া? তিনি তো ইংল্যান্ডের রাণী ছিলেন, এদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। তার নাম এখানে আসছে কি ভাবে?
ফ্লোরার কথাই একটু অবাক হল মানিক। ভাবল ও বোধহয় হেয়ালি করছে।
-এই জলপ্রপাতের নাম ‘মসি-ওয়া-তুন্যা’, অর্থাৎ ‘গর্জনরত ধোয়া’।
ফ্লোরার ভাব লেশহীন কথাই মানিক সত্যি সত্যিই অবাক হল। যে ব্যাক্তি সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে এখানে এসে এই প্রাকৃতিক সপ্ত আশ্চর্য এই বিস্ময়টি আবিষ্কার করলো সে বিষয়টা উনিসিভারসিটিতে পড়া এই মেয়েটি জানে না!
মানিকের অবাক হওয়ার প্রেক্ষিতে ফ্লোরা একটু স্মিত হাসল।
-আচ্ছা বল, এই যে আমি আর আমরা এখানে আছি যুগ যুগ ধরে, যেটা তুমি জানতে না, আজ হটাৎ এসে আমাকে দেখে তুমি বললে যে, তুমি আমাকে আবিষ্কার করেছো, তাহলে ব্যাপারটা হাস্যস্কর মনে হবে না?
মানিক সে ভাবেই তাকিয়ে ওর দিকে। ভাবল ওর কথায় যুক্তি আছে।
মেয়েটি এমন আবেগাপ্লুত হয়ে উঠল যে ওর দেহভঙ্গিতে তা প্রকাশিত হতে লাগলো।
-তুমি কি মনে কর লিভিংস্টোনের এই মূর্তি আর এই নাম চি্রকাল থাকবে?
প্রশ্নটা করে ফ্লোরা তাকাল সরাসরি মানিকের চোখে।
-তুমি কি স্বীকার কর না, যে এই মূর্তিটি জলপ্রপাত আবিষ্কারের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। তাই আমি মনে করি মূর্তিটি থাকতে পারে আর তার দেয়া নামটিও।
মানিকের কথা ওর একদম পছন্দ হল না বোঝা গেল।
-আমরা বড় হলে এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলব আর এ নামও পরিবর্তন করে ফেলব।
-আচ্ছা বাদ দাও সেসব, চল আমরা এর সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলি যেটা শাশ্বত, নাম বা এর ইতিহাসের সাথে যার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।
অনাক্ষিত ভাবে বদলে যাওয়া কিছুটা অস্বস্তিকর পরিবেশটা হালকা করার জন্য মানিক কথাটা বলল।
কিন্তু তাতে ফ্লোরার ভাবাবেগটা একটুও কমলো বলে মনে হল না।
মানুষের মন পরোপুরি ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রিত একটা অদ্ভুত বিষয়, ভীষণ শক্তিশালী, পার্থিব সব ধরণের আবেগ মন থেকে নিঃসৃত হয়ে মানুষের আচার ব্যবহার, সম্পর্ক, ভালবাসা, ঘৃণা এমনকি শারীরিক অবস্থা সব কিছুকেই প্রভাবিত করে।
মন কারো নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করলে অনেকটা অনিয়ন্ত্রিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেনসের মত কাজ করে। পরিবর্তিত পারিপার্শ্বিকতা, যৌক্তিকতা, মানবিকতা ইত্যাদি বিষয়গুলি অবান্তর হয়ে সেটি পূর্ব নির্ধারিত পথে অর্থাৎ প্রোগ্রামিং অনুযায়ী কাজ করে।
-দেখ, সত্য সব সময়ই সুন্দর আর কালজয়ী। আমি মনে করি কালে কালে এই জলপ্রপাতের প্রকৃত নামও মানুষ জানবে, সেই সাথে এটার সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসও জানবে। কিন্তু সৌন্দর্যটা একই থাকবে।
ফ্লোরা অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো। আর মানিকের দেয়া ক্যাসুনাট খাওয়া ও কোকে চুমুক দেয়াও বন্দ করলো।
ওর এই মনোভাব মানিকের কাছে বোধগম্য হলেও ওর এর মুহূর্তের মন-নিয়ন্ত্রিত
আচরণ মানিকের চোখে ওর নিষ্কলুষ ব্যহিক সৌন্দর্যকে ফিকে করে দিল।

Category: Meaning of Life

Write a comment