Heading
আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৯
ঈশ্বর চন্দ্রের রাজ্য। পন্ডিতদের দিয়ে রাজ্য চালান তিনি।
রাজ্যের উত্তর দক্ষিন পূর্ব পশ্চিম দিক গুলো দেখার জন্য এক একজন করে পন্ডিত নিযুক্ত আছে। এছাড়া উপর আর নিচ দিক দেখার জন্য বাড়তি একজন পন্ডিত। সব মিলে ঈশ্বরের পাঁচ পন্ডিত।
রাজ্যের যা কিছু ভাল খারাপ যে দিক দিয়ে ঘটবে তার সব কিছুরই দায় দায়িত্ব নির্দিষ্ট পন্ডিতের। দিকের সাথে মিলিয়ে পন্ডিতদের নামকরণ করা। তায় তাঁরা পূর্ব পন্ডিত, পশ্চিম পন্ডিত, উত্তর পন্ডিত, দক্ষিণ পন্ডিত আর ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিত বলে পরিচিত।
গরমের দিনে দখিনা বাতাস যেমন সবার শরীরে আদরের পরশ বুলিয়ে দেয় আবার ঠিক মত বাতাস না বইলে প্রজাদের কষ্ট হয়। শীতের সময়ও তেমনি; উত্তর থেকে বরফ শীতল বাতাস যদি তেমন জোরে না বয় তবে সূর্য্য পিঠ হয়ে বসে সবাই আনন্দ করে। আর তখন বাতাস বইতে শুরু করলে সবকিছু যেন জমিয়ে দিতে চায়। মেঘমুক্ত শীতের আকাশে সকাল সন্ধ্যের সূর্য্য কিরণ যেমন সবাই উপভোগ করে তেমনি আবার গ্রীষ্মে তাপ খরতাপ হয়ে জনজীবন অসহনীয় করে তোলে।
আকাশটা বেজায় খেয়ালী- হয় অতিবৃষ্টি না হয় অনাবৃষ্টি। বন্যা খরা লেগেই আছে প্রতি বছর। প্রজাদের দুঃখের আর সীমা নেই। বন্যা আর খরা এ দুটোর সাথেই আকাশ আর মাটির সম্পর্ক। আকাশ থেকে বেশী বৃষ্টি পড়লে বন্যা হয়ে সব ফসল ঘর বাড়ী তলিয়ে যায়। আবার কম বৃষ্টি পড়লে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে ফসল, গবাদি পশু সব মারা যায়।
প্রজাদের হাহাকারে বাতাস ভারী হয়।
এদিক সেদিক হলেই প্রজা সাধারণের কষ্ট হয় আর সবাই মিলে ধর্না দেয় ঈশ্বরের দরবারে। পন্ডিতেরা জানে যে এ সবের জন্যে ঈশ্বরের দরবারে ডাক পড়বে তাদের জবাবদিহীতার জন্য।
উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমের তুলনায় ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিতের বড্ড দয়ার শরীর। মাথার তুলনায় হৃদয়টা ওর বেশী কাজ করে বলে অন্যান্য পন্ডিতরা বলাবলি করে। প্রজাদের প্রতি বছরের এ কষ্ট ঊর্ধ্ব-অধঃ'র একদম সহ্য হয় না।
হৃদয়ের বাস যে শরীরের ভিতর- আর তায়তো উর্ধ্ব-অধঃ প্রজাদের দুঃখ কষ্ট লাঘবে নিজেই ঝাপিয়ে পড়ে গায়ের সব শক্তি দিয়ে।
আকাশ থেকে আসা সমস্যার সমাধানে উর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিত ভাবে - ঠিক আছে পুরো আকাশতো আর ঢেকে দেয়া যাবে না তায় অতি বৃষ্টির হাত থেকে বাচানোর জন্য পাঠশালা, খেলার মাঠ, বাজার ঘাট, বসত বাড়ী এ সমস্ত জায়গায় বড় বড় ছাউনি তৈরী করলে কেমন হয়। বন্যায় মানুষেরা তাদের জিনিসপত্র আর পশু পাখি নিয়ে আশ্রয় নিতে পারবে। আর অন্যদিকে সব নদী খাল পুনঃখনন করলে, বড় বড় দীঘি খনন করলে অতি বৃষ্টির জল নদী খাল দিয়ে চলে যাবে বা বড় বড় দিঘিতে জমা হবে।
তাতে বন্যা হবে না, তারপর খরা আসলেও ধরে রাখা জল সেচ কাজে ব্যবহার করা যাবে। নদী খাল আর দীঘি কাটা মাটি দিয়ে বসত বাড়ী পাঠশালা বাজার ঘাট খেলার মাঠ সব উঁচুও করা যাবে।
-কিন্তু সে যে অনেক পরিশ্রম আর খচ্চার ব্যাপার!
প্রজাদের মন্তব্যে কান না দিয়ে পন্ডিত নিজেই নেমে পড়লো কাজে। বর্ষা আসার আগেই শেষ করতে হবে সব কাজ।
হাজার হলেও পণ্ডিত নিজে কাজে লেগেছে, প্রজারা কি আর থেমে থাকতে পারে। অন্য সব কাজ ফেলে উর্ধ্ব-অধঃ পণ্ডিতের সাথে হাত লাগালো সবাই। নদী খাল দিঘী কাটা শেষ করে শ্রমক্লান্ত প্রজারা বন্যা খরার হাত থেকে নিশ্চিত রেহায় পাওয়ার স্বপ্নে সুখনিদ্রা গেল।
বর্ষাকাল আসলো। সবাই চাতক পাখীর মত তাকিয়ে রইলো আকাশের দিকে। আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। অতি বৃষ্টি হলে কোন সমস্যা নেই। সে জন্য প্রস্তুত ওরা।
কিন্তু একি! কিছু ছিটে ফোটা ছাড়া, আকাশ ফুটো করে বৃষ্টি হলো না।
প্রচন্ড বেগে বাতাস বইতে লাগলো। কাল বৈশাখী! চোখের নিমিষেই লন্ডভন্ড করে দিল সব কিছু। ঘর বাড়ী হারিয়ে সর্বশ্রান্ত প্রজারা আহাজারী করতে লাগলো। প্রজাদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।
দারুন অসহায় সব প্রজারা। ঘর বাড়ী ভেঙ্গে মাথা গোজার একটু ঠাইও নেই। কাপড় চোপড় খাবার দাবার সব ছিটে ফোটা বৃষ্টিতে ভিজে শেষ। আকাশ কালো হয়েই আছে। সকালেও রোদ নেই বিকেলেও না।
সবার মাথায় হাত। কি হলো এসব।
ভারী চিন্তায় পড়ে গেল পন্ডিতেরা। জবাবদীহি তাদেরকেই করতে হবে। নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত দিকগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে কি জবাব দেবে ঈশ্বরকে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু করলো পন্ডিতেরা।
-কাল বৈশাখীর মেঘ করেছিল উত্তর পশ্চিম কোণায়। ভাল করে অবলোকন করলাম। কালো কুচকুচে সে মেঘ। দেখলে পিলে চমকায়।
-কিন্তু সে মেঘ যে আমার দিককার নয়।
উত্তর পন্ডিতের মন্তব্যে তাকালো ওর দিকে অন্য সবাই।
তবে সন্দিগ্ধ হয়ে উঠলো পশ্চিম পন্ডিত।
বৈশাখের ঝড় নিয়েতো কখনো চিন্তায় করেনি সে। কারণ ওটাতো উত্তরের ব্যাপার। কিন্তু উত্তর এখন এ অবান্তর প্রসঙ্গ তুলে কি বলতে চায়! এ জন্যই বলে ভাল প্রতিবেশী দরকার।
ভাবলো পশ্চিম পন্ডিত। চোখ ড্যবড্যব করে তাকালো উত্তর পন্ডিতের দিকে। আফসোচ হলো এমন অকৃতজ্ঞ একজনকে প্রতিবেশী হিসেবে পেয়ে।
পশ্চিমের অবস্থা অনুধাবন করে মুচকী হাসলো উত্তর।
-দাদা, ও মেঘের দায়িত্ব যে আমার না।
-তবে?
ক্ষিপ্তপ্রায় পশ্চিম।
-দায়িত্বটা তোমার ও না। একটু সময় নিয়ে জবাব দিল উত্তর পন্ডিত।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো পশ্চিম।
-তোমাকে বড্ড হেয়ালী লাগছে দাদা। তবে বলো দায়িত্বটা কার?
পুব আর দক্ষিণ পন্ডিত বলে উঠলো সমঃস্বরে।
-দায়িত্বটা আসলে আমাদের কারো না।
-হ্যেঁ! তিনজনই অবাক হলো এবার।
-আরে ওই দিকটা যে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম কোনটায় না। ওটা যে বায়ু কোণ।
বুঝতে একটু সময় নিল অন্যান্যরা। তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সবাই।
-তায়তো দাদা এতদিন চিন্তায় আসিনি যে মেঘের জন্য সুর্য্য কিরণ পড়ে না, সকালেও না বিকেলেও না, তাতে আমাদের কি করার আছে। ওসবতো ঊর্র্ধ্বের ব্যাপার।
-তুই ঠিকই বলেচিস পূর্ব। এতদিন খামাকা চিন্তায় পেরেশান হয়েছি। আর শীতের সুর্য্যও যে পূর্ব পশ্চিম বরাবর যায় না, হেলে যায়।
পশ্চিমের মন্তব্যে আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সবাই।
-পন্ডিত আমরা, বুদ্ধি বেচে জীবিকা চালায়। তায় সমস্যা আসলে বুদ্ধির গোড়ায় ধোয়া দিতেই হয়।
গড়গড়ার লম্বা নলের কল্কের আগাটা মুখে দিতে দিতে বললো উত্তর পন্ডিত।
-কিন্তু তায় বলে দায়িত্ব এড়ালেতো আর চলবে না দাদা। তায় চলো ঈশ্বরকে বলে প্রথমে দিকগুলোর সীমানা ঠিক করে নেয়া যাক।
গড়গড়াই একটা সুক টান দিল উত্তর পন্ডিত।
-দরকার হলে ঈশান, নৈর্ঋত, বায়ু আর অগ্নি কোণের জন্য আরো চার পন্ডিতের এ্যাপোয়েন্টমেণ্ট দেয়ার সুপারিশ করতে হবে ঈশ্বরের কাছে। এটা দায়িত্বের ব্যাপার, তায় সবকিছু স্ফটিকের মত স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সবাই তাকিয়ে উত্তর পন্ডিতের দিকে। সবাই চিরঋণী হয়ে রইলো উত্তরের পান্ডিত্বের কাছে আর সমঃস্বরে ওর তারিফ করতে লাগলো।
-সাধেই কি বলি দাদা বুদ্ধির গোড়ায় নিয়মিত ধোয়া দেয়া দরকার। বিলম্ব না করে কল্কে ধরো সবাই।
সকলে সাঈ দিল উত্তরের প্রস্তাবে।
ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিত সাধারণতঃ আসে না এ ধরণের বৈঠকে।
-ও মাথা খাটায় না, খাটায় গতর।
এই প্রথম বারের মত কল্কেতে টান দিয়ে কাসতে কাসতে বললো পুব পন্ডিত।
অতি বর্ষনের আশা করে ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিতের পরামর্শে প্রজারা ঘর বাড়ী বাজার ঘাটের পিছনে যা সম্বল ছিল তা ব্যয় করেছে। এখন না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে প্রজাদের। প্রজারা এ বোকামির জন্য ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিতকে দোষারোপ করতে লাগলো।
প্রজাদের এ অবস্থা দেখে ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিত অবনত মস্তকে দন্ডায়মান হয়ে রইলো।
মাস কয়েক আগেও যে সমস্ত প্রজা তাদেরকে বন্যা খরার হাত থেকে রেহায় দেয়ার পরিকল্পনার জন্য ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিতকে অবতার মনে করে নতযানু হয়ে শ্রদ্ধা জানাতো তারাই এখন ওদের এই দূরাবস্থার জন্য ওই পন্ডিতকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে বিচারের দাবী জানাতে লাগলো।
সেখানে দন্ডায়মান অন্যান্য পন্ডিতবর্গ যারা কিছুদিন আগ পর্যন্ত ঊর্ধ্ব-অধঃ পন্ডিতের জনপ্রিয়তা দেখে মনে মনে ঈর্ষা করতো ওরাও নিজেদের মধ্যে আফসোচ করতে লাগলো।
-হাজার হলেও ঊর্ধ্ব-অধঃ তো জাতে পন্ডিত। তায় একজন জাত পন্ডিতের এধরণের অপমান কি নীরবে সহ্য করা ঠিক হবে। ভাবছিলো ওরা সবাই।
-বেচারা জাতে পন্ডিত কিন্তু কাজে মাটির মানুষ। তায়তো বুদ্ধি না খরচ করে হৃদয়ের টানের কাছে সব ছেড়ে দিল।
উত্তর পন্ডিতের নিচু স্বরে মন্তব্যে অন্যান্য পন্ডিতেরাও সাঈ দিল।
-অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি এসবতো অদৃষ্টের হাত। সে সম্পর্কে আগাম কি কিছু বলা যায়, না করা যায়।
-আর অদৃষ্টের বিরূদ্ধে কিছু করতে যাওয়াটা কি যুক্তিযুক্ত? এ যে এক রকমের অধর্ম!
পূর্ব পন্ডিতের মন্তব্যে পশ্চিম পন্ডিত বললো কথাটা।
-এ যে অদৃষ্টের অসন্তুষ্টির ফল!
-চুপ করো, তোমরা কি পাগল হয়ে গেলে সবাই।
দক্ষিণ পন্ডিতকে থামিয়ে দিল উত্তর পন্ডিত।
-প্রজারা শুনতে পাবে। জানইতো মূর্খের দল না খেয়ে মরে যাওয়াটা মেনে নেবে। কিন্তু অদৃষ্টের আক্রোশ! তা কিছুতেই মানবে না।
উত্তর পন্ডিতের কথায় অন্য তিন পন্ডিত মজা করে হাত দিয়ে নিজ নিজ মুখ বন্ধ করলো।
-হাজার হলেও ঊর্ধ্ব-অধঃ যে আমাদের স্বজাতি। দোষটা এই যে ওর মাথাটা ওর কলজের দখলে। তার জন্য ওর অন্য যে শাস্তি হয় হোক, কিন্তু মুর্খ প্রজাদের রোষে তো পড়তে দেয়া যায় না। তাতে যে আমাদেরই জাত যাবে তা কি ভেবে দেখেছ?
-ওতো প্রজাদের কাতারে মিশে ওদের সাথে কায়িক প্ররিশ্রম করলো ছি ছি, তখনতো আমাদের জাত মানের তোয়াক্কা করলো না। আর এখন ওকে বাচানোর দায় আমাদের উপর?
স্বজাতির দোহায় ওকে বাচানোর জন্য উত্তর পন্ডিতের প্রস্তাবের বিরোধিতা করলো দক্ষিণ পন্ডিত।
এরই মধ্যে প্রজাদের গুঞ্জন শোনা গেল- ঈশ্বর আসছেন।
- ঈশ্বর আমাদের যুক্তিগুলো মানলে হয়।
পশ্চিম পন্ডিতের মন্তব্যে উত্তর তাকালো তার দিকে। চোখের ঈশারাই আশ্বস্থ করলো ওকে।
-পুব নতুন কল্কেটা এনেছো তো?
- ঈশ্বরের জন্য কল্কেরটাতো?
-হ্যেঁ, ফু দিয়ে দিয়ে আগুনটা জ্বালিয়ে রাখ। যাতে টানে টানে ধোয়া বের হয়। কল্কে ধরাতে পারলেই ঈশ্বরের বুদ্ধি খুলবে আর সব কিছু পরিষ্কার বুঝতে পারবেন তিনি। আরে আমরা যে সব দিক পন্ডিত।
-কিন্তু ঈশ্বরকে কল্কেটা ধরাবে কে?
পুবের প্রশ্নে মৃদু হাসলো উত্তর।
পুর্ব বন্দোবস্ত মত ঈশ্বরের খাস চাকর এসে হাজির হলো। গরম কল্কেটা ওর হাতে দিল উত্তর পন্ডিত।
- ঈশ্বর কল্কে ধরবেন তো?
ঈশ্বরচন্দ্রের খাস চাকরের প্রশ্নে ওর দিকে তাকালো সবাই।