জীবন থেকে নেয়া কাহিনী অবলম্বনে রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস 'অমৃতের সন্ধানে' পর্ব -৩।

আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৩:০০

অম্বরাবনী-৩ 

 

পড়াশোনার ক্ষেত্রে দশের একজনের মত সাধারণ একজন ছাত্র হয়ে থাকলে ওর কপালের পোড়া দাগটা বোধহয় ছিদ্রান্বেষীদের দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে রাখা সহজ হতো। কিন্তু সে কপাল অবনীর হলো না।
গল্পের মুল নায়কের উপর যখন স্পট লাইটটা ফেলা হয় তখন সব চোখ গুলোতো সেদিকেই আকৃষ্ট হবে। আর দর্শকের সরিতে বসা সবাই তখন কল্পনায় নিজেদেরকে এক একজন নায়ক ভাবতে শুরূ করে। এদের মধ্যে যারা পর্দার নায়কের তুলনায় নিজের অযোগ্যতাকে মেনে নেয়, তাদের চোখে নায়কের ভাল দিকগুলো অধিক প্রতিভাত হয়ে নিজেকে যৎসামান্য নায়কের মত ভাবতে পেরে সৌভাগ্যবান মনে করে।
কিন্তু অন্য যারা নায়ককে সামগ্রিক বিবেচনায় নিজেদের থেকে অযোগ্য মনে করে অর্থাৎ অবমুল্যায়ন করে। এরা তার ওই শ্রেষ্টত্ব যে কোন কারণে অযাচিতভাবে ওর ভাগ্যে জুটেছে বলে মনে করে। তারা তখন একধরনের জটিল হীনমানষিকতার স্বীকার হয়ে নায়ককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাকে ঘায়েল করার জন্য তার অপ্রাসঙ্গিক দুর্বল দিকগুলোকে খুঁজে ঘেঁটে বের করে সবার সামনে তুলে ধরে তাকে হেয় করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
ক্লাসে অবনীর মত একজন আত্মকেন্দ্রিক সাধারণ ঘরের কারো পক্ষে ভাল ফলাফল করাটা সবারই চক্ষুশূল হয়ে উঠলো। প্রতি বছর সবাইকে তাক লাগিয়ে অবনী ক্লাসের সেরা ছাত্রের মুকুটটা যখন মাথায় পরে, তখন ছিদ্রান্বেষীদের দৃষ্টি আরো শানিত হয়ে ওর বিজয় মুকুটের উপর না পড়ে আরো বেশী করে ওর কপালের পোড়া দাগটার উপর পড়ে।
কিন্তু কপালের দাগ নিয়ে ওর বন্ধুদের করা কটাক্ষকে অবনী গুরূত্বের মধ্যে না আনতে বদ্ধপরিকর রইলো।
সবাইকে তাক লাগিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে লাগলো অবনী। আর ও রীতিমত সবার ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠলো এবং বলা বাহুল্য ঈর্ষার ফলটা সবসময়ই ওর কপালের পোড়া দাগটার উপরই পড়তে লাগলো। ও যতই ভাল রেজাল্ট করতে লাগলো কপালের দাগটা নিয়ে বন্ধুদের কটাক্ষটাও আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলো।

অবনী নিজেকে শান্তনা দেয়ার জন্য ভাবলো –দিনে দিনে কপালের দাগাটা মিলিয়ে যাবে।
কিন্তু বিধাতা বোধহয় চায়লেন অন্যরকম।
দিন যেতে লাগলো। প্রতিবার অবনী যত ভাল রেজাল্ট করে ছিদ্রান্বেষীরা ততোই আরো তৎপর হয়ে কপালের দাগের উপর কতাক্ষটা বাড়াতেই থাকে। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে ওর কপালের পোড়া দাগটা যেন ততোই বড় হয়ে আরো পরিস্কার হতে লাগলো।
ও তখন ক্লাস এইটে। গত দুবছর হলো স্থানীয় একজন বড় লোকের মেধাবী কন্যা ওদের ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। অরপা ওর নাম। ও আসার পর থেকে বরাবরই ক্লাসে ঐ মেয়েটায় ক্লাসে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রথম হতে লাগলো। অবনীর মনে মনে এটাকে খুব ইতিবাচক হিসেবে গ্রহন করল। প্রথমত, ছিদ্রান্বেষীদের চোখ ওর উপর থেকে কিছুটা হলেও সরে গেল। দ্বিতীয়ত, ভাল একজন ছাত্রির উপস্থিতি ওকে পড়াশোনায় বেশী করে মনোযোগী হয়ে আরো অধিকতর প্রতিযোগী হয়ে উঠতে সহায়ক হল।
ছাত্রী হিসাবে মেধাবীতো বটেই তাছাড়া রড়লোক বাবার আদরের মেয়ে। প্রতিটি বিষয়েই আলাদা প্রাইভেট টিউটর। গত কয়েক বছর থেকে প্রথম হওয়াটা অবনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ধরতে গেলে অরপার একচ্ছত্র অধিকারে পরিণত হলো।
এ সব নিয়ে বেশ গর্বও ছিল মেয়েটির ভিতর। একেতো মেধাবী বড়লোকের মেয়ে তার উপর সুন্দরীও বটে। ওর চালচলনে সব সময় অন্যান্যদের প্রতি একটা তাচ্ছিল্যের ভাব পরিলক্ষিত হতো।
ভীষন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মেয়েটা, অন্যান্যদের মত নয়। ক্লাসের বকাটে ছেলেরা অবনীকে কথায় কথায় পোড়া কপাল বলে কটাক্ষ করলে ক্লাসের অন্যান্য সবাই যখন নির্বিঘ্নে হাসাহাসি করতো এবং তাতে বকাটে ছেলেগুলো আরো উৎসাহীত বোধ করতো, তখন কেবল ঐ মেয়েটিই নির্লিপ্ত থাকতো। ওদের অন্যায় আচরনে মেয়েটি কখনোই সাঈ দিত না। অবনীকে ওভাবে কটাক্ষ করাটা বোধহয় ও পছন্দ করতো না। এতে করে অবনী মনে মনে ওকে শ্রদ্ধা করতো।
অরপার উপর সবারই দৃষ্টি। কিন্তু অবনীর প্রতি যে দৃষ্টি সেটা তার থেকে আলাদা ধরনের। অরপার যা আছে সেটা ওর উপযুক্ত প্রাপ্য বলে মেনে নিয়েছে সবাই। ও হচ্ছে বানানো সরোবরে অতি যত্নে লাগানো আর পরিচর্যা করা পদ্ম ফুল। তায় ওর প্রতি সবার দৃষ্টিটা প্রশংসার আর আকাঙ্ক্ষার, অবজ্ঞার নয়।
একটু একটু করে অবনী মেয়েটির সাথে ব্যবধানটা কমাতে কমাতে সেবার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ওর নিরবিচ্ছিন্ন রেকর্ড ভঙ্গ করে ওর থেকে অনেক নম্বরের ব্যবধানে ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষায় ফার্ষ্ট হলো।
রেজাল্ট ঘোষনার পর মেয়েটি কিছুক্ষন হতবিহব্বল হয়ে রইলো। ব্যপারটি ওর কাছে একদম অনভিপ্রেত। সবার সন্মুখে প্রকিতিস্থ থাকলেও একটু বাদেই অরপা ওর বাবার কোলের উপর ভেঙ্গে পড়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরূ করলো।
প্রায় সবারই বাবা মা সন্তানদের ফলাফলের তৃপ্তি বা ব্যথা বেদনা ভাগাভাগি করে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনা শেষে যে যার মত বাড়ী ফিরতে ব্যস্ত।
চিরাচরিত ভাবে অবনীর সাফল্যের আনন্দে ভাগ নেয়ার জন্য অবশ্ব্য তেমন কেউ ছিল না। আর রেজাল্ট নিয়ে ওর নিজের মধ্যেও তেমন কোন উচ্ছলতা নেই। রেজাল্ট ঘোষনার পর থেকে অবনী আড়চোখে অরপাকে দেখছিলো। বাবার কোলে ক্রন্ধনরতা অরপাকে একটু দূর থেকে আড় চোখে দেখে ও নিজেও একটু সহানুভূতিশীল হয়ে পড়লো।
ভাবলো ওকে একটু শান্তনা দেবে কিনা?
সে মানষেই অবনী সেদিকে দিকে পা বাড়ালো।
আদূরে মেয়েটি বাবার কোলের উপর মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।
কি বলবে তা নিয়ে অবনী ভাবলো একটু। ও সুন্দরী মেধাবী এবং ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, আসলে ফার্ষ্ট হওয়া ওকেই মানায়।
এ যাবত ক্লাসে মেয়েটি কিছু নম্বর বেশী পেয়ে বরাবরই ফার্ষ্ট হয়, আর অবনী সেকেন্ড। মনের গভীরে ওকে নিয়ে অনেক ভেবেছেও অবনী। ভেবেছে পড়াশোনার প্রসঙ্গ ধরেই একদিন আলাপ করবে ওর সাথে। বন্ধুত্ব হলেই বা ক্ষতি কি। মোধার বিচারে ওরা একে অন্যের কাছাকাছি। তায় ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব হওয়াটা বেমানান কিছু নয়।
কিন্তু কোনভাবেই ওর সাথে আলাপের সুযোগ হয়নি কখনো।
ক্লাসে শিক্ষকের অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়ে আড় চোখে তাকিয়েছেও মেয়েটির দিকে কখনো কখনো। মনে হয়েছে নিশ্চয় ওর মেধার পরিচয় পেয়ে অরপার চোখে মুখে অবনীর প্রতি প্রশংসার ছাপ ফুটে উঠেছে। কিন্তু পরোক্ষনেই ঐ বাজে ছেলেগুলোর কোন অছিলা ছাড়াই পোড়া কপালের কটাক্ষটা তাকে অরপার পাশে খুব বেমানান মনে হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে বরাবর।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে দু এক পা করে অরপার দিকে এগিয়ে গেল অবনী। কিছু একটা বলার সুযোগ খুজতে লাগলো।
এমন সময় অরপা কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বললো - ঐ পোড়া কপাল ছেলেটা নিশ্চয় নকল করেছে, নইলে!
অবনী থমকে দাড়ালো। কথাটা যেন শেলের মত বিঁধে ওকে খুব অহত করলো। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হলো না।
তবু নিজেকে বোঝানোর জন্য মেয়েটির কষ্টকে বড় করে দেখতে চায়লো অবনী। ভাবলো ওর ব্যথা পাওয়ার যুক্তিসংগত কারণ আছে।
ভাববার চেষ্টা করলো যে মেয়েটি হয়তো ওর নাম জানে না। আর জানলেও রাগে দুঃখে হয়তো এই মুহুর্তে ভূলে গেছে তায় অন্যান্যদের কাছ থেকে শোনা নামে ওকে উল্লেখ করছে।
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিতে চায়লো অবনী। নিজেকে সামলানোর শেষ চেষ্টায় নিজেকে একটু হালকা ভাবতে চায়ল।
কিন্তু মরমী আঘাটটা আসলো ঠিক তখনই।
ওর বাবা মেয়েটিকে শান্তনা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো -তুই কার কথা বলচিস?
-কার কথা আবার, ঐ কপাল পোড়া অবনী না কি ওর নাম। ওর কথায় ঘৃনা, অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য ছিকটে পড়লো।
একটু থেমে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আবার বললো- পোড়া কপাল কোথাকার। সবাই ঠিকই বলে। কুৎসীত বাজে, পোড়া কপাল।
ডুকরে কাদতে লাগলো মেয়েটি।
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো অবনীর।
-বকাটে ছেলেগুলোর কটাক্ষ করার প্রয়াসে যোগ না দিয়ে মেয়েটি প্রকৃতপক্ষে দয়া দেখিয়েছে অবনীকে এতদিন। ও অবনীকে কুৎসীত ভাবে।
-কথাটা বোধহয় নিজ কানে না শুনলেই ভালো হতো। ভাবল অবনী।
মনে হলো ও আর দাড়িয়ে থাকতে পারছে না। ওর পা দুটো যেন ওর ভর বহন করার শক্তি হারিয়ে ওকে সোজা হয়ে দাড়ানোর জন্য সমর্থন করতে অস্বীকার করতে লাগলো।
হায়রে নিয়তি এই মুহূর্তে এ দুটি অবুঝ প্রাণ সমাজে প্রচলিত ও স্বীকৃত অপসত্যের কাছে পরাভুত। প্রতিটি ক্ষেত্রে জীবনটাকে সমাজ সৃজনশীলতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছে। প্রতিযোগিতা করতে হবে, আর প্রতিযোগী হচ্ছে সবসময়ই কাছের মানুষটি, একের হার মানেই অন্যের জিত।
ছোট বয়েসে যে খেলাটি সবাই সাধারণত খেলে থাকে সেটি হচ্ছে ‘বিস্কুট দৌড়’। দূরে সবার দৃষ্টি সীমার মধ্যে রশিতে বাধা বিস্কুট গুলো ঝুলতে থাকে। রশিটাতে দুপাশ থেকে মৃদু দোল দেয়া হয় যাতে করে ঝুলন্ত বিস্কুটগুলো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। প্রতিযোগীদের সংখ্যার থেকে সব সময়ই ঝুলন্ত বিস্কুটের সংখ্যা কম থাকে, আর তার জন্যই প্রতিযোগিতা জমে ওঠে। প্রতিটি প্রতিযোগী জানে যে সঙ্গীদের আগে অন্যপ্রান্তে পৌছাতে না পারলে বিস্কুট ফুরিয়ে যাবে।
চাহিদার তুলনাই সরবরাহ অপ্রতুল!
শুরু হয় প্রতিযোগিতা, সাথের জনকে ফেলে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। সাথের বন্ধুটি যদি পা ফসকে পড়ে যাই, আহত হয় তা দেখার ফুসরত নেই, অনন্যাদের পরাজিত করে গন্তব্যে না পোঁছালে কাংখিত বিস্কুটটি পাওয়া যাবে না।
প্রতিযোগিতার দৌড়ে সহগামী বন্ধুটির হারই যে তার জিত। প্রতিযোগিতার সময় অন্যান্য সব প্রতিযোগী একে অপরের শত্রুর মত। এটাই তো আজন্ম সামাজিক শিক্ষা আর সে সমাজের রক্তই যে সবারই ধমনিতে প্রবাহিত হচ্ছে।
এর থেকে কি ভাবে নিস্তার পাবে ওরা!
অন্য দিকে, প্রকৃতই কে কি বা কি রকম? সেটা নিশ্চিতকল্পে নিজের বিবেচনা নয় অন্যের বিবেচনাকে সবাই প্রাধান্য দেয়।
এটা অনেকটা নিজের ঘরের তালার চাবি অন্যের কাছে দিয়ে রাখার মত।
অবনী আর অরপার শরীরে যে সমাজের সেই শিক্ষার নির্যাস বইছে। ওরা কি করে পালাবে সে বাস্তবতা থেকে!